রেকর্ড রাঙা জয়ে শুরু বাংলাদেশের বিশ্বকাপ

লন্ডন থেকে আরিফুল ইসলাম রনি>
সকাল থেকেই মাঠের চারপাশে ছিল উৎসবের আবহ। ওভালের চিরচেনা রঙ পাল্টে গিয়েছিল লাল-সবুজের ছটায়। বাংলাদেশের সমর্থকদের নাচ, গান, বাদ্য আর স্লোগান দিয়ে শুরু যে দিনের, সেটির শেষ অসাধারণ জয়ের বাঁধনহারা উন্মাদনায়। রেকর্ড জুটি, দলের রেকর্ড রান আর সাকিব আল হাসানের রেকর্ড গড়া কীর্তির সিঁড়ি বেয়ে বাংলাদেশ পেয়ে গেল জয়ের ঠিকানা।

দারুণ জয়ে শুরু হলো এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পথচলা। ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের সাতে থাকা দল ২১ রানে হারিয়েছে তিনে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকাকে।

ওভালে রোববার বাংলাদেশকে রেকর্ড রানের উচ্চতায় তুলে নিয়েছিলেন ব্যাটসম্যানরা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমবার তিনশ ছুঁয়ে, বিশ্বকাপে নিজেদের আগের সর্বোচ্চ পেরিয়ে, বাংলাদেশ গড়ে নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্কোর, ৩৩০। দক্ষিণ আফ্রিকা লড়াই করেছে, তবে থমকে গেছে ৩০৯ রানে।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের আগের সর্বোচ্চ ছিল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩২২। ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩২৯। এবার নতুন রেকর্ডে নেই কোনো সেঞ্চুরি। আছে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ইনিংসের মেরুদণ্ড তৃতীয় উইকেটে সাকিব ও মুশফিকুর রহিমের ১৪২ রানের জুটি, বিশ্বকাপে যে কোনো উইকেটেই বাংলাদেশের সেরা।

বোলিংয়ে মাশরাফি মুর্তজার ছিল বিরল বাজে দিন। তবে যথারীতি দুর্দান্ত ছিলেন দুই স্পিনার সাকিব ও মেহেদী হাসান মিরাজ। বিবর্ণ শুরুর পর কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন সাইফ উদ্দিন। আসল পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন দলের মূল স্ট্রাইক বোলার মুস্তাফিজুর রহমান। টানা চার বিশ্বকাপে দলের প্রথম ম্যাচে ফিফটির অনন্য কীর্তির পর গুরুত্বপূর্ণ একটি উইকেট নিয়েছেন সাকিব। গড়েছেন সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে ৫ হাজার রান ও আড়াইশ উইকেটের রেকর্ড। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার এই ম্যাচেরও সেরা। দলের জয়ের নায়ক।

বাংলাদেশের শুরুটাই ছিল চ্যালেঞ্জ জয়ের বার্তা দিয়ে। আগের ম্যাচে ব্যবহৃত উইকেটে টস জিতে বোলিং নেন ফাফ দু প্লেসি। দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়কের চাওয়া ছিল, গতি ও বাউন্সে বাংলাদেশকে ভড়কে দেওয়া। সৌম্যর ব্যাটের ধারে উল্টো কাবু প্রোটিয়ারাই!

শুরুটা ছিল খানিকটা সাবধানী। পঞ্চম ওভারে লুঙ্গি এনগিডির টানা দুটি শর্ট বলে দারুণ দুটি পুল শটে শুরু হয় সৌম্যর দাপট। দৃষ্টিনন্দন কিন্তু স্পর্ধার ছাপ রাখা সব শটের পসরা মেলে ধরেন বাঁহাতি ওপেনার।

চোট কাটিয়ে খেলতে নামা তামিম ইকবালের ব্যাটে শুরুতে অস্বস্তি থাকলেও দারুণ দুটি চারে তিনিও কাটান জড়তা। ৮ ওভারে রান উঠে যায় ৫৮।

তামিমকে বেশি দূর এগোতে দেননি আন্দিলে ফেলুকোয়ায়ো। নিজের প্রথম ওভারে দলকে এনে দেন প্রথম উইকেট। ক্রিস মরিস নিজের প্রথম ওভারে শর্ট বলে ফেরান সৌম্যকে। তবে ৩০ বলে ৪২ রানের ইনিংসে দলকে জ্বালানি জুগিয়ে যান বাঁহাতি ওপেনার সৌম্য।

সেই শুরুটাই চালিয়ে নিয়ে গেছেন সাকিব ও মুশফিক। দেখিয়েছেন কেন তাদের জুটিই সেরা। সিঙ্গেল-ডাবলস নিয়ে সচল রেখেছেন রানের চাকা। বাংলাদেশের সফলতম জুটি দলকে এগিয়ে নেন বড় স্কোরের পথে।

দুজন এগিয়ে যাচ্ছিলেন পাশাপাশিই। ৫৪ বলে ফিফটি স্পর্শ করেন সাকিব, ৫২ বলে মুশফিক।

এ নিয়ে টানা চার বিশ্বকাপে দলের প্রথম ম্যাচে ফিফটির প্রথম নজির গড়লেন সাকিব। মুশফিকও কম যান না। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে পঞ্চাশ তার হলো তৃতীয়বার। হাতছানি থাকলেও দুজনের কেউ শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের প্রথম সেঞ্চুরি ছুঁতে পারেননি। ৮৪ বলে ৭৫ করে ফেরেন সাকিব, ৮০ বলে ৭৮ মুশফিক।

এই দুই উইকেটের মাঝে ২১ বলে ২১ রান করে আলগা শটে আউট হন মোহাম্মদ মিঠুন। কিছুটা কমে যায় রানের গতি। ৪০ ওভারের পর প্রথম ৬ ওভারে রান আসে কেবল ৩২।

তবে শেষ ৪ ওভারে সব পুষিয়ে যায় মাহমুদউল্লাহ ও মোসাদ্দেক হোসেনের ব্যাটে। ৪১ বলে ৬৬ রানের জুটি গড়েন দুজন। ২০ বলে ২৬ রানে আউট হন মোসাদ্দেক। ৩৩ বলে অপরাজিত ৪৬ মাহমুদউল্লাহ। শেষ ৪ ওভারে বাংলাদেশ তুলেছে ৫৪ রান।

হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে এনগিডিকে পুরো সময় পায়নি দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে নিজের প্রথম ৪ ওভারে এই পেসার দিয়েছিলেন ৩৪ রান।

রান তাড়ায় দ্রুত শুরু এনে দেওয়ার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার বড় বাজি ছিলেন কুইন্টন ডি কক। তবে নতুন বলে মুস্তাফিজ ও মিরাজ খুব একটা ডানা মেলতে দেননি তাকে। সতর্ক ব্যাটিংয়ে যদিও শুরুটা তাদের খারাপ হয়নি।

৪৯ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙে রান আউটে। মিরাজের বলে ডি ককের ক্যাচ উইকেটের পেছনে ছাড়েন মুশফিক। তবে ফসকে যাওয়া বলে রান চুরি করতে গিয়ে মুশফিকের সরাসরি থ্রোয়েই ডি কক ফেরেন ২৩ রানে।

আগের ম্যাচে পাওয়া চোটের কারণে ছিলেন না হাশিম আমলা। ইনিংস শুরু করা এইডেন মারক্রামকে নিয়ে দলকে পথে রাখেন দু প্লেসি। দুজনের জুটিতে দক্ষিণ আফ্রিকা ছিল নিয়ন্ত্রণেই।

ত্রাতা হয়ে আসেন তখন সাকিব। ডানহাতির জন্য অ্যাঙ্গেলে ভেতরে ঢোকা দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে বোল্ড করে দেন ৪৫ রান করা মারক্রামকে।

দক্ষিণ আফ্রিকা জুটি গড়েছে এরপরও। রান পেয়েছেন মিডল অর্ডারে সবাই। তবে কোনো জুটিকে খুব হুমকি হয়ে উঠতে দেয়নি বাংলাদেশ, লম্বা সময় খেলতে দেয়নি কোনো ব্যাটসম্যানকে। সময়মতোই ধরা দিয়েছে উইকেট।

দুর্দান্ত খেলতে থাকা দু প্লেসির ৫৩ বলে ৬২ রানের ইনিংস থেমেছে মিরাজকে বেরিয়ে এসে খেলতে গিয়ে। মিরাজ পরে মুস্তাফিজের বলে দারুণ ক্যাচে ফিরিয়েছেন ডেভিড মিলারকে।

বিপজ্জনক হয়ে উঠতে থাকা রাসি ফন ডার ডাসেন ৪১ রানে বোল্ড হয়েছেন সাইফকে ক্রস ব্যাটে খেলতে গিয়ে। আরেক হুমকি ক্রিস মরিসকে থামিয়েছেন মুস্তাফিজ।

দক্ষিণ আফ্রিকার আশা টিকে ছিল যতক্ষণ ছিলেন দুমিনি। ৩৭ বলে ৪৫ রান করা ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করে দেন মুস্তাফিজ।

ম্যাচ শেষ হতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে ওভালের গ্যালারি। প্রায় ২৪ হাজার দর্শকের বেশিরভাগই হয়তো ছিল বাংলাদেশের সমর্থক। তাদের স্লোগানমুখর দিনের শেষ হয় জয়ের গর্জনে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ৩৩০/৬ (তামিম ১৬, সৌম্য ৪২, সাকিব ৭৫, মুশফিক ৭৮, মিঠুন ২১, মাহমুদউল্লাহ ৪৬*, মোসাদ্দেক ২৬, মিরাজ ৫*; এনগিডি ৪-০-৩৪-০, রাবাদা ১০-০-৫৭-০, ফেলুকোয়ায়ো ১০-১-৫২-২, মরিস ১০-০-৭৩-২, মারক্রাম ৫-০-৩৮-০, তাহির ১০-০-৫৭-২, দুমিনি ১-০-১০-০)

দক্ষিণ আফ্রিকা: ৫০ ওভারে ৩০৯/৮ (ডি কক ২৩, মারক্রাম ৪৫, দু প্লেসি ৬২, মিলার ৩৮, ফন ডার ডাসেন ৪১, দুমিনি ৪৫, ফেলুকোয়ায়ো ৮, মরিস ১০, রাবাদা ১৩*, তাহির ১০*; মুস্তাফিজ ১০-০-৬৭-৩, মিরাজ ১০-০-৪৪-১, সাইফ ৮-১-৫৭-২, সাকিব ১০-০-৫০-১, মাশরাফি ৬-০-৪৯-০, মোসাদ্দেক ৬-০-৩৮-০)

ফল: বাংলাদেশ ২১ রানে জয়ী

ম্যান অব দা ম্যাচ: সাকিব আল হাসান