যশোরে বিঘা প্রতি ধানে লোকসান ৩ হাজার টাকা

 

::নিজস্ব প্রতিবেদক::

ধানের সরকার নির্ধারিত মূল্য নেই কোথাও। মধ্যস্তভোগীরা যেমন খুশি দামে কিনছেন ধান। আর কৃষকরা দেনা পরিশোধের তাগিদে নগদ টাকা প্রাপ্তির আশায় লোকসান দিয়ে হলেও ধান বিক্রি করছেন। কৃষকদের বক্তব্য অনুযায়ী প্রতি বিঘা জমিতে লোকসান হচ্ছে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা।

যশোরে এবার অনুকুল আবহাওয়া, সময়মত সার, বীজ, কীটনাশক কৃষকের হাতের নাগালে থাকায় বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮০শতাংশ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। তবে বাজারে ধানের মূল্য অনেক কম থাকায় এই আশাতীত ফলনেও কৃষকের মুখে হাসি নেই।

বেশিরভাগ কৃষক লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করে দেনা শোধ করছেন। এলাকাভেদে প্রতি বিঘায় (৩৩ শতাংশে) কৃষকের উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ৮শ’ টাকা থেকে ১৮ হাজার ৮ শ’ টাকা পর্যন্ত। তাদের উৎপাদন হয়েছে ২২ থেকে ৩৪ মণ পর্যন্ত। যেসব প্রান্তিক চাষি জমি লিজ নিয়ে ধান চাষ করেছেন তাদের উৎপাদন খরচের সাথে বিঘাপ্রতি লিজমূল্য চার হাজার টাকা যোগ করলে বিঘাপ্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা করে লোকসান হচ্ছে।

যশোর জেলার আট উপজেলায় এ বছর ১ লাখ ৬৩ হাজার ১শ’ ৪০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় আবাদ করা হয়েছে ২৬ হাজার ৩শ’ হেক্টর, শার্শায় ২৩ হাজার ৪শ’ ৫০, ঝিকরগাছায় ১৮ হাজার ৯শ’ চৌগাছায় ১৮ হাজার ৩শ’ অভয়নগরে ১৪ হাজার ৩শ’ ৫০ হেক্টর, বাঘারপাড়ায় ১৬ হাজার ৭শ’ ৩০ হেক্টর, মণিরামপুরে ২৯ হাজার ৯শ’ ও কেশবপুরে ১৫ হাজার ২শ’ ১০ হেক্টর। এবার যশোরের কোথাও ব্লাস্ট মহামারী আকার ধারণ করেনি। গত বছর এই রোগে কৃষকের সর্বনাশ হয়েছিল।

চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। চৌগাছার আড়ারদহ গ্রামের জামাল উদ্দিনের হিসাবে তার বিঘাপ্রতি ধানের উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ৮শ’ টাকা (চাষ-১ হাজার, নিড়ানো-১ হাজার, ধানের চারা ক্রয়-১ হাজার ৫শ’, রোপন-১ হাজার, সার ৩ হাজার, সেচ-১ হাজার ৫শ’, ধান কাটা ও ঝাড়া-৪ হাজার, পরিবহন-৮শ’ টাকা)। তবে ধানের চারা নিজের হলে খরচ এক হাজার কমেছে। আবার লিজ নিলে পাঁচ হাজার বেড়েছে। আর বিঘাপ্রতি ব্রি-৬৩ জাতের ধান উৎপাদন হয়েছে ২০-২২ মন।

এদিকে ধানকাটা শ্রমিকের সংকট অব্যাহত রয়েছে। খরচের হিসেবে দেখা যাচ্ছে একবিঘা জমির ধান কাটা-ঝাড়াতেই প্রায় চার হাজার টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। যা মোট খরচের একচতুর্থাংশ। চৌগাছার কৃষক আবুল আক্তার জানান, চলতি মৌসুমে সার, বীজ, কীটনাশক বা ডিজেল পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ভালো। তাছাড়া মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে পরিমাণ মত বৃষ্টিপাত হওয়ায় ধানের ভালো ফলন হয়েছে।
সরকারিভাবে ধানের যে ক্রয় মূল্য সেটা পর্যাপ্ত হলেও চাষিদের কাছ থেকে তো সরকারিভাবে ধান ক্রয় করা হয় না। একারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তারা। বাজারে এক হাজার থেকে এগারশ’ টাকা মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারলে তাদের পরিশ্রম সার্থক হতো। চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দীন জানান, আমরা সব সময় কৃষকের পাশেই আছি। মৌসুম জুড়ে আমার সহকর্মীরা কৃষকদের সহযোগিতা করেছেন।

মণিরামপুরের চাঁদপুর-মাঝিয়ালী গ্রামের প্রান্তিক চাষি নিরঞ্জন দাস জানান, তিনি এবার মোট ১৬ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। সার, বীজ, কীটনাশক, সেচসহ প্রতিমণ ধানের উৎপাদন খরচ পড়েছে গড়ে এক হাজার টাকা। কিন্তু তিনি মোটা ধান বিক্রি করেছেন সাত’শ টাকা মণদরে। নিরঞ্জন দাস বলেন, এতো কষ্ট করে লাভের পরিবর্তে প্রতিমণে দুই থেকে তিন’শ টাকা লোকসান দিয়ে ধারদেনা পরিশোধ করতে হচ্ছে।

একই কথা জানালেন, উপজেলার লাউড়ি গ্রামের আকরাম হোসেন, ফজলুর রহমান, পৌর শহরের কামালপুর এলাকার আব্দুল জব্বার মোড়লসহ অনেকে।

মনিবামপুরের রাজগঞ্জ, নেগুড়াহাট, খেদাপাড়া, চিনাটোলা, নেহালপুর, ঢাকুরিয়াসহ পৌর শহরের বাজার ঘুরে দেখা যায়, মোটা ধান প্রতিমণ সাত থেকে সাড়ে সাত’শ টাকা, মিনিকেটসহ চিকন ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে সাত’শ থেকে আট’শ টাকা, বাসমতি, জিরা মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে নয়’শ থকে নয়’শ পঞ্চাশ টাকা মণ।

রোহিতা গ্রামের বোরো চাষি আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘ধানের বাজার মূল্য এত কম থাকলে লোকসান করে আর ধান চাষ করব না’।

সেচযন্ত্র মালিক আনছার আলী জানান, তিনমাস বাকিতে পানি সেচ দিয়ে ধান কাটার পর সেই টাকা আদায় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার ওপর ধানের দাম কম থাকায় কৃষকরা বকেয়া পরিশোধ করতে তালবাহানা করছেন। মধ্যস্বত্বভোগী মোদাচ্ছের আলী জানান, বোরা চাষের শুরুতেই কৃষকদের অগ্রিম টাকা দিয়েছি। কৃষকরা এখন টাকার পরিবর্তে ধান দিয়ে দেনা শোধ করছেন।

মণিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হীরক কুমার সরকার উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজার মূল্য কম থাকার কথা স্বীকার করে জানান, বর্তমান বাজারদরে কৃষকদের লোকসান হচ্ছে। তিনি জানান, উপজেলার প্রায় ৯৫ ভাগ ক্ষেত থেকে চাষিরা ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে তাহলে আগামী চার/পাঁচ দিনের মধ্যে বাকি ধান ঘরে উঠবে।

এ ব্যাপারে যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপপরিচালক এমদাম হোসেন জানান, যশোরে এবার কোথাও ব্লাস্টরোগ দেখা দেয়নি। ধানের ভালো ফলন পেয়েছেন চাষিরা। কিন্তু ন্যাষ্য দাম যদি না পাওয়া যায়, তাহলে চাষিরা ধানের আবাদ থেকে সরে যেতে পারে।