বাজেট বাস্তবসম্মত : সিপিডি

 

স্পন্দন নিউজ ডেস্ক : শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে হোটেল লেকশোরে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিমত তুলে ধরেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তিনি বলেন, আর্থিক কাঠামোর ক্ষেত্রে আমরা যেটা দেখছি রাজস্ব আদায়ের হারকে ব্যয় হারের ওপরে রাখা হয়েছে। এটা ভালো। কারণ সম্পদ আরও বেশি আসতে হবে ব্যয় হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। সেই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়কে আরও অধিকতরভাবে রাখা হয়েছে। এটাও সঠিক হয়েছে। ব্যয় এবং আয়ের যে তুলনামূলক প্রবৃদ্ধি সেটা সঠিক আছে বাজেটের মধ্যে।

তিনি বলেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি বিনিয়োগের দিক থেকে আমরা মোটামুটিভাবে ভালো অবস্থানে আছি। তবে সাধারণভাবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা দুর্বল জায়গায় আছি। এর মূল কারণ ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। একইভাবে সঞ্চয় হারের ক্ষেত্রেও আমরা দুর্বল জায়গায় আছি।

সিপিডির বিশেষ এই ফেলো বলেন, অর্থনীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তন হচ্ছে। এর অন্যতম লক্ষণ হলো কৃষিখাতের অবদান কমছে এবং শিল্পখাতের অবদান বাড়ছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমাদের ৫০ শতাংশ উৎপাদন আসছে সেবা খাত থেকে এবং সেটা হলো খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা। এটা কোনো স্বাস্থ্যকর তথ্য না।

তিনি বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগসহ অন্যান্য প্রাক্কলন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় কম। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ধরা হয়েছিল ২৫ শতাংশ, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে ধরা হয়েছে ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ উনি (অর্থমন্ত্রী) কিন্তু চিন্তাটা সামনের দিকে করেছেন। এটাই কিন্তু বাস্তবতার লক্ষণ।

‘বাড়িয়ে বলার থেকে বাস্তবতার নিরিখে বলাটায় সঠিক বলে আমরা মনে করি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই বাস্তব চিত্র উনি শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবেন কি-না। বিনিয়োগের বিষয়টা যেমন বাস্তবতার নিরিখে করা হয়েছে, রাজস্বের বিষয়েও আমরা একই অবস্থা দেখছি। রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তার সবগুলো ২০১৮-১৯ অর্থবছরের থেকে নিচে’ বলেন দেবপ্রিয়।

তিনি আরও বলেন, জিডিপির অংশ হিসেবে দেখলে দেখা যাবে আমদানি, রফতানি এবং রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে যে সমস্ত লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে তা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নিচে। এটাকে আমরা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য হিসেবে দেখতে চাচ্ছি। আমরা এটার সমালোচনা করছি না।

এ সময় রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে দেয়া নগদ প্রণোদনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, রফতানি ও রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে নগদ প্রণোদনা না দিয়ে টাকার মূল্যমান সমন্বয় করা উচিত ছিল। সমন্বয় করে টাকা অবমূল্যায়ন করা হলে রফতানি ও রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রণোদনা দেয়া যেত।

বর্তমানে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার ওপর নিট সম্পদ থাকলে সারচার্জ প্রদান করতে হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে সারচার্জ আরোপের এ নিম্নসীমা বৃদ্ধি করে ৩ কোটি টাকায় নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন পক্ষ থেকে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর দাবি জানানো হলেও তার প্রতিফল ঘটেনি বাজেটে।

এর সমালোচনা করে দেবপ্রিয় বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মধ্যবিত্তদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি। আবার সারচার্জকৃত সম্পদের সীমা বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, যারা আয় করে তাদের জন্য সুবিধা বা প্রণোদনা দেয়া হয়নি। কিন্তু যারা সম্পদের ওপর নির্ভরশীল তাদের সুবিধা দেয়া হয়েছে। কেন দেয়া হয়েছে, আমাদের কাছে এটি বোধগম্য নয়। এটি সরকারের নির্বাচনী চেতনার সঙ্গেও মিলে না।

তিনি বলেন, পুরো বাজেটের রাজস্ব পদক্ষেপ যদি দেখি- স্বচ্ছল ও উচ্চ আয়ের মানুষকে অনেক বেশি সুবিধা দিচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও বিকশিত মধ্যবিত্ত এটা থেকে খুব বেশি উপকৃত হবে না। বাজেটে অপশাসনের সুবিধাভোগীদের সুবিধা দেয়া হয়েছে।

ধনী-গরিবের বৈষ্যম বাড়ায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জিডিপির প্রবৃদ্ধির ধরে রাখা সম্ভব হবে না এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, যেই সমাজে বৈষ্যম বৃদ্ধি পায়, সেই সমাজ আজ হোক কাল হোক টেকে না, আগাতে পারে না। সেই সমাজে প্রবৃদ্ধির হারে পতন ঘটে। যে ভাবে বাংলাদেশে বৈষ্যম বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে ৭, ৮, ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি টেকানো কষ্টকর হবে। এটা ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক তত্ত্বে সত্য।

দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশ তো সৃষ্টি হলো বৈষ্যমের কারণে। দেশটা তো টিকলোই না বৈষ্যমের কারণে। আপনারা বুঝতে পারছেন কোন জায়গাতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাই হয়েছে বৈষ্যমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। তো ওই বৈষ্যম যদি দেশের ভেতরে বাড়তে থাকে তাহলে আগামী দিনে আমি কেমন করে ওই জায়গাতে (সমৃদ্ধ বাংলাদেশ) পৌঁছাব।

তিনি বলেন, গরিব মানুষের ছেলে-মেয়ে ঝরে পড়ে বেশি। আপনাদের ছেলে-মেয়েরা তো স্কুল থেকে ঝরে পড়ে না। গড় যেয়ে তো পড়ে তার ওপরে। ইশতেহারে বলা হয়েছে গরিব মানুষের পক্ষে। এইবারের ইশতেহার সুগঠিত, সুলিখিত, সুশ্চিন্তিত একটি দলিল। এটাকে আমি সিরিয়াসলি নেয়। যারা লিখেছেন তারা নেন কিনা যানি না। আমি খুব সিরিয়াসলি নেয়। সেখানে বলা আছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি সুষম সমাজ বিকশিত হবে আগামীদিনে এবং উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে যাবে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক-পুঁজিবাজার থেকে যারা অন্যান্য সুবিধা নিয়েছেন, তারা পরিবর্তন আনতে চান না, স্বচ্ছতা চান না। ব্যাংক কমিশন হলে তথ্য-উপাত্তের যে সমস্যাগুলো আছে, সেগুলো প্রকাশিত হলে কি হবে? এই দুশ্চিন্তা থেকেই ব্যাংক কমিশন করা যাবে না। অন্য পদক্ষেপ তো পরের কথা। শুধু স্বচ্ছতাকে ভয় পাই বলেই এটা করতে পারব না।