হায় নুসরাত, বিচার হলেও শাস্তি হবে কিনা কে জানে !

 নুসরাত আমাদের যতটা কাঁদিয়ে দিক বা কাঁপিয়ে দিক না কেন বিচার হলেও শাস্তি হবে কি না জানা মুশকিল। জানা মুশকিল এই কারণে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট না হলে আপনি কোনওদিন জানবেন না, সিরাজ উদ দৌলা কবে কোন ফাঁকে বেরিয়ে গেছে। আপনি যে ঈদে-চাঁদে সাধারণ মাফের আওতাভুক্ত বন্দিদের নাম পড়েন না, সেটি জানেন? কে কখন কীভাবে বের হয়ে যায় বা যেতে পারে এদেশে কেউই জানেনা। আর একটা কথা কী কারণে ধর্ষণের বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয় না? মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণ তেমন অপরাধ বলে, বিবেচ্য হলে এখন নয় কেন? এখন কি আমরা তবে মেনে নিয়েছি যে ধর্ষণ হতেই পারে? নাকি সমাজে এই প্রক্রিয়া ঠেকানোর সদিচ্ছা প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কারো নাই?
নববর্ষের আনন্দ কিছুটা হলেও ম্লান করে দিয়ে গেছে এক মেয়ে। সে আমাদের বোন আমাদের কন্যা আমাদের জননী নুসরাত। ঢাকঢোল পিটিয়ে সামনে পেছনে নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা আমরা বোঝাতে পারছি না, সমাজ আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে? অথবা বুঝলেও মানছে না কেউ। আজ যে নুসরাত আমাদের জীবনকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে কাল আর কোনও নুসরাত তা আরো ঘন বেদনার করে তুলবে না তার গ্যারান্টি থাকলে মঙ্গল শোভাযাত্রায় কি এমন বাহিনীর শো ডাউন লাগতো? ছবি দেখে কি মনে হয়েছে বলুন তো? মিথ্যা বা অজুহাত না, সত্যি বললে কী বলতে হবে?
মনে হচ্ছে সিরিয়া বা ইরাকের রাজপথে কিংবা কাবুলে কোনও শোভাযাত্রা কিংবা মিছিল বের হয়েছিল। এইভাবে কতদিন? আমরা ভালো জানি এর দরকার আছে। মানে নিরাপত্তার। না থাকলে কত মানুষের জান যেত বা যেতে পারতো কেউ জানেন না। আহত নিহতদের যাওয়া আসা আর স্বজনদের আহাজারী আর কত? অথচ আমরাই দেখছি একদিকে বাঙালি হবার কেমন এক আগ্রহ, আরেকদিকে ক্রমাগত মরুর দেশের প্রভাব আর দেশীয় উস্কানিতে সমাজ চলেছে অন্য কোথাও। ভারতীয় আগ্রাসনে পরিবার যেমন আজ আক্রান্ত, তেমনি এসব আগ্রাসনে বাঙালিত্বও পড়েছে তোপের মুখে। সে সমাজে নুসরাত কি করে ভালো থাকবে?
সে তো কম কিছু চেষ্টা করেনি। যেসব মানুষরা সমাজকে ভয় দেখায় কিংবা যাদের ধারণা নারী পোশাকের কারণে লোভাতুর করে তোলে তাদের কথা সত্য হলে নুসরাত টার্গেট কেন? সে তো শালীনতার চেয়েও ভালো পোশাকে আবৃত ছিল। তার পড়াশোনাও কোনও ইংরেজি মিডিয়াম বা আধুনিক স্কুলে ছিলো না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পড়তে গিয়ে যদি তার মতো মেয়ে প্রিন্সিপালের লালসার শিকার হয়, তো আমরা কী চোখ বুজে বলবো যে- এইসব মানুষদের ফতোয়া কিংবা মনগড়া কথাই সত্য? মূলত সমাজ আজ এমন এক জায়গায় যেখানে আপনি চাইলেও সত্য বলতে পারবেন না। আমরা দেশের বাইরে থেকেও সত্য বলতে ভয় পাই। কারণ আমাদের ওপরও হুমকি দেয়া হয়। আর তা যে কতটা সত্য হতে পারে তার প্রমাণ আমরা দেখেছি বহুবার। তাহলে মুক্তি কোথায়?
আমি গ্যারন্টি দিয়ে বলতে পারি আগামী বছর আসতে আসতেই আমরা নুসরাতকে ভুলে যাবো। মানুষ ভুলতে না চাইলেও ভুলিয়ে দেয়া হবে। এমনিতেই দেশে সমস্যার কমতি নাই।  এমন আরেকটা কিছু এসে হাজির হবে যখন আমরা সেটা নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়বো যে নুসরাত ডুবে যাবে বিস্মৃতির অতল অন্ধকারে। এমন কত নুসরাত আছে দেশে মরতে পারেনা বলে মরে মরে বেঁচে থাকে। তাদের খবর  আমরা রাখি না । এই মেয়েটি প্রতিবাদী বলে সবার নজরে পড়েছিল। কিন্তু কি লাভ হয়েছে ? বেঘোরে তাজা প্রাণটা ঝরে গেলো।
মুক্তি পেতে হলে সমাজকে জাগাতে হবে। সেটা এখন কতটা সম্ভব বলা মুশকিল, কারণ আইন ও বিচার চাইলেও শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেনা। এই যে দেখছেন এক ভদ্রমহিলা নারী হয়েও বলে দিলেন নুসরাত ধোঁয়া তুলসী পাতা ছিল না। যদি না থাকেও তার মৃত্যুর পর এমন মন্তব্য কী প্রমাণ করে? এতো বলে দিচ্ছে আমাদের আক্কেলও আজ আর নাই। নারী হয়ে নারীর মাংস খাওয়ার লোভ কাউকে ছাড় দেবেনা। অচিরেই হয়তো আরো গল্প বেরোবে। যাতে সবাই ধন্দে পড়ে যাবে আসলে কি নুসরাতই প্ররোচণা দিয়েছিল কোনওভাবে। সিরাজ উদ দৌলার লোকেরা চুপ থাকবে না। চুপ থাকার হলে তার বৌ এই ঘটনার পর ব্যাংক থেকে আঠারো লাখ টাকা তুলে  উধাও হতে পারতো? খবরে দেখলাম প্রায় কোটি টাকার বাড়ি আছে এই লোকের। কিভাবে? একজন টিচারের এত টাকা আসে কোথা থেকে? নিশ্চয়ই কোন রাজনীতি আছে এর পেছনে। যা তাকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রেখেছিল। এখনো রাখার অপচেষ্টা চালাবে। ভরসা একটাই স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিষয়টা নিয়ে ভেবেছেন। তার হুকুমের কারণে হয়তো কোনও একটা কিছু হবে এবার।  আর যদি তা না হয়, বা না হতে পারে, তাহলে আবার আমরা ডুবে যাবো সমাজ বিকৃতির চোরাবালিতে।
সত্যি বলছি আমাদের কি আসলে গায়ের চামড়া বলে কিছু আছে? না কোন সম্মানবোধ? মেয়ে তো সবার বাড়িতেই আছে। আমাদের পরিবারও মাতৃতান্ত্রিক। আমরা কথায় কথায় গর্ব করি মেয়েরা মায়ের জাতি। মায়ের পায়ের তলায় বেহশত এসব বুলি আওড়াই। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা তা মানি? নুসরাতের এলাকা কি দেশের ভিন্ন কোনও এলাকা? না এমন মাদ্রাসা হেডমাস্টার শুধু ওই একজন? এই সিরাজ উদ দৌলার কিন্তু কি হবে আসলে কেউ জানেনা। আজ যে গরম ভাব, মানুষের মনে যে রাগ বা আগুন, অচিরেই তা নিভে যাবে। তখন সিরাজ উদ দৌলা আবার নবাব হয়ে ঘুরে বেড়াবে। নতুন কোনও শিকারের সন্ধানে নামবে। কিন্তু যৌনতার লালসা থামবে না।
মূল কথা সেটাই। এই লালসা এখন কোথায় এসে নেমেছে দেখুন। একজন হেডমাস্টার মানে কী? আমাদের পরিবারেও হেডমাস্টার ছিলেন । এখনো আছেন। আমরা দেখেছি তারা ছিলেন, ছেলে-মেয়েদের পরম অভিভাবক। মেয়েদের পিতা। আজ সে জায়গাটা নিয়েছে যৌন নিপীড়ক। তাও ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে। মাদ্রাসায় যদি মেয়ে এমন হেনেস্তার শিকার হয় তো কি বুঝতে হবে? বোঝার কি আর বাকী আছে যে এই সমাজ এখন ধ্বংসের শেষপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে নারী মানেই মাংসপিণ্ড। স্তন-নাভি-যোনীর এক আকৃতি মাত্র। সে মা হোক আর মেয়ে হোক ছাড় নাই কারো। আর একটা বিষয় খেয়াল করবেন এইসব মাস্টারদের চেহারা সুরতও বলে দেয় তাদের মনে কী আছে। এমন পানাসক্ত লাল দাঁতের চেহারাই তো ভয়ংকর।  এই সেদিনও মাস্টার মানে ছিলো সফেদ পাঞ্জাবি-পাজামার সৌম্য দর্শন কোনও মানুষ। যার চেহারা দেখলেই মন ভালো হয়ে যেত। তারা কথা বলতেন নিচু গলায়। তাদের ব্যবহার দেখলেই বোঝা যেত তারা কতটা জ্ঞানী আর ভদ্রোচিত। আজ সে সবের বালাই নাই। সব আসলেই চলে গেছে নিপীড়ক আর লুটেরাদের হাতে। রাজনীতি যেখানে তার অভিভাবক সেখানে সমাজ কিছু করতে পারবে বলে মনে হয়না। কারণ সমাজ ও আজ মৃতপ্রায়।
নুসরাত লাশ হয়ে ফিরে বেঁচে গেছে । মেয়েটি বাঁচবে কি বাঁচবে না- তা আসলে চিকিৎসকের বাইরে কেউই জানতো না। তারা যখন সিঙ্গাপুর নেয়ার বিষয়ে অপারগতার কথা বলছিলেন কেন জানি মনে হচ্ছিল মেয়েটি বোধহয় বাঁচবে না।  দেশের বাইরে থেকেও বুকের ভেতর যে বেদনা আর শোক বহন করছি তার কোন ভাষা নাই। প্রশ্ন রাখি এই লাশ এই অপমান এই বেদনা এই লজ্জা আমরা রাখবো কোথায়? কিভাবে নিরাপদ থাকবে আমাদের মা-বোন বা কন্যারা? খালি মানববন্ধন খালি ক্রন্দন আর শোকেই কি সমাধান?  এ জাতি কি জাগবে না কোনদিন আর? না সময় গুনতে হবে এই আতংকে যে- হু ইজ নেক্সট নুসরাত?