একালের সতীদাহ

রাজা রামমোহন রায় বেঁচে থাকলে আজও তাঁর সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যেতেন নাকি হাল ছেড়ে দিতেন বলা মুশকিল। প্রায় দুই শ বছর আগের কূপমণ্ডুক ব্রাহ্মণদের তিনি নিরস্ত্র করতে পারলেও, একালের নব্য ব্রাহ্মণদের তিনি বাগে আনতে পারতেন কিনা সন্দেহ। এই দেশে যেকোন হত্যা, রাহাজানি, দাঙ্গাবাজি, দুর্নীতি, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, নারী নির্যাতন বা অন্য কোনও অপরাধের ঘটনাকে জায়েজ করতে সবার আগে নারীর চরিত্রকে চিতায় চড়ানো হয়।

এই যে দেশজুড়ে এতো ধর্ষণ, এতো যৌন হয়রানি, এতো নারী নির্যাতন, তবু এসবের বিরুদ্ধে বিপুল জনমত গড়ে ওঠে না শুধু এই কারণে। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বিশ্বাস করে এই সবকিছুর জন্য মূলত মেয়েরাই দায়ী এবং তাদের ধর্ষণ করা, হয়রানি করা, অ্যাসিডে পুড়িয়ে দেয়া বা মারধোর করা ঠিকই আছে। তাই প্রতিটা ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি বা নারী নির্যাতনের পর প্রথমেই আঙুল ওঠে নিপীড়িত মেয়েটির দিকে। সবাই চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে বসে যায় মেয়েটির চরিত্র ঠিক ছিল কিনা, মেয়েটির পোশাক ঠিক ছিল কিনা, মেয়েটির চালচলন ঠিক ছিলো কিনা, মেয়েটি সতীসাধ্বী কিনা,  মেয়েটির কোন প্রেমিক ছিলো কিনা। সেইসব বিচারে যদি মেয়েটি কোয়ালিফাই করতে পারে, তবেই সবার ফুসরত মেলে অপরাধীর দিকে তাকানোর। স্বামীর জীবন-মৃত্যুর সাথে জুড়ে দেয়া সতীত্ব রক্ষার যে চিতা রামমোহন নিভাতে চেয়েছিলেন দুইশ বছর আগে, সেই চিতা একালের ব্রাহ্মণদের বুকে আজও জ্বলছে গনগনে শিখা হয়ে। চাক্ষুষ আগুন তারা হয়তো জ্বালায় না, কিন্তু নারীর চরিত্র বিচারের সামাজিক আগুনে পুড়িয়ে শেষ করে দিতে চায়। এর ব্যতিক্রম ঘটেনি বরগুনার হত্যাকাণ্ডের বেলাতেও।

বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত নামের মানুষটিকে কুপিয়ে হত্যার পর গতানুগতিকভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্রাহ্মণরা তাই মহা উৎসাহে রিফাতের স্ত্রীর চরিত্র বিশ্লেষণে বসেছে। সন্ত্রাসী খুনিদের নয়, রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রকান্তরে খুনিদের পক্ষের দাঁড়িয়েছে। যেহেতু মিন্নি নামের মেয়েটির বিয়ের আগে একটি প্রেমের সম্পর্ক ছিল, সেহেতু তাকে বিয়ে করা ছেলেটিকে মেরে ফেলা ঠিক আছে। খুনিকে নয়, মেয়েটির বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো ঠিক আছে। এবং ধর্ষকামী মগজ নিয়ে মিন্নির চরিত্র বিশ্লেষণ করা ঠিক আছে। ভাবখান এমন যে, একবার কোন সম্পর্কে জড়ালে বাঁচো আর মরো তার গলাতেই লটকে থাকতে হবে সারাজীবন। তাই যে মেয়েটি এই ভয়াবহ সন্ত্রাসের সামনে দাঁড়িয়ে একা লড়ে গেছে, তার পাশে না দাঁড়িয়ে খুনির অপরাধকে জায়েজ করতে বসেছে নব্য ব্রাহ্মণকুল।

জানেন কি, মিন্নির প্রাক্তন প্রেমিকও ঠিক আপনাদের মতোই ভাবে। আপনাদের এসব বিকৃত বিশ্লেষণ আর চিন্তাধারাই খুনের মূল উৎস। রিফাতকে কোপানো ছেলেগুলার সাথে আপনাদের আদতে কোনোই পার্থক্য নেই। ঠিক এই কারণেই, হ্যা আপনাদের এই অন্ধকার মগজ আর তার চিন্তাধারার কারণেই, এই সমাজে নয়নরা বুক ফুলিয়ে রিফাতদের হত্যা করার সাহস পায়। যেমন বুক ফুলিয়ে সদ্য বিধবাকে জ্বলন্ত চিতায় হত্যা করতো তৎকাালীন কূপমণ্ডুক ব্রাহ্মণরা। সদ্য বিধবা মেয়েটি শোক করার ফুসরত পেত না চিতায় পুড়ে মরার আতঙ্কে। এখনও পায় না আপনাদের কুৎসিত মানসিকতার চিতার ভয়ে। আপনারা মেয়েটির  চরিত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে আপনার মর্ষকামিতা প্রশমন করেন। হত্যাকে জায়েজ করার চেষ্টা করেন।

ঘটনাস্থলের নিষ্ক্রিয় জনগণ নয়, এই আপনারা বাঁচতে দেন না রিফাতদের। এই আপনারাই আইনের লোক, আপনারাইতো নেতা, নেতার হাতা, আপনারাই সরকার গঠন করেন, আপনারাই বিরোধীপক্ষ, আপনারাই সমাজ, আপনারাইতো জনগণ। এই দেশে প্রকাশ্যে খুন হবে নাতো কী হবে? এই আপনারাই এইসব জন্য দায়ী। এই আপনারা প্রত্যেকেই একেকজন খুনি।