লোকসভা ভোটে বাংলার প্রেক্ষাপট

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষিত হয়েছে। সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি আবার একক গরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে চলেছে। কংগ্রেস, বামপন্থিসহ সমস্ত বিরোধী দলই এই নির্বাচনে যাবতীয় অংক উল্টে দিয়ে অত্যন্ত খারাপ ফল করেছে। পশ্চিমবঙ্গে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের শতাংশের হিসেবে ভোটের হার সামান্য কমলেও আসন সংখ্যার নিরিখে তারা ভয়ঙ্কর রকমভাবে কমে গেছে ।

অপরপক্ষে বামপন্থিদের ভোটের শতাংশ তো কমেছেই, দুঃখের বিষয় হলো- তারা একটি আসনও পাননি। জাতীয় স্তরের নির্বাচন নিয়ে যেমন পর্যালোচনা হচ্ছে তেমনি মানুষের ভেতরে পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল  ঘিরে নানা ধরনের ভাবনাচিন্তা উঠতে শুরু করেছে । বস্তুত ২০১১ সালে এ রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতা দখল করবার পর থেকে তার প্রতিটি পদক্ষেপ সাম্প্রদায়িক বিজেপিকে রাজ্যে যেমন রাজনৈতিক জমি খুঁজে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনি সংসদীয় রাজনীতিতে পা রাখবার জোরালো সুযোগ এনে দিয়েছে ।

নিজেকে সংখ্যালঘুপ্রেমী হিসেবে নানা ধরনের ছদ্মবেশে উপস্থাপিত করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । ওয়াকফ সম্পত্তি মুসলমানদের নিজস্ব সম্পত্তি। সেই ওয়াকফের টাকা দিয়ে মুসলমান সমাজের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের একটা ছোট্ট অংশকে সামান্য কিছু ডোল দিচ্ছেন মমতার প্রশাসন। এই ডোল দেওয়ার ভেতর দিয়ে তিনি সংখ্যাগুরু হিন্দু সমাজের ভেতরে ‘মুসলমান সমাজের প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব হচ্ছে’- এমন মানসিকতাকে এতটাই চাগিয়ে দিয়েছেন যে, যার জেরে হিন্দু সমাজের একটা বড় অংশ গত আট বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে সাম্প্রদায়িক বিজেপির দিকে ঢলতে শুরু করেছে।

মুসলমান সমাজের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক- কোন উন্নয়ন না ঘটিয়ে কার্যত মুসলমান সমাজকে ধর্মীয় কুসংস্কারে আবদ্ধ রাখাই ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামাজিক মেরুকরণ সৃষ্টির  অন্যতম প্রধান কৌশল। পবিত্র ইসলাম ধর্মের উদারনৈতিক দিকগুলির কোনও চর্চা কিন্তু গত ৮ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটিবারের জন্যও করেননি।  ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের একটা বড়ো অংশ  যাতে সংখ্যালঘু মৌলবাদের ফাঁদে গিয়ে পড়তে পারে, যার দ্বারা উপকৃত হবে সংখ্যাগুরু মৌলবাদ, তার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সব রকমের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন ।

এই চেষ্টা যে কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই করেছেন তা নয়। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে তিনি এ রাজ্যে কেবলমাত্র মুসলমান মেয়েদের জন্য নার্সিং ট্রেনিং কলেজের সাড়ম্বর ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। টিপু সুলতান মসজিদের তৎকালীন স্বঘোষিত ‘শাহী’ ইমাম বরকতি-কে দিয়ে এই ভিত্তি স্থাপনের কাজটি তিনি করেছিলেন। মজার কথা হলো, ভারতীয় সংবিধানের কোথাও কেবল একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য কোনরকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করবার আদৌ কোনও সংস্থান নেই ।

প্রশ্ন হলো তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকার কেন তাদেরই মন্ত্রিসভার একজন সদস্য, কার্যত ভারতীয় সংবিধানকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে এই প্রতারণা করছে জেনেও চুপ করে বসে ছিল? বস্তুত এ রাজ্যে বামপন্থিদের হেনস্থা করতে, বামপন্থিদের সামাজিক ভিত্তিকে নষ্ট করতে, বামপন্থিদের হটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দীর্ঘদিন ধরে মেরুকরণের রাজনীতি করে চলেছেন, তার সেই মেরুকরণের রাজনীতির প্রথম প্রধান সমর্থক হিসেবে কংগ্রেস দল পশ্চিমবঙ্গে যে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা পালন করেছে তাকে ধিক্কার জানাবার ভাষা নেই।

আজ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে এই সাফল্যের পেছনে কংগ্রেস দলের ভূমিকাকে অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে স্মরণ করতে হয় । আজ আমাদের রাজ্যের রাজনীতি এবং সামাজিক মেরুকরণের লক্ষণ দেখে এই আশঙ্কায় ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি ও তাদের সঙ্গী সাথীদের সামাজিক, রাজনৈতিক জায়গা করে দেওয়ার জন্য প্রথম থেকেই নাগপুরের কেশব ভবন , আরএসএস এর সদর দপ্তর, সেখানকার তৈরি করে দেওয়ার ছক অনুযায়ী কাজ করে গেছেন?

যদি তাই না হতো, তাহলে মুখে সম্প্রীতির কথা বলে কেন মমতা গত আট বছর ধরে ‘প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা’-কে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি জায়গা করে দিলেন? মমতা ধর্মে বিশ্বাসী হতে পারেন । কিন্তু সেই ধর্মে বিশ্বাসকে তিনি তার গোটা রাজনৈতিক জীবনে কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির তাগিদেই নগ্নভাবে ব্যবহার করে গেছেন। মমতা ফুরফুরা শরীফে গিয়ে মাথায় হিজাব দিয়ে মোনাজাতের ভঙ্গিমায় ফটোশুট করেছেন। আবার ইসকনে গিয়ে গায়ে নামাবলী জড়িয়ে পরম বৈষ্ণবের   মতন আচরণ করেছেন । সেই মমতা ঠাকুরনগরে মতুয়া সম্প্রদায়ের আশ্রমে গিয়ে নিজেকে ‘মতুয়া’  বলে ঘোষণা করে মতুয়া ভোটকে নিজের বাক্সে টানবার সব রকমের চেষ্টা করেছেন ।

ধর্মকে ব্যবহার করে মমতার এই যে বহুরূপী চরিত্র, সেটাই এ রাজ্যে আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে সাধারণ মানুষের ভেতরে ধর্মের ভিত্তিতে, জাতপাতের ভিত্তিতে, সামাজিক বিভাজনকে তীব্র করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের ভেতরে মমতার প্রশাসনিক ভূমিকা, তার দল তৃণমূল কংগ্রেসের সীমাহীন দুর্নীতি, ঔদ্ধত্য, বিশেষ করে ভূমি স্তরের নেতাকর্মীদের কয়েক দিনেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাওয়ার ঘটনা, অপছন্দের লক্ষ্যে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নানা রকম মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে জেল খাটানো, আইনি সমস্যায় ফাঁসিয়ে দেওয়া- এইসব হাজারো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের ভেতরে যে সীমাহীন ক্ষোভ-হতাশা-রাগ-বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে, তাকেই আরএসএস তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির পক্ষে ব্যবহার করে গেছে ।

সেই ব্যবহারের ফলাফল আমরা এবারের নির্বাচনে দেখতে পেলাম। এবারের নির্বাচনী প্রচারকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে যে নিচুমানের অরাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক প্রচার চালিয়ে গেলেন, সেই প্রচারের ভেতর দিয়েও কিন্তু তিনি কার্যত আরএসএস- বিজেপির তৈরি করা সামাজিক মেরুকরণের ভূগোলকে সব রকমভাবে প্রসারিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কার্যত বলতে পারা যায়, গত আট বছর ধরে এ রাজ্যে বিজেপিকে সংসদীয় রাজনীতিতে একটা সুবিধাজনক অবস্থায় পাইয়ে দিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার দল এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্ত রকমভাবে ব্যবহার করে গেছেন।

বস্তুত তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে প্রথম থেকেই একটা বড় অংশের এমন ধরনের মানুষ থেকে গেছেন, যারা শারীরিকভাবে করে কম্মে খাওয়ার তাগিদ থেকে তৃণমূল কংগ্রেস করলেও, মানসিকভাবে রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী চিন্তা চেতনার দ্বারা তাড়িত ছিলেন। সেই অংশটি তাদের দলের ভেতরে গত আট বছর ধরে মমতার এই ভেকধারী সংখ্যালঘু প্রীতির বিষয়টিকে কেন্দ্র করে নিজের নিজের জনমণ্ডলীর  ভেতর হিন্দু ভোটকে একত্রিত করে, সেই ভোটকে বিজেপির বাক্সে চালান করবার জন্য সবরকম ভাবে চেষ্টা করে গেছেন।

অপরপক্ষে মমতা গত নির্বাচনে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিয়ে একটা লোক দেখানো সোচ্চার মানসিকতা দেখালেও সাধারণ মানুষের কাছে এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে উঠেছে যে, তাহলে কেন তিনি বাজপেয়ির আমলে প্রায় সাড়ে ছয় বছর এই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছিলেন ? তাদের হয়ে, তাদের সঙ্গে মন্ত্রিসভায় অংশ নিয়েছিলেন? বাজপেয়ির আমলে বাজপেয়ি ভালো, আর আডভানি ‘খারাপ ‘- এই তত্ত্বে মমতা সাধারণ মানুষকে ভুল বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন। তেমনি মোদি জামানাতে মোদি ‘খারাপ’ এবং একদা মমতার কাছে’ খারাপ’ আডভানি  ভালো  তে পরিণত হন। মোদিকে  খারাপ বোঝাতে নীতিন গড়করি, অরুণ জেটলি প্রমুখের  প্রতি মমতা তার উচ্ছ্বাস গোপন রাখেননি।

এইসব ঘটনাক্রম মমতার বিজেপি বিরোধিতার ভেতরে যে দ্বিচারিতা, সেই দ্বিচারিতাকে সাধারণ মানুষের ভেতরে, এমনকি তার নিজের দলের কর্মী-সমর্থকদের ভিতরেও খুব পরিষ্কার করে দিয়েছেন। সেই দ্বিচারিতার নিরিখেই সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ, এমনকি তার দলেরও একটা বড় অংশ ,যারা করে-কম্মে খাওয়ার তাগিদে মমতার প্রতি এতদিন আস্থাশীল ছিলেন, তারা আরও বড় রকমের করে-কম্মে খাওয়ার তাগিদ থেকেই সেই আস্থাটা এখন বিজেপির প্রতি প্রকাশ করেছেন ।

গত আট বছর ধরে মমতা প্রশাসন পশ্চিমবঙ্গে কার্যত কোনও বিরোধী দলকেই রাজনীতি করতে দেয়নি। বিজেপির পেছনে আরএসএসের এক ধরনের সামাজিক রাজনৈতিক ব্যাক-আপ আছে। বিজেপি অতীতেও জরুরি অবস্থার কালে, যখন তাদের পরিচিতি ছিল ‘ভারতীয় জনসংঘ’ হিসেবে, তখন রাজনৈতিক কাজকর্ম করতে না পারলে, সেই কাজকর্মগুলিকে সামাজিক ভিত্তিতে রূপান্তরিত করে আরএসএস এবং আরএসএসের নানা ধরনের শাখা সংগঠনের  ভেতর দিয়ে কাজ করে গেছে ।

একই অবস্থা গত ৮ বছরের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সম্পর্কেও আংশিকভাবে বলা যায়। ‘আংশিক’  শব্দটা  এই কারণে উল্লেখ করা হলো যে, গত ২০১৬ সালের বিধানসভার ভোটকে কেন্দ্র করে বিজেপির প্রাণ-ভোমরা আরএসএসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  বা তার দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি দুর্বলতার কথা, সাহায্য- সহযোগিতার কথা খোদ বিজেপি নেত্রী উমা ভারতী এ রাজ্যে এসে প্রকাশ্যে স্বীকার করে গিয়েছিলেন ।

গত বিধানসভা নির্বাচনে খড়গপুর আসন থেকে দীর্ঘদিনের বিধায়ক, কংগ্রেসের জ্ঞান সিং সোহন পালকে হারিয়ে বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের জয়ী হওয়ার ঘটনা, তার পেছনে মোদি-মমতার বোঝাপড়াকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের ভেতরে অনেক গুঞ্জন আছে। বিজেপি গত ৮ বছরে মমতার লোক দেখানো বিরুদ্ধতার সম্মুখীন হলেও আরএসএস এবং তার বিভিন্ন ধরনের শাখা সংগঠনগুলির সাহায্যে সামাজিক বিস্তারের ভেতর দিয়ে তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ‘সাম্প্রদায়িকতা’-কে এ রাজ্যের প্রায় প্রতিটি মানুষের ভেতরে গেঁথে দেওয়ার জন্য সব রকমভাবে চেষ্টা করে গেছে।

সেই চেষ্টার আংশিক সাফল্য যে তারা সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের ফলের  ভেতর দিয়ে পেয়েছে- সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বামপন্থিরা এই সুযোগটা কোনও অবস্থাতেই পাননি। মমতা কার্যত গত আট বছর ধরে বিরোধী রাজনীতি টুঁটি চেপে ধরে, একদম ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাজ্য পরিচালনার জন্য বামপন্থী রাজনীতির উপর ভয়াবহ অত্যাচার করে গেছেন। শহর থেকে গ্রাম-গঞ্জে সর্বত্র বামপন্থি নেতাকর্মীদের শারীরিক-মানসিক, অর্থনৈতিক, আইনগত-  সব ধরনের হেনস্থা তিনি করে গেছেন। এই আক্রমণকে  প্রতিহত করবার জন্য সরাসরি রাজনৈতিক কার্যক্রমের  বাইরে সে অর্থে বামপন্থিদের কোন সামাজিক শেকড় বিস্তারের সুযোগ সুবিধা ছিল না।

আরএসএস বা তার শাখা সংগঠনগুলোর সুযোগ নিয়ে বিজেপি যেভাবে নানা ভঙ্গিমায় নিজেদের রাজনৈতিক বিস্তার ঘটিয়েছে এ রাজ্যে, যে বিস্তারের পিছনে মমতা প্রশাসনের পরিচ্ছন্ন মদত ছিল, সেই ধরনের কোন সামাজিক সহযোগী সংগঠন বামেদের ছিল না। এই ধরনের সংগঠন না থাকার দরুণ মমতার চরম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিহিংসাপরায়ণ মানসিকতার কারণে বামপন্থিরা সেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখা বা তাকে বিস্তার করার সুযোগ পাননি।

গত ৮ বছরে আমাদের জাতীয় আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক দলগুলি বা সশস্ত্র বিপ্লববাদী বিশ্বাসী গোষ্ঠীগুলি নিজেদের মতাদর্শের বিস্তারের উদ্দেশ্যে, নিজের নিজের এলাকায় সামাজিক ভিত্তি থেকে জোরদার করবার উপর অত্যন্ত জোর দিতেন। পরবর্তীকালে বামপন্থিরা তাদের রাজনৈতিক বিস্তারের ক্ষেত্রে এই সামাজিক বিস্তারের উপরেও কিন্তু অত্যন্ত জোর দিতেন। তাদের সামাজিক বিস্তারের একটি বড় অংশ ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। পাঁচ, ছয় বা সাতের  দশকে আমাদের এই বাংলায় বামপন্থি আন্দোলনকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বামপন্থিদের নেতৃত্বে প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একটা বড় রকমের ভূমিকা পালন করেছিল ।

সেই বামপন্থিরাই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সময়কালে ধীরে ধীরে এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক, সাহিত্যমূলক বিনোদন, সুস্থ-বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের ধারা থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন অর্থাৎ পৌরসভা, পঞ্চায়েত ইত্যাদির সংযোগকে ঘিরে- সেটিকেই সামাজিক ক্ষেত্রে বিস্তারের একমাত্র উপক্রম হিসেবে ধরে নেন। সেই জায়গা থেকে ধীরে ধীরে সময়ের নিরিখে বাংলার গ্রাম এবং শহরের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যে  অদল-বদল ঘটছে, তার সময় উপযোগী বিবর্তন তারা নিজেদের মধ্যে ঘটাতে পারেন না ।

স্থানীয় প্রশাসনগুলো অর্থাৎ পৌরসভা পঞ্চায়েত ইত্যাদিকে ঘিরে ক্ষমতা ও অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণের যে দৃষ্টিভঙ্গি বামপন্থি রাজনীতির ‘৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ছিল, সেই জায়গাটি ক্রমশ হয়ে ওঠে পছন্দের কিছু মানুষ বা গোষ্ঠীকে কিছু পাইয়ে দেওয়ার একটি উপকরণে। যে বামপন্থিদের নেতৃত্বে একদিন গণ-নাটের প্রবাহমানতা গোটা বাংলায় প্লাবন দেখা দিয়েছিল, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের ‘নবজীবনের গান’ তেতাল্লিশের মন্বন্তরের বাংলা-কে নতুন করে সংকল্পে স্থিত থেকে রুখে দাঁড়াবার শক্তি যুগিয়েছিল, সেই বাংলাতেই একদল লোক বামপন্থার নাম করে’ হোপ ৮৬’ থেকে শুরু করে সামান্তা ফক্সকে নিয়ে নাচানাচি করবার সুযোগ পেয়েছে ।

বামপন্থিদের সামাজিক ভিত্তি থেকে সরে যাওয়ার কার্যকারণ এবং সেই কার্যকারণকে কিন্তু হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবির সব রকমভাবে ব্যবহার করে গেছে। যে বাংলায় একদা নিজেদের মতাদর্শের প্রচার-প্রসারের স্বার্থে বামপন্থিরা নৈশ বিদ্যালয় থেকে শুরু করে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, সাহিত্য পত্রিকা ইত্যাদির ভেতর দিয়ে মানুষের মনে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সামাজিক অনগ্রসরতা, জাতপাতের নামে নোংরামি ইত্যাদি সরানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গিয়েছিলেন, সেই পর্যায়ক্রমটি শুকিয়ে যাওয়ার সুযোগেই সেই পতিত জমিতে সরস্বতী শিশু মন্দির, বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, ভারত সেবাশ্রম সংঘ ইত্যাদি সংগঠনের সুযোগ নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ‘সাম্প্রদায়িকতা’র প্রচার ও প্রসারের স্বার্থে মন প্রাণ দিয়ে কাজ করে গেছে আরএসএস।

তাদের এই কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে এ রাজ্যে সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা। সেই প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়েই তাদের লক্ষ্য ছিল এ রাজ্যের সংসদীয় গণতন্ত্রে নিজেদের দখলদারি কায়েম করা। একদা বামপন্থিদের শক্ত রাজনৈতিক সামাজিক ভিত্তি এবং বুনিয়াদের  দরুণ সেই কাজ সরাসরি আরএসএস করতে পারেনি। সেদিন তাদের সেই কাজ করবার জন্য সহায়ক শক্তির দরকার ছিল। নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার তাগিদে সেদিন আরএসএস- বিজেপির এই রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির সহায়ক শক্তি হিসেবে নিজেকে সর্বাত্মকভাবে সঁপে দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ।

দুর্ভাগ্যের বিষয় বামপন্থিরা যেমন সংখ্যাগুরু প্রধান এলাকাতে নিজেদের রাজনৈতিক ভিত্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে সামাজিক ভিত্তিকে, সংস্কৃতিক ভিত্তিকে প্রবাহমান রাখবার তাগিদ অনুভব করেননি, তেমনি সংখ্যালঘু প্রধান এলাকাগুলিতে ও সংখ্যালঘুদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক অধিকার এবং উত্তরাধিকার বজায় রাখবার ক্ষেত্রে সেভাবে তাগিদ অনুভব করেননি ।

বামপন্থি রাজনীতির ভেতরে জন্মসূত্রে মুসলমান যেসব নেতৃত্ব সেই তাগিদ অনুভব করে সচেষ্ট হওয়ার চেষ্টা করেছেন, অত্যন্ত বেদনার কথা হলো এই যে, সেইসব নেতৃত্বের গায়ে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমা সেঁটে দেওয়ার একটা গোপন প্রচেষ্টা চলেছিল। এই যে পর্যায়ক্রম, সেটার পরিপূর্ণ সুযোগ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রহণ করেছেন ।

বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসবার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এ রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ ঘটিয়েছিলেন। মুসলমান সমাজের একটা বড় অংশের ভেতরে আধুনিকতা, বিজ্ঞানমনষ্কতা প্রসারে সচেষ্ট থেকেছে বামফ্রন্ট সরকার। সেই সংখ্যালঘু সমাজকেই নানাভাবে বিভ্রান্ত করে এবং তাদের কিছু ন্যায্য ক্ষোভকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে, সেই মুসলমান সমাজকে নিজের ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করেছেন  মমতা।

সেই ব্যবহারের পাল্টা হিসেবে একটা ধারাবাহিক পদ্ধতির ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে হিন্দু ভোট ব্যাংক, যারা এতোকাল জাত-পাত বা ধর্ম-  এসবের কোনও তোয়াক্কা না করে বামপন্থিদের ভোট দিয়ে গেছেন, সেই  বিপুল অংশের মানুষকে অত্যন্ত পরিকল্পনামাফিক মমতা  ঠেলে দিয়েছেন হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের দিকে। ফলে একদা বামপন্থিদের ভোট দেওয়া, জন্মসূত্রে হিন্দু, অথচ ধর্ম নিয়ে সেভাবে মাথা না ঘামানো মানুষ- খুব সহজেই মোদি-মমতার তৈরি করা ‘গট আপ গেম’- মেরুকরণের রাজনীতির শিকার হয়ে নিজেদের বামপন্থি রাজনীতির প্রতি আস্থাটা রাতারাতি রূপান্তরিত করেছে রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শিবিরের প্রতি আস্থাতে ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে রাজনৈতিক হিন্দু মৌলবাদী শিবিরকে সমর্থনের ভিতর দিয়ে।

পরিশেষে একটি ঘটনাক্রম উল্লেখ করেই এই আলোচনা শেষ করবো। কেইস স্টাডি হিসেবে এই ঘটনাক্রমের ভেতর দিয়েই অনেক বলা, না বলা কথার উত্তর পাঠক পেয়ে যাবেন। বামফ্রন্টের অন্তর্গত  আরএসপি তাদের দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, গোয়া মুক্তি আন্দোলনের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব ত্রিদিব চৌধুরী। লোকসভায় দাঁড়িয়ে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সামনে চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন, ‘শাসন করুন ,নয় গদি ছাড়ুন’। ত্রিদিব চৌধুরী তার নিজের নামে একটি কলোনি তৈরি করেছিলেন দক্ষিণ ২৪  পরগনার গোসাবা অঞ্চলে।

গত ৮ বছরে সংশ্লিষ্ট দলের নেতারা  একটি বারের জন্যও সেই কলোনিতে যাননি। সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের আগে, ভোট প্রচারের সময়, সেই দলের নেতারা যখন ওই কলোনিতে যান, তখন সেই কলোনির  মানুষেরা তাদের বলেন- এতদিন কোথায় ছিলেন? মমতা প্রশাসন, পুলিশি হেনস্তা, আইনি হেনস্তার ভেতর দিয়ে আমাদের জীবন একেবারে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। স্থানীয় বিজেপির নেতা কর্মীরা এগিয়ে এসে আমাদের সব রকমের আইনি, সামাজিক সুরক্ষা দিয়েছে। আপনাদের তো তখন টিকিটিরও দেখা আমরা পাইনি ।

কলোনির এই মানুষদের ইশারার ভেতর দিয়েই যা কিছু বোঝার সমঝদার পাঠক আশা করি বুঝে নেবেন।