আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও নারী মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসে এক মহান অর্জন, সুখ ও শোকে মেশানো এক গৌরবময় বিজয়ের গাঁথা। যে বিজয় বাঙালি জাতিকে উপহার দিয়েছে একটি রক্তাক্ত মানচিত্র। যার প্রতিটি বালুকণা, ঘাস, ফুল, গাছ, লতাপাতা, নদীর সাথে জড়িয়ে আছে ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত। যে শহীদের একটি বড় অংশই নারী। প্রতিক্ষণেই ছিল তখন নারীর যুদ্ধ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল নারী পুরুষের সম্মিলিত ধারায় যুক্ত। যুদ্ধের সমগ্র কর্মকাণ্ডে পুরুষ- নারী যার যেখানে যেমন অবদান রাখা দরকার, দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা সে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ মাতৃকার এই দুরূহ সংকট কাটাতে এতটুকু দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি।

৭১- এর ২৬ মার্চ। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ শুরু করেছিল গোটা জাতি। নারীর পরিপূর্ণ সহযোগিতা সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নিরঙ্কুশ ত্যাগ নিয়ে এ যুদ্ধ এগিয়ে চলেছে দিনের পর  দিন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে সঠিকভাবে চিত্রায়ণ করা হয়নি। উঠে আসেনি যথাযথরূপে ইতিহাসের পাতায় তাদের আত্মত্যাগ ও সাহসী অংশগ্রহণের সঠিক চিত্র।

স্বাধীনতা যুদ্ধে যে দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন কেবল তাদের কথাই নয়, যে সব মেয়েরা সক্রিয় প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের নানা কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন তাদের সংখ্যাও কম নয়। রাজধানী ঢাকাসহ সব মফস্বল শহরে এমনকি সুদূর গ্রামাঞ্চলেও আমাদের দেশের সচেতন নারীরা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা থেকেই সম্পৃক্ত থেকেছেন। মুক্তিযোদ্ধারা সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় শত্রুর মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়লে তাদের উৎসাহ প্রেরণা দিয়েই মা বোনেরা ক্ষান্ত হননি। অস্ত্র জোগাড়ে সহায়তা করা, গোপনে সংবাদ আদান-প্রদান, মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয় দান, আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-যত্ন দিয়ে সুস্থ করে তোলাসহ নিজের কন্যা সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়ে দেয়া ছিল তাদের নিয়মিত কাজের অংশ। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত গান শুনিয়ে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখা এবং সর্বোপরি কিছু কিছু সেক্টরে অস্ত্র নিয়ে শত্রুর মোকাবিলাও করেছেন তারা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত শহুরে মেয়েদের সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সহজ সরল নারীরাও প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রতিরোধ সংগ্রামের এক মহান ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছিলেন। এই অনন্য ভূমিকা এক ইতিহাসের গৌরবময় সত্য, যা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।

সেই ৭১- এর স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা নারীর কথা এখানে তুলে ধরছি। যাদের অনন্য ভূমিকা সেইভাবে পত্র-পত্রিকায় আসেনি। এদের একজন মালেকা খান। মালেকা খান এদেশের একজন বিশিষ্ট সংগঠক। যার সারাটা জীবন কেটেছে অবহেলিত, সুযোগ বঞ্চিত, অসহায় মানুষের কল্যাণে বিশেষ করে অধিকার ও নিরাপত্তাহীন ব্যাপক নারী সমাজের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে। তিনি নীরবে, একান্ত নিভৃতে কাজ করতে পছন্দ করেন। প্রচার বিমুখ এই মানুষটি তাই বহু উল্লেখযোগ্য কাজ করার পরও আজকের সমাজে সেইভাবে আলোচিত নন। আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে তিনি নিজের ছোট ভাইসহ অনেক আপনজনকে হারিয়েছেন। তারপরেও সেই মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিতে প্রবল বাধা অতিক্রম করে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। শুধু বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেই ক্ষান্ত হননি তিনি, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত, ক্ষতিগ্রস্ত, ক্ষত-বিক্ষত, মানসিকভাবে বিকল নারীদের পুনর্বাসন করে এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সাথে কথা বলে সেই দু:সহ দিনগুলোর মহান স্মৃতির অনেক না জানা কথা জেনেছি।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে কবি সুফিয়া কামালের সুযোগ্য নেতৃত্বে এবং ঢাকায় বিশিষ্ট কয়েকজন নারীকল্যাণ কর্মীর  উদ্যোগে অসহায় নির্যাতিত নারীদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনের কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে গঠন করা হয় কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন কেন্দ্র। মালেকা খান এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এর আগে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গালর্স গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ঐতিহাসিক  ভাষণের পর বদরুন্নেসা আহমেদের সহযোগিতায় মেয়েদের নিয়ে তিনি সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং কার্যক্রম শুরু করেন। ১৯৭১ সালে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসনের জন্য যখন সোনারগাঁ প্রকল্প প্রতিষ্ঠিত হয় তিনি সেখানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেই সময়ের সেই দু:সহ স্মৃতি আজও তাকে ভারাক্রান্ত করে। যা পেরেছেন তার আনন্দের পাশাপাশি নানা কারণে অনেক কিছু করতে না পারার অক্ষমতাও তাকে আজ ব্যথিত করে। স্মৃতিতাড়িত মালেকা খান অনেকটা আত্মমগ্ন কণ্ঠে নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রের সেই সময়ের নানা পদক্ষেপ সম্পর্কে বলেন- ৭৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি নারীকে অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে পেরেছি, সহস্রাধিক নারীকে নিজ বাড়িতে ফেরার ব্যবস্থা করেছিলাম। শুধু তাই নয় ৪০ এর বেশি শিশুকে দেশের বাইরে দত্তক দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম। পাঁচশত নারীর চাকুরীর ব্যবস্থা এবং অনেক আহত নারীর অস্ত্রোপচারের পর কৃত্রিম পা সংযোজন করে দেয়া হয়েছিল। এছাড়া এই নারীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা, মা-বাবাহারা বহু ছেলেমেয়েকে স্কুলে ভর্তি করে পড়াশোনার ব্যবস্থা, আয়মূলক কর্মসূচির প্রশিক্ষণসহ সেই সময় উপযোগী কল্যাণমূখী নানা কর্মসূচি নেয়া সম্ভব হয়েছিল।

এই যুদ্ধাহত নির্যাতিত নারীদের সেই সময় এবং পরবর্তী  সময়ে যে সামাজিক গ্লানি এবং মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হয়েছিল তার নিখুঁত বর্ণনাও তিনি দেন। স্বল্প পরিসরে তা তুলে ধরা গেল না, কিন্তু তার প্রাণের দাবিটির কথা এখানে তুলে ধরছি। ৭১-এর নিষ্ঠুর হত্যাকারী আর নারীদের ওপর পাশাবিক নির্যাতন চালিয়েছে যারা তাদের প্রত্যেকের, উপযুক্ত বিচার এবং তাদের হাতে নির্যাতিত নারীদের বীরাঙ্গণা উপাধিতে নয় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যোগ্য মর্যাদায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা হোক। এটাই তার দাবি। মানবতাবাদী কল্যাণময়ী কবি সুফিয়া কামাল, যার সার্বিক ও সহযোগিতায় এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল তার প্রতিও তিনি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি এবং তার সহযোগী নারীদের সহযোগিতায় কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট ভারতীয় সেনামুুক্ত হবার পর বধ্যভূমি খুঁড়ে ২৪ জন সেনা মুক্তিযোদ্ধার দেহাবশেষ উদ্ধার করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ, ভাঙা ব্রিজ এবং রাস্তাঘাট অতিক্রম করে দিনের পর দিন সেই কাজ করা তখন দু:সাধ্য ছিল। প্রগাঢ় দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার নেতৃত্বে নারীরা সেই কাজ করতে এতটুকু দ্বিধান্বিত হননি। ঢাকা কুমিল্লার বড় রাস্তার পাশে কালের সাক্ষী হয়ে সেই সেনারা এখনও শায়িত আছেন। কিন্তু সেই নিবেদিত প্রাণ নারী কর্মীদের নাম সেখানে উল্লেখিত হয়নি। উল্লেখিত আছে এ কাজের সাথে সম্পর্কহীন এক সেনা কর্মকর্তার নাম। কাজ করতে গিয়ে অনেক যন্ত্রণা, অনেক বঞ্চনা ও কষ্ট পেতে হয়েছে মালেকা খানকে। এই সব কাজের অংশীদার হওয়ার পথে অনেক কষ্ট, প্রলোভন কোনও কিছুই  তাকে তার আরব্ধ কাজ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

দেশ স্বাধীন হবার পর এই দেশকে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি অবহেলিত খাতগুলোর প্রতি বেশি নজর দিয়েছিলেন। তিনি বেছে নেন শিল্প- বাণিজ্য খাতকে। এই খাতের কষ্টকর পথই শুধু সাহসের সাথে অতিক্রমই করেননি তিনি একটি প্রজন্মের নেতৃত্বও দিয়েছেন। শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ী কেন্দ্রীয় চেম্বারের মালেকা খান প্রতিবাদী কিন্তু বাহ্যিক স্বরূপে তিনি শান্ত, স্নিগ্ধ, সহজ-সরল এবং একেবারেই নিরাভরণ। তিনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন, লড়েছেন সমাজ প্রগতি ক্ষেত্রে সকল অন্তরায়ের বিরুদ্ধে।

প্রগতিশীল আন্দোলনের পুরোধা অনন্য এক মুক্তিযোদ্ধা নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্থ। নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্থ মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই গোপনে সিলেটের মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রগতিশীল নেতা কর্মীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। শুধু তাই নয়, গোপন তথ্য আদান প্রদানের কাজটিও তিনি করেছিলেন সততা এবং সাহসের সাথে। মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক যে কোনও ধরনের সভা, মিটিং, মিছিলে অংশগ্রহণের জন্য মেয়েদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল আদর্শ স্থানীয়। এই দুরূহ কাজটি তিনি করতে পেরেছিলেন তার সংগ্রামী মা সিলেট মহিলা পরিষদের প্রয়াত সভানেত্রী ও রাজনৈতিক আন্দোলনে পুরোধা ব্যক্তিত্ব উষা দাশ পুরকায়স্থের সার্বিক কল্যাণে। যে মহীয়সী তার মেধা, শ্রম ও শক্তি দিয়ে সকল রকম প্রগতিশীল আন্দোলনের ক্ষেত্রটি তৈরী করার জন্য আজীবন ভূমিকা রেখে গেছেন।

নিবেদিতা ১৯৭১ সালের এপ্রিলে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের করিমগঞ্জে যান। সেখানে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের বেইস ক্যাম্পের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। এ সময়েই তিনি মনীষা চক্রবর্তীকে সাথে নিয়ে শিলংএ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে গণ-চেতনা সৃষ্টি এবং আন্দোলনমুখী একটি গণ-সাংস্কৃতিক দল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই দল নানা ধরণের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রেরণ ও প্রকাশে নেপথ্য ভূমিকা রাখেন তিনি। এরপর তিনি কলকাতায় চলে আসেন, সেখানে অবস্থান করেই সেই সময়ে তিনি ন্যাপ নেতা ইকবাল আহমেদ চৌধুরী ও অন্যান্যদের সাথে নিয়ে অগরতলা থেকে প্রকাশিত ‘জয়বাংলা’ পত্রিকা জনগণের মাঝে বিলি ও বিক্রীর ব্যবস্থা করে প্রশংসিত হন। ছাত্র জীবন থেকেই নিবেদিতা সাহিত্য চর্চা এবং লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। সকল প্রগতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে তিনি এই চর্চাকে গতিশীল রেখেছিলেন। দারুণ সাহসী ও মেধাবী ছাত্রী নিবেদিতা ১৯৬৬-৬৭ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে কবিতা লিখে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন এবং সেই অপরাধে সিলেট এমসি কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। সেই দু:সময়ে যারা পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই সমব্যথী মহান ব্যক্তিত্বদের তিনি আজো শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে অশ্রু সিক্ত হন। এরা হলেন- শহীদুল্লাহ কায়সার, রনেশ দাশগুপ্ত, আবুল ফজল, সেলিনা বানু সহ অনেক বিদগ্ধ জন। তাদের প্রেরণা ও সহযোগিতায় তিনি পরবর্তী সময়ে কুমিল্লা মহিলা কলেজে পুনরায় পড়া শুরু করতে পারেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি ইডেন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এড এবং পরবর্তী সময়ে ভারত থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে নিজেকে দেশগড়ার কাজে নিয়োজিত করেন। লেখালেখি শুরু করেন দেশের প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ও সাপ্তাহিক কাগজগুলোতে। তার সম্পাদনায় নব্বই দশকে প্রকাশিত ‘পাক্ষিক চিহ্ন’ পাঠক সমাজে সমাদৃত হয়েছিল। জীবনের ভাংগা গড়ায় জীবিকার তাগিদে পেশা বদলিয়েছেন বার বার। গবেষণার কাজ নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলার নানা জনপদে। তারই ফলে পাঠক সমাজ পেয়েছেন ‘মুক্তি মঞ্চে নারী’ ‘হিন্দু নারীর অধিকার ও পারিবারিক আইন’, আত্ম উন্নয়নে চা শ্রমিকদের অংশগ্রহণ শীর্ষক উল্লেখযোগ্য তথ্য বহুল কিছু গবেষণা গ্রন্থ।

আমরা জানি সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুন নাহার হেলেনের কথা। হেলেনকে শিশুপুত্র সহ মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার এক গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে আসে রাজাকাররা। পাকিস্তানি সেনারা শিশুপুত্র দিলীবকে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং অমানবিক শারিরীক নির্যাতন চালিয়ে হেলেনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। শুধু হত্যাই নয় প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য পাকিস্তানি সেনারা প্রকাশ্যে তার মরদেহ সামরিক জিপের পেছনে বেঁধে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় শহরের অদূরে নবগঙ্গা নদীর ডাইভারশন ক্যানেলে। পরবর্তী সময়ে ওই ক্যানেলেই তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। হেলেনকে আটক করার খবর পেয়ে তার বাবা মুহাম্মদ ফজলুল হক ছুটে আসেন এবং দুগ্ধপোষ্য শিশুর মা হেলেনকে মুক্তি দেয়ার জন্য সেনা কর্মকর্তাদের কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে ব্যর্থ হন। হেলেনের অপরাধ তিনি মাগুরার বামপন্থি নেতা মাহমুদুল হকের বোন এবং মহম্মদপুর এলাকার মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর প্রধান বামপন্থি নেতা আলী কদরের স্ত্রী। অকুতোভয় হেলেন সেই সময়ে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মাগুরার আঞ্চলিক শাখার নেত্রী এবং মাগুরা কলেজের ছাত্রী সংসদের কমন রুম সম্পাদিকা। মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি নিয়মিত খবর প্রেরণ করতেন, পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাগুরা শহরে সেনাবাহিনীর গতিবিধি এবং কর্মসূচীর সংবাদ মুক্তিযোদ্ধা স্বামীকে জানাতেন। সেপ্টেম্বর মাসে তিনি মহম্মদপুর আসেন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য। তিনি সেখানে কৃষক ও ভূমিহীন নারীদের সংগঠিত করার কাজে তৎপর হন এবং এর পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা এবং আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবাদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত: নারী পুরুষের সম্মিলিত ধারায় যুক্ত। সমগ্র যুদ্ধে নারী পুরুষ যার যেখানে অবদান রাখা দরকার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা সে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। একমাত্র শিশুপুত্র দিলীবের মুখ চিন্তা করেও দেশ মাতৃকার এই সংকটে আত্মহুতি দিতে এতটুকু দ্বিধা করেননি এই সাহসী মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুন নাহার হেলেন।

আর এক সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা বরিশালের করুণা বেগম। করুণা বেগমের স্বামী মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম চুন্নু পাক সেনাদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর, করুণা বেগম সিদ্ধান্ত নেন দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তার পথ অনুসরণ করবেন। করুণা বেগম প্রথমে অস্ত্র চালনা শিখেছিলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্বামীর কাছে। পরবর্তী সময়ে গৌরনদী থানার মুক্তিযোদ্ধা নিজামউদ্দীন ট্রেনিং ক্যাম্পে রাইফেল, স্টেনগান এবং গ্রেনেড নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অর্তকিতে গ্রেনেড চালনার কাজটি দক্ষতার সাথে করেছেন। মাহিলারা নামের ব্রিজ সংলগ্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পাক সেনাদের ব্যাঙ্কারে সফলভাবে গ্রেনেড চার্জ করে ফিরে আসার সময় তিনি গুলি বিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় লুকিয়ে রেখে তিনি বরিশাল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। দেশ স্বাধীন হবার পর তাকে ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জেনারেল ওসমানী তাকে দেখতে যান।

পুরুষ মুক্তিযোদ্ধারা কোনও নারীকে সহযোদ্ধা হিসেবে নিতে রাজী হবেন না জেনে করুণা বেগম শার্ট- প্যান্ট এবং টুপি মাথায় দিয়ে নিজের পরিচয় গোপন রেখে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে অসামান্য অবদান রেখেছেন।  প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন যে নারীরা তাদের স্বীকৃতি, সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে সমাজে এখনো রয়েছে প্রবল অনাগ্রহ, প্রকট অবহেলা। মিলিতভাবে যুদ্ধ করেছে যে নারী তার মহান কর্মযজ্ঞ তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রচণ্ডভাবে কাজ করেছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। মুক্তিযুদ্ধের পরের প্রজন্ম তেমনভাবে জানেনা মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতাকে। আমরা জানিনা কত লক্ষ লক্ষ প্রাণ, কত অশ্রু, কত নারীর বীরত্বগাঁথা এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সেটা যথার্থভাবে ইতিহাসের পাতায় কবে উঠে আসবে ?

ছবি কৃতজ্ঞতা: মুক্তিযোদ্ধা বীরাঙ্গণাদের জীবন নিয়ে নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘রাইজিং সাইলেন্স’ এর একটি দৃশ্য থেকে নেওয়া।