পান চাষে বছরে শত কোটি টাকা আয় যশোরের চাষিদের


যশোরে চলতি মৌসুমে এক হাজার ৪৩ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে। গত বছর পানের আবাদ হয়েছিল এক হাজার ১৫২ হেক্টর জমিতে। যা থেকে পান উৎপাদন হয়েছিল ৫ হাজার ১৯২ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগ বলছে ২শ’ টাকা করে পানের পণ বিক্রি হলে ৫ হাজার মেট্রিক টন পান থেকে চাষিরা শতকোটি টাকার পান উৎপাদন করছেন।

তবে চাষিরা বলছেন, এখন ভরা বর্ষা মৌসুম। এসময় পান চাষের জন্য উপযোগী সময়। কিন্তু তীব্র খরার কারণে পানক্ষেত নষ্ট হবার আশংকা রয়েছে। এতে লোকসান হতে পারে তাদের। বরজ মালিক ও চাষিদের অভিমত কৃষি সম্প্রষারণ অধিদফতরের পরামর্শ ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ জেলায় পান চাষ আরো সম্প্রসারিত হতো।

কৃষি বিভাগ বলছে, পান চাষ বাড়াতে আরো ব্যাপক গবেষণা করা প্রয়োজন। তাছাড়া পান চাষে ঋণ নেবার সুযোগও রয়েছে।

চর্ব্যজাতীয় পণ্য হিসেবে পান প্রাচীনকাল থেকে এ দেশে সমাদৃত। এর বৈজ্ঞানিক নাম পিপার ব্যাটেল। যেখানে পানি জমে না এবং মাটি কালো দো-আঁশ সেখানে পান ভালো জন্মায়।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, বর্তমানে যশোরের ৮ উপজেলার এক হাজার ৪৩ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হচ্ছে পান। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পান চাষ হচ্ছে অভয়নগর উপজেলায় ৪১০ হেক্টর জমিতে। এছাড়া কেশবপুর উপজেলায় ২৭১ হেক্টর, মণিরামপুর উপজেলায় ১৫০ হেক্টর, সদর উপজেলায় ৭৫ হেক্টর, চৌগাছায় ৯৩ হেক্টর, বাঘারপাড়ায় ২৯ হেক্টর, ঝিকরগাছায় ১২ হেক্টর ও শার্শা উপজেলায় ৩ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। এসব এলাকায় মূলত মিষ্টি, সাচি ও জাল পানের আবাদ হয়। ভালো লাভ পাওয়ায় পুরনো চাষীদের পাশাপাশি নতুনরাও বরজ করছেন, এতে করে সম্প্রসারিত হচ্ছে পানের চাষ।

অভয়নগর উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে পান। ইউনিয়নের মধ্যপুর, বাগুটিয়া, পায়রা, শুভরাঢ়া, শ্রীধরপুর, সিদ্দিপাশা, প্রেমবাগ, চলিশিয়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে চলছে পান চাষ।

মধ্যপুর গ্রামের আব্দুস সাত্তার জানান, আষাঢ় মাসে মূলত পানের পল বা লতা রোপণ করা হয়। লতা রোপণের ছয়-সাত মাস পর পান পাতা সংগ্রহ শুরু হয়। ঠিকমতো পরিচর্যা করলে একটি বরজ থেকে ভালো পান পাওয়া যায়। তিনি বলেন, লাভ বেশি হওয়ায় পান চাষে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তাদের গ্রামের প্রায় দু’শ পরিবার সরাসরি পান চাষের সাথে জড়িত। আশপাশের গ্রামেও চলছে পানের চাষ।

একই গ্রামের পান চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, পান একটি দীর্ঘ মেয়াদী ফসল। একবার চাষ করলে ১০ থেকে ১৫ বছর ফসল পাওয়া যাবে। তবে প্রতিনিয়ত পরিচর্যায় রাখতে হয় পানের বরজ।

তিনি আরো বলেন, প্রতি সপ্তাহে দু’ থেকে তিনবার করে ১২ মাস সংগ্রহ করে বিক্রি করা যায়। যা খরচের তুলনায় অনেক লাভজনক।

ঝিকরগাছা উপজেলার মাটিকুমড়া গ্রামের মোস্তাক হোসেন জানান, এখন পান আবাদের সঠিক সময়। তবে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় তারা হতাশ। গত মৌসুমে আমরা ভালোমানের পানের পণ (৮০টি) বিক্রি করেছিলাম ২শ টাকায়। তবে ঢাকায় নিতে পারলে পানের দাম ভালো পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, কৃষি বিভাগ থেকে যদি পান চাষে উন্নত প্রশিক্ষণসহ সহযোগিতা ও সহজ শর্তে ঋণ পেতেন তাহলে পান চাষ আরো বিস্তুৃত করে লাভবান হতে পারতেন।

কৃষি সম্প্রষারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক এমদাদ হোসেন জানান, জেলার এক হাজার ৪৩ হেক্টর জমিতে পান চাষ করে গড়ে ২শ টাকা পণ বিক্রি হলে ৫ হাজার মেট্রিক টণে বছরে একশ কোটি টাকার পান বিক্রি করে থাকে কৃষকরা। একজন কৃষক এক থেকে দেড় বিঘা জমিতে পান চাষ করলে সেখান থেকে তার পরিবারের বাৎসরিক সব ব্যয় মিটিয়েও ৫ লাখ টাকা লাভ থাকে। এখন চাষিরা বরজ করা নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। বৃষ্টিপাত শুরু হলে পানের জন্য আর্শিবাদ বয়ে আনবে।

তিনি বলেন, তবে সমস্য হলো পান চাষ নিয়ে আমরা খুব একটা আধুনিক কলা কৌশল ও তথ্য আমরা কৃষকদের দিতে পারছি না। কারণ পান চাষ নিয়ে আমাদের দেশে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। তবে এখন সময় এসেছে ব্যাপকভাবে গবেষণার।

এদিকে পান চাষে কৃষি ঋণ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের যশোর অঞ্চলের উপমহা ব্যবস্থাপক মিলন কুমার নন্দী।

তিনি বলেন, যশোরে কৃষি ব্যাংকের ২২টি শাখা থেকেই পান চাষের জন্য ঋণ প্রদান করা হয়। যারা প্রকৃত পান চাষি ও যাদের জমি আছে তারা যদি নিয়ম মেনে আবেদন করেন তাহলে ঋণ পাবেন। আমরা তাদের ঋণ দিতে প্রস্তুত রয়েছে।