ভাঙন আতঙ্কে রংপুরের তিস্তা পাড়ের ১৫ গ্রামের মানুষ

টানা বর্ষণ ও ডালিয়া পয়েন্ট থেকে নেমে আসা ঢলে রংপুরের কাউনিয়ায় তিস্তা নদীর পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীর তীরবর্তী গ্রামের মানুষদের মধ্যে বন্যা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গত শনিবার তিস্তার পানি প্রবাহ কমলেও নদীর ধারে তীরবর্তী গ্রামগুলোতে ভাঙন ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। নদীর অব্যাহত ভাঙনে উপজেলার হরিচরণ শর্মা গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে।  এছাড়া তিস্তার তীরবর্তী উপজেলার ১৫ গ্রামের মানুষরা এখন আছে আতঙ্কে। যে তিস্তা তাদের জীবনকে সহজ করেছে এতোদিন, সেটিই এখন ছড়াচ্ছে ভীতি। গত একসপ্তাহে নদী ভাঙতে ভাঙতে লোকালয়ের কাছাকাছি চলে এসেছে। এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে ফসলি জমি আর ফলজ বাগান। ভাঙনের ঝুঁকিতে আছে বসতবাড়ি ও ফসলি জমি।

সরজমিনে জানা গেছে, তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে উপজেলার তালুক শাহাবজ, নিজপাড়া, পাঞ্চরভাঙা, ঢুষমারা, কালীরহাট, আরাজী হরিশ্বর, চরআজম খাঁ, চরগনাই, চরবিশ্বনাথ, চর টাবু গ্রামের প্রায় ৮-১০ হাজার পরিবার রয়েছে হুমকির মুখে। ভাঙনের ভয় আর উৎকন্ঠায় প্রতিটি মুহুর্ত কাটছে ৭ গ্রামের কয়েক হাজার পরিবারের মানুষেরা। গত দুইদিনে তিস্তার কড়াল গ্রাসে হরিচরণ শর্মা গ্রামের আবু নছর মাষ্টার, আতাউর রহমান, মোফাজ্জল হোসেন, রফিকুল ইসলাম, মজিবর রহমান, জয়নুল আবেদীন, তোফাজ্জল হোসেনের পরিবারের বসতভিটা ও প্রায় ১০ হেক্টর ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষেরা ঘর বাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে মানবেতর জীবন যাবন করছেন। এলাকাবাসী তিস্তা প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণসহ নদী ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

টেপামধুপুর ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফি জানান, শনিবার সকালে তিস্তা নদী পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্বনাথ, চর গনাই, হয়বত খাঁ গ্রামের নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, সেই সাথে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারন করছে। নদীর তীরবর্তী হরিচরণ শর্মাসহ ৫টি গ্রামের মানুষেরা তাদের বসতবাড়ি অন্যত্রে সরিয়ে নিচ্ছে। বিষয়টি নির্বাহী অফিসার ও  প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসারকে অবগত করা  হয়েছে।

হরিচরণ শর্মা গ্রামের আতাউর রহমান জানান, শনিবার সকাল থেকে তিস্তায় পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকে। সন্ধায় পানি কমতে থাকে। আর পানি কমার সঙ্গে তীব্র ভাবে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। তিনি ইতিমধ্যে বসতবাড়ি অন্যত্রে সরিয়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, নদীর তীরবর্তী গ্রামের অনেকেই ভাঙন আতঙ্কে বসতবাড়ি সরিয়ে অন্যের জমিতে ঠাঁই নিয়েছে।

তিস্তার ভাঙনে বসত হারানো সুভা রানী (৪৫) ও মংলী রানী অনেকে বলেন, ‘হামরা ইলিপ (রিলিফ) চাই না বাপু। হামাক বাড়ি বানি দেউক সরকার। নদীতো হামার সউগ (সব) শেইস (শেষ) করি দেছে।’

পাঞ্জরভাঙা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আরমান আলীসহ তালুকসাহাবাজ গ্রামে তিস্তার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থ নিতাই, প্রানেশ্বর বলেন, নদীর তীরবর্তী ১৫টি গ্রামের হাজার হাজার নারী পুরুষ একত্রে হয়ে মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে সেতুর পূর্ব প্রান্তে ৩ কিলোমিটার প্রটেকশন রিভারব্যাঙ্ক (বেড়িবাঁধ) নির্মাণের দাবি জানিয়েছি আমরা। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি।

নদী তীরবর্তী গ্রামের মানুষরা ও নদী বিশেষজ্ঞরা জানান, তিস্তা সড়ক সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের পূর্ব দিকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত প্রটেকশন রিভারব্যাঙ্ক (বেড়িবাঁধ) বিস্তৃত করলেই কেবল ১৫টি গ্রাম রক্ষা পেতে পারে। নইলে আগামী দুই এক বছরের মধ্যে গ্রামগুলোর বসতবাড়ি ভিটেমাটি ও ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। নদীর পাড়ের ভাঙন আতঙ্ক মানুষরা জরুরী ভিত্তিতে নদীর তীরবর্তী এলাকায় বাঁধ নির্মাণের জন্য এলাকাবাসী সরকারের নজরদারী ও আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।