নারীরা জ্ঞানে আছে বিজ্ঞানে নাই

সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যানবেইস (বাংলাদেশ শিক্ষা ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাথমিকে মোট ছাত্রছাত্রীর প্রায় ৫১ শতাংশ ছাত্রী। মাধ্যমিক পর্যায়ে এই হার উন্নীত হয়েছে ৫৪ শতাংশতে। অংশগ্রহণের পাশাপাশি এই পর্যায়ে সফলতায়ও এগিয়ে নারীরা। ২০১৮ সালে পিইসিতে অংশগ্রহণকারী ছাত্রীদের ৯৫ দশমিক ৪০ শতাংশই উত্তীর্ণ হয়েছে কিন্তু ছাত্রদের উত্তীর্ণের হার ছিল ৯৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। পিইসির পাশাপাশি জেএসসি, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনায়ও একই চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৯ সালের এসএসসি পরিক্ষার ফলাফলে দেখা যায় যে, মেয়েদের পাশের হার ৮৩ দশমিক ২৮ শতাংশ যা ছেলেদের তুলনায় ২ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি।

কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে ছাত্রীদের অংশগ্রহণের চিত্র পরিবর্তিত হতে শুরু করে। এই স্তরে ছাত্রীদের অংশগ্রহণের হার ৪৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এটি কমে গিয়ে যথাক্রমে ৪১ দশমিক ৩৯ ও ৩৬ দশমিক ০৭ শতাংশ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ৪২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর ৩৭ দশমিক ০৯ শতাংশ নারী এবং ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ২৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ নারী। কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষে এই নারী শিক্ষার্থীদের অনেকেই চাকুরীতে প্রবেশ করছেন না। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস) এর তথ্য অনুযায়ী স্নাতক সম্পন্ন করা নারীদের মাঝে বেকারত্বের হার পুরুষের তুলনায় ২.৫ গুন বেশি। বিজ্ঞান ও গবেষণা পেশায় নারীদের উপস্থিতি কমে যায় সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশের শীর্ষ ১০টি বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত গবেষকদের মধ্যে নারী গবেষকের হার শতকরা ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী বিজ্ঞানী কর্মরত আছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআরবি), ২৬৮ জন। তবে মোট নারী গবেষকের সংখ্যা হিসেব করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে মোট গবেষকের মাত্র ১৭ শতাংশ নারী। আবার শুধু বাংলাদেশের নারীরা যে এই পরিসংখ্যানে পিছিয়ে আছে এমনটিও সত্য নয়। সারা বিশ্বেই পুরুষের তুলনায় নারী গবেষকের হার সীমিত। বর্তমান বিশ্বের মোট গবেষকের মধ্যে মাত্র ২৮ শতাংশ নারী। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণই অপরিহার্য। কেননা একজন নারী হয়ত একজন পুরুষের তুলনায় ভিন্নভাবে কোন বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান করতে পারেন। একই বৈজ্ঞানিক সমস্যার একাধিক সমাধান হলে সবচেয়ে কার্যকরী সমাধানটি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞান ও গবেষণায় নারীর এই সীমিত অংশগ্রহণের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় বিজ্ঞান গবেষণাকে পেশা হিসেবে নেয়ার আগ্রহের অভাব। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত পুরুষের তুলনায় নারীর আদর্শ পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয় শিক্ষকতা, ডাক্তারি, ব্যাংকিং অথবা বিসিএসকে। তাই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের পর অধিকাংশ নারী এই অগ্রাধিকারের পেশাটিকেই অর্জন করতে চায়। এছাড়া স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি স্তরে অধিকাংশ নারীই পারিবারিক দায়িত্ব পালন ও সন্তান লালন-পালনে যুক্ত হয়ে পড়েন। যেটি অনেক সময় বিজ্ঞান গবেষণা চর্চায় বিঘ্ন ঘটায়। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নারী বিজ্ঞানীদের উপর ইরিন চেকের করা একটি গবেষণায় দেখা যায় ৪০ শতাংশের বেশি নারী বিজ্ঞানী প্রথম সন্তান জন্মদানের পর তাদের পেশা ত্যাগ করেন। কিন্তু সন্তান জন্মদানের পর যদি তার লালন-পালনের দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়ে মিলে পালন করা হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে সহযোগিতা করা হয়, তাহলে খুব সহজেই একজন নারী বিজ্ঞানী তার গবেষণা চর্চা অব্যাহত রাখতে পারেন।

দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নারী বিজ্ঞানীদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলে জানা যায়, এ দেশে ভাল ছাত্রীদের ছোটবেলা হতেই উৎসাহিত করা হয় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে, বিজ্ঞানী হতে নয়। গবেষণা কাজে অন্যান্য পেশার তুলনায় বেশি সময় দেয়া (দীর্ঘ সময় ল্যাবে কাজ করা) প্রয়োজন হয় বিধায় অনেক সময় নারীরাও বিজ্ঞান গবেষণাকে পেশা হিসেবে নিতে চান না। এছাড়া নারীদের অনেক সময় বিভিন্ন পারিবারিক কারণে দেশের বাইরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও সেমিনার-কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় না। এসকল কারণে নারীরা বিজ্ঞান গবেষণাকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে না।

বিজ্ঞান শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে – ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। নারীদের মাঝে বিজ্ঞান গবেষণাকে পেশা হিসেবে নেয়ার আগ্রহ তৈরি করতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে এ লক্ষ্যে বিভিন্ন রকম সংগঠন গড়ে তোলা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যুক্তরাষ্ট্রের ৫০০ ওমেন সাইনটিস্ট সংঘের কথা। এ সংঘটি নারীদের মাঝে বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশের মাধ্যমে তারা বিজ্ঞানে নারীর অবদান ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে এ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে। বাংলাদেশের নারীদেরও বিজ্ঞান পেশায় আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ ওমেন সাইনটিস্ট এ্যাসোসিয়েশনের মত যে সকল সংঘ রয়েছে তারা এরকম পদক্ষেপ নিতে পারে।

অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ের ছাত্রীদের মাঝে বিজ্ঞান শিক্ষা নিয়ে নানা রকম ভীতি কাজ করে। তাই তারা বিজ্ঞান শাখার পরিবর্তে মানবিক বা ব্যবসায় শাখায় বেশি ভর্তি হয়। এই ভীতি দূর করতে স্কুলগুলোতে বিভিন্ন রকম আকর্ষণীয় বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যেসব শিক্ষার্থী বিজ্ঞান শিক্ষায় অধ্যয়নরত আছে তাদেরকে বিজ্ঞান পেশার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে পরামর্শ দান করা যেতে পারে। বিজ্ঞানের কোন কোন শাখায় নারী বিজ্ঞানীর ঘাটতি রয়েছে সেটি আলোচনা করা যেতে পারে। যে সকল নারী বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বড় বড় আবিষ্কারে অবদান রেখেছেন তাদের কথা তুলে ধরা যেতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্রির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তমাল লতা আদিত্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান এবং আইসিডিডিআরবি’র ফেরদৌসী কাদরির মত সফল নারী বিজ্ঞানীদের এই উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে।

এছাড়া পরিবারের সকলে মিলে মেয়েদের বিজ্ঞান শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মাঝে বিজ্ঞান শিক্ষায় নারীর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অভিভাবক সভার মাধ্যমে তাদের মেয়ে সন্তানদের বিজ্ঞান শিক্ষায় অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ  করতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতেও এ সম্পর্কে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নারীদের বিজ্ঞান চর্চায় আরও বেশি জড়িত করতে পারে। এতে করে ভবিষ্যতে বিজ্ঞানের জগতে নারী বিজ্ঞানীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে এবং নারী বিজ্ঞানীদের অবদানকে কাজে লাগিয়ে দেশ উন্নত হতে পারে। সাথে সাথে তা জাতীয় মর্যাদাও বৃদ্ধি  করবে।