বঙ্গবন্ধু, ৭ মার্চ ও রেসকোর্সের মহাকাব্য

বঙ্গবন্ধু, সাতৈ মার্চ ও স্বাধীনতা এই তিনটি শব্দের সমার্থক রূপ হচ্ছে বাংলাদেশ। অথচ এই সাতৈ মার্চের ভাষণ একটা সময়ে এই স্বাধীন দেশে প্রচার ও বাজানো নিষিদ্ধ ছিল। একটা ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠী ভয় পেত পূর্ব পাকিস্তানের সাময়িক জান্তাদের মতো, যেমন ভয় পেয়ে ১৯৪৭ এর পর থেকে বঙ্গবন্ধুকে ১২ বার জেলে আটকে রেখেছিল জিন্নাহ, আইয়ুব ও ইয়াহিয়ার মতো শাসকরা, যার উপর নজরবন্দী রেখেছিল ১০ বছরেরও বেশি সময়।

মুজিবের দোষ ছিল স্বাধীন ভূমি চাওয়া, দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা এবং একটা পুরোপুরি সেকুলার না হলেও ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা। ধর্মকে ব্যবসা কিংবা রাজনীতির হাতিয়ার করে দেওয়া একটি রাজনীতিক দল চেয়েছিল বলিষ্ঠ সেই কণ্ঠ থেকে আর ডেন অনুপ্রেরণা না জাগে, পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস পাল্টে ঘোষকের নাম বদলে দিয়ে নিজেদের ক্ষমতার এক বীভৎস রূপ দেখিয়েছিল। কিছু ইতিহাস অবিকৃত থেকে যায়, যা কালের সাক্ষী হিসেবে রয়ে যায়।

সম্প্রতি সিমন সেবাগের রচিত ‘স্পিচ দ্যাট চেঞ্জ দ্য ওয়ার্লড’ বইটি পড়ছিলাম। এতে যেখানে পৃথিবীর ইতিহাসে যুগান্তকারী কতগুলো ভাষণ উপস্থাপন করা হয়েচে। সবগুলো স্পিচ বা বক্তব্য এর প্রেক্ষাপট ছিল আলাদা আলাদা। ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর অনান্য যে কোনও রাষ্ট্রনায়কের ভাষণ থেকে অনন্য ও আলাদা । কারণ  কেবল দাবি দাওয়া নিয়ে রেসকোর্সে আসেননি শেখ মুজিব, তিনি এসেছিলেন এবং জানতেন পূর্ব পাকিস্তানের জাগার এবং স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার সুবর্ণ সুযোগ এখনই।

তিনি অত্যন্ত সুচতুরভাবে স্বাধীনতার ডাক ও আহ্বান দিয়ে গিয়েছিলেন, যা পশ্চিম পাকিস্থানিরা অনেক পরে বুঝতে পেরেছিল। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে চারটি মূলনীতি ধরা হয় তার সবগুলোর উপস্থিতি ছিল ৭ মার্চের ভাষণে অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ, সবার গণতান্ত্রিক অধীকার নিশ্চিত করা, অর্থনীতির অধিকার নিশ্চিত করা, ধর্ম-বর্ণ নিরোপেক্ষ একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। বঙ্গবন্ধু তার ওই  ভাষণে ৬ দফার সাথে সমন্বয় রেখে কতগুলো বিষয় তুলে ধরেছেন।

৬ দফায় ও বঙ্গবন্ধু এমন সরকারের কথা বলেছিলেন, যা পার্লামেন্টারি ধরনের ও জনগণের ভোটাধিকারের কথাও ছয় দফায় ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানিরা কী করে আমাদের জাতীয়তাবাদে আঘাত আনছে, তা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, শোষন নিপীড়ণ, বঞ্চনা প্রভৃতি থেকে মুক্তির জন্য গণতন্ত্রের কথা বলেছেন। রাষ্ট্রের সব মানুষরা যাতে সমান অধিকার ভোগ করে সে জন্য তিনি অর্থনৈতিক মুক্তির কথাও ভাষণে তুলে ধরেছেন। ৭ মার্চের মতো বৈরী পরিবেশেও তিনি যখন অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, এই সময় গরিবরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য তিনি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অনুরোধ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- তারা যেন এই দিনটির বেতনও পান।

ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় ফুটে উঠে ‘হিন্দু, মুসলিম, বাঙ্গালি-অবাঙ্গালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই’- এই উক্তি থেকে। যেখানে ভারত পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছিল ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত সুচতুরভাবে কয়েকটি জিনিসের প্রতি গুরুত্ব অরূপ করেছিলেন তার ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে তার মধ্যে হলো- ক্ষমতা হস্তান্তর করা, সামরিক আইন প্রত্যাহার করা, নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করা, কারণ তিনি ধরেই নিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিরা খুব সহজেই তা মেনে নিবে না।

এ জন্যই তিনি রেসকোর্সের ময়দান থেকেই কতগুলো বিষয় তুলে ধরেছিলেন- ‘সামগ্রিক পরিস্থিতি, পশ্চিম পাকিস্তানিদের আগ্রাসী আচরণ এবং দাবিদাওয়া পূরণ না হয়ে একমাত্র উপায়ে যে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সেটা তার- ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ এই অংশটুকু থেকেই স্পষ্ট হয়। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন এইবার বিজয় কন্টকাকীর্ণ হলেও অনেকটা সুনিশ্চিত। তিনি তার ৭ মার্চের ভাষণ কতটা সুকৌশলে দিয়েছেন সেটা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে প্রতীয়মান করে। কারণ পাকিস্তানিরা চেয়েছিল তার বক্তব্যে যদি পাকিস্তান ভাঙ্গার কোন আহ্বান আসে তাহলে তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসাবে চিহ্নিত করে জেলে প্রেরণ করতে এবং তার প্রস্তুতি স্বরূপ তারা সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রস্তুত রেখেছিল।

শেখ মুজিব কতটাই সুচতুর ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন সেটা পাকিস্থানের গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও উঠে আসে। সেখানে আক্ষেপ করে এক কর্মকর্ত বলেছিলেন- “শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেল, আমরা কিছুই করতে পারলাম না।”

জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তানের ১৯৪৭ সালের পর থেকে ৬টি অধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল- ১৯৪৮, ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯ এবং ৭১। প্রত্যেকটি অধ্যয়েই স্বাধীনতা অর্জনের পুঞ্জিভুত শক্তি হিসাবে কাজ করেছে আর সেই পুঞ্জিভুত শক্তির নিউক্লিয়াস ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তমুদ্দিন মজলিসের রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন এবং এর পক্ষে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালনে শেখ মুজিবের ভূমিকা অগ্রণী ছিল। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে যে ধর্মঘট হয়েছিল, সেটি সফল করার অবদানও শেখ মুজিবের ছিল এবং এটাই ছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্মের পর প্রথম সফল হরতাল। ১৯৪৮ এর পর ৪৯ এ ও আরও দুইবার গ্রেপ্তার হতে হয় শেখ মুজিবকে এবং ভাষা আন্দোলনে দেশ যখন উত্তাল শেখ মুজিব তখন জেলখানায়।

এই কারণে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষা আন্দোলনে শরীরী উপস্থিতি না থাকলেও প্রতিনিয়ত যোগাযোগ ও দিকনির্দেশনা ছিল। ১৯৬২ সালের আইয়ুব খানের পাতানো ‘শরিফ কমিশনের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে’ দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার সময় প্রথম সারিতে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার ১৯৬৬ সালে সেই রাজনীতির কবি নিয়ে আসলেন ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা পূর্ব বাংলার মুক্তির সনদ ৬ দফা। পরবর্তীতে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ এর প্রত্যেকটি অধ্যায়ের মূল চালিকা শক্তি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ৭ মার্চ বাঙালি জাতিকে সংঘবদ্ধ হতে সহায়তা করেছিল, ৭ মার্চ রেসকোর্স থেকে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা না আসলে হয়তো এতো অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিরোধ ও জেগে উঠার মানসিকতা গড়ে উঠতো না।

দীর্ঘ ৯ মাস মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে গণমানুষের অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে সেই মহাকাব্য। তার ৭ মার্চে ১৮ মিনিটের সুমধুর ভাষণটি ১২টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। ৭ মার্চের রেসকোর্সের ভাষণ তরুণ প্রজন্মের ইতিহাস শেখার এবং পশ্চিম পাকিস্তানিদের নির্যাতনের ইতিহাস জানার এক অসাধারণ অস্ত্র। কেবল বাংলাদেশই নয় পশ্চিম পাকিস্থানিরা বাঙালি জাতির উপর যে ধরণের নির্যাতন করেছিল, তা আজ শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণের বদৌলতে বিশ্ববাসী জানে। ইউনেস্কো ২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর ঐতিহাসিক ভাষণটি ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে’ অর্ন্তভুক্ত করে। স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো এ নিয়ে নির্মলেন্দু গুণ এর লেখা কবিতা থেকে বোঝা যায় ৭ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কবি লিখেছেন-

কটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে

লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে

ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে-

‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?’

……………..

…শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,

হৃদয়ে লাগিল দোলা,

জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা- ;

কে রোধে তাঁহার বজ্র কণ্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শুনলেন তাঁর

অমর কবিতাখানি:

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সেই থেকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আমাদের।

৭ মার্চের চেতনা অসম্প্রদায়িক ক্ষুধামুক্ত ও দারিদ্রমুক্ত স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার, ৭ মার্চের অনুপ্রেরণা অক্ষুণ্ণ থাকুক যুগ যুগান্তরে এবং তা বয়ে বেড়ায় তরুণদের প্রাণে যাতে তরুণ প্রজন্ম দেশ প্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়।