হৃদয় চূর্ণ হলেও আমরা ভেঙে যাইনি, আবেগময়ী ভাষণে ইমাম

হৃদয় চূর্ণ হলেও আমরা ভেঙে যাইনি, আবেগময়ী ভাষণে ইমাম

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল-নূর মসজিদের ইমাম জামাল ফাওদা এক আবেগময়ী ভাষণ দিয়েছেন।

শুক্রবার জুমার নামায এবং নিহতদের স্মরণে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার শোকার্ত মানুষের উদ্দেশে তিনি এই ভাষণ দেন।

ইমাম বলেন, ‘নিউজিল্যান্ড কখনও ভাঙার নয়। সন্ত্রাসী হামলায় আমাদের হৃদয় ব্যথায় চূর্ণ। কিন্তু, আমরা ভেঙে যাইনি। আমরা বেঁচে আছি এবং আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ; আমরা এমন প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ যে, কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।’

আল-নূর মসজিদের উল্টো পাশে হ্যাগলে পার্কে এই জুমার নামাযের ব্যবস্থা করা হয়। নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় টিভি, রেডিও ছাড়াও বড় বড় স্ক্রিনে এই নামাযের দৃশ্য দেখানো হয়।

গত শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চের এই আল-নূর ও পার্শ্ববর্তী লিনউড মসজিদে হামলা চালায় অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত উগ্রবাদী ডানপন্থী সন্ত্রাসী ব্রেনটন টারান্ট। নামাযরত মানুষের ওপর স্বয়ংক্রিয় মেশিনগানের গুলিতে ৫০ জনের মৃত্যু হয়। সেই সঙ্গে ৬০ জনের বেশি আহত হন, যাদের অনেকের অবস্থা গুরুতর।

স্থানীয় গণমাধ্যম নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড বলছে, ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে হামলায় নিহতদের সম্মানে হ্যাগলে পার্কে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হন। সেইসঙ্গে নিস্তদ্ধ নিউজিল্যান্ডের লাখ লাখ মানুষ ও গোটা বিশ্ব। তারা সবাই নিহতদের স্মরণে দুই মিনিট নীরবতা পালন করেন।

সমবেতদের উদ্দেশে ইমাম জামাল ফাওদা বলেন, ‘আপনাদের হাকার (বিশেষ উদ্দেশ্যে ড্যান্স) ধন্যবাদ, আপনাদের ফুলের জন্য ধন্যবাদ।’

ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলার পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্নের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।

হতাহতদের পরিবারকে নিবিড়ভাবে আগলে রাখা এবং মুসলিমদের রীতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মাথায় কাপড় দেয়ায় ইমাম প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। বলেন, ‘তার নেতৃত্ব বিশ্বের জন্য শিক্ষণীয়।’

সন্ত্রাসী হামলার কারণ হিসেবে কতিপয় রাজনীতিক, কিছু সংবাদমাধ্যম ও অন্যদের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে দায়ী করেন ইমাম। একইসঙ্গে এ ধরনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বন্ধ করতে তিনি বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।

জামাল ফাওদা বলেন, ‘কতিপয় রাজনীতিক, সংবাদমাধ্যম ও অন্যদের ইসলাম বিদ্বেষী এবং মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের ফলাফল এই সন্ত্রাসী হামলা। গত সপ্তাহের ঘটনায় গোটা বিশ্বের কাছে প্রমাণ হয়েছে, সন্ত্রাসবাদের কোনো রঙ নেই, বর্ণ নেই, নেই কোনো ধর্ম।’

হামলাকারীর কবল থেকে বাঁচানোর জন্য যারা সেদিন নিজেদের ঘরের দরজা খুলে দিয়েছিলেন, গাড়ি নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ওই হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ইমাম।

পরে জুমার খুৎবায় ইমাম জামাল ফাওদা এক সপ্তাহ আগের (১৫ মার্চ) সেই ভয়াবহ ঘটনাকে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘গত শুক্রবার আমি এ মসজিদে ছিলাম এবং ওই সন্ত্রাসীর চোখে ঘৃণা আর ক্রোধ দেখেছি। আর আজ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন তাকাচ্ছি, তখন আমি লাখো নিউজিল্যান্ডবাসী ও বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের চোখে ভালোবাসা এবং সহানুভূতি দেখতে পাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে মন্দ মতাদর্শ বিশ্বকে বিভাজিত করে দিয়েছে, সে মতাদর্শ ব্যবহার করে আমাদের দেশে বিভাজন তৈরি করতে চেয়েছিল এ সন্ত্রাসী। তবে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, নিউজিল্যান্ড অবিচ্ছেদ্য।’

শুক্রবার আল নূর মসজিদের সামনে হ্যাগলি পার্কে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্ন। এদিনও মাথা স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা ছিল তার।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে পুরো নিউজিল্যান্ডই ব্যথিত। আমরা সবাই এক।’

 

গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, ইমাম যখন ভাষণ দেন, তখন তার সামনে উপস্থিত ছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্ন ও বিখ্যাত রাগবি তারকা সনি বিল উইলিয়ামসসহ হাজারো জনতা।

রেডিও নিউজিল্যান্ডের খবরে বলা হয়েছে, জুমার নামায রেডিও এবং টেলিভিশনে লাইভ প্রচারের পাশাপাশি বড় বড় স্ক্রিনে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়, যাতে জনগণ দেখতে পারেন আসলে সেখানে কী হচ্ছে।

এর আগেই অবশ্য নিউজিল্যান্ডের পত্রিকাগুলো তাদের প্রথম পাতায় আরব সালাম লিখে প্রকাশ করে।