বাঙালির মূলধারা

আচমকা বন্যায় নদী ভেসে যায়, ডুবিয়ে দেয় দু’পাড়ের জমি, মানুষের বাড়িঘর। তারপর একসময় ফের থামে তার উন্মাদনা, উচ্ছ্বাস। শান্ত হয়ে ফিরে আসে নিজের মধ্যে। বইতে শুরু করে নিজের মূলধারায়। মূলধারা কখনো শেষ হয়ে যায় না, থেকে যায় নিজের মধ্যেই।

শুধু নদী নয়, সব কিছুরই একটা নিজস্ব ধারা থাকে। সে ধারাটাই তার পরিচয়। সে পরিচয়ে সাময়িকভাবে কোনো কারণে বিস্মরণ আসে, তবে বিস্মৃতি স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসতে পারে না। যা অবিনাশী সত্য, তাকে কেউ পাল্টাতে পারে না। অবিনাশী সে মূলধারাকে পাল্টাতে যাওয়াটা বিপজ্জনকও।

সব কিছুরই একটা মূলধারা থাকে। তবে এ বিষয়টা মানুষের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। তার আগে অবশ্য মূলধারা বলতে কী বোঝায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। মূলধারা হলো মানুষের চলমান রীতি। এটা একদিনে দু’দিনে গড়ে ওঠে না। এর পেছনে রয়েছে হাজার বছরের রীতি রেওয়াজ, স্বাভাবিক প্রবণতা, জীবনাচার, সংস্কৃতি। এটা জোর করে হয় না, চাপিয়েও দেয়া যায় না। সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে নানা উত্থান-পতন, চর্চা, পরিচর্যা, বোধ ও অনুভবের মধ্য দিয়ে নিজের অজান্তেই বইতে থাকে মূলধারা। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে তার মধ্য দিয়ে সামনে এগোয়। এর ব্যতিক্রম হলে সেটা মানুষের জন্যেই আত্মঘাতী হয়ে ওঠে।

মূলধারা সামগ্রিক, সামষ্টিক, ব্যক্তিক নানা পর্যায়ে অন্তঃসলিলা। একটি জাতিও এগোয় তার আপন ধারায়। মূলধারায় প্রবহমান জাতি নিজেকে ঋদ্ধ করে, স্পষ্ট করে তোলে বিশ্বের পরিমণ্ডলে। তাদের জীবনে ক্রান্তিকাল আসে, আলোড়ন জাগে কখনো ভেতর থেকে কখনো বা বাইরে থেকে। কিন্তু তার মাঝেও তারা স্থির থাকে মূলধারাকে স্বতঃসিদ্ধতার দর্পণে প্রতিফলিত করে। তারপর একদিন ফের নিজেদের চিনে নেয়, ঠিক করে নেয় সামনের পথ।

বাঙালি একটি জাতির নাম। ইতিহাসের পরিক্রমায় এর স্পষ্ট উদ্ভব হয়েছে খুব বেশি দিন নয়। ধরতে গেলে মাত্র সেদিন। তবে পরিচিতি মাত্র সেদিন থেকে শুরু হলেও এর অন্তঃসলিল প্রবহমানতা নিরন্তর। পৃথিবীর সব মানুষ এক সমান হলেও স্থানিক প্রভাবে তাদের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য গড়ে ওঠে। হয়তো সেটাই তার জাতীয়তা। তবে ভাষা একটা প্রধান ও নির্ভরযোগ্য উপাদান। বাঙালির বাংলাভাষা তাকে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষাগত জনসংখ্যা থেকে পৃথক করেছে। একই ভাষাভাষী মানুষ রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন দেশে বাস করতে পারে, কিন্তু ভাষাগত মিল তাদের এমন এক অন্তর্যোগসূত্রে গ্রথিত করে রাখে, যা কোনোদিনই ছিন্ন হয় না।

বাঙালি এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক। রাজনৈতিকভাবে যারা যে দেশে আছে, তারা সেদেশের নাগরিক। একজন বাঙালি নিজেকে মার্কিন, ব্রিটিশ ফরাসি কিংবা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেয় অবলীলায়, কিন্তু যখন তার সত্যিকার জাতিসত্তার পরিচয়ের প্রশ্ন আসে, তখন সে নিজেকে বাঙালি হিসেবে পরিচিত করতেই মন থেকে তাগিদ বোধ করে।

মধ্য যুগে জাতীয়তাবোধ স্পষ্ট না থাকলেও সমভাষাগত বৈশিষ্ট্য তাদের একটি ভূখণ্ডে স্থির রেখেছিল। অবশ্য তখনো তার মধ্যে রাজনৈতিক বোধ জেগে ওঠেনি। তাই তারা কার দ্বারা শাসিত হচ্ছে, তা নিয়ে খুব একটা আগ্রহ বোধ করত না। বাঙালির জাতীয়তাবোধ কিংবা মূলধারার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পেতে থাকে ব্রিটিশ আমল থেকে। যেদিন থেকে বাংলা ভাষায় লিখন পঠন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়, বলা যায় সেদিন থেকেই বাঙালির স্বাজাত্যচেতনা জেগে উঠতে শুরু করে ধীরে ধীরে।

এই স্বাজাত্যচেতনা বা বোধ কিন্তু সহজিয়া সুরের মতো নীরবে প্রবহমান। অন্তঃসলিলা ফল্গুর মতো সতেজ ও সরস রাখে সমবৈশিষ্ট্যের জনগোষ্ঠীকে। সূক্ষ কিন্তু অবিচ্ছিন্ন আবেগে সঞ্চালিত করে জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রাকে। জনগোষ্ঠীর চেতনায় তখনই মোটাদাগে এই বোধ বা চেতনা ধরা দেয়, যখন তার অস্তিত্বের ওপর আঘাত হেনে বসে কেউ। আর রাজনৈতিক চেতনা এর সাথে যুক্ত হয়ে তোলপাড় জাগায়।

১৭৫৭ সালেও বাঙালি নামের একটি জনগোষ্ঠী ছিল। তবে ব্রিটিশ যখন সিরাজ উদ দৌলার কাছ থেকে বাংলা কেড়ে নিচ্ছিল, তখন বাঙালি জনগোষ্ঠীর চেতনার সাথে যুক্ত হয়নি রাজনৈতিক বোধ। তাই মুর্শিদাবাদে সিরাজের পতনের সময়ও রাজনৈতিক বোধের অনুপস্থিতিতে বাঙলার মানুষ তাকে স্রেফ রাজরাজড়ার যুদ্ধ হিসেবে দেখেছিল এবং নিজেদের তাতে জড়িত করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি। তারপর পুরো ব্রিটিশ সময়কালে জাতীয়তা বোধের নিয়ামকগুলোর সাথে ধীরে ধীরে পরিচিত হতে থাকে নিজেদের মধ্যে মগ্ন এক জনগোষ্ঠী। আর এ পরিচয়ের প্রথমে এসে দাঁড়ায় ভাষাগত ঐক্য বা স্বাতন্ত্র্যচেতনা। কিন্তু এ ঐক্যচিন্তা তখনো ততটা সামগ্রিক কিংবা সর্বজনবোধ্য হয়ে ওঠেনি। তাই ভারতভাগের সময় বাঙালিও মেতেছিল ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তাবোধে, যা আসলে মোটেই জাতীয়তার সূত্র নয়। ধর্ম আসলে মানুষের মনোজাগতিক বিশ্বাস, ভাষার মতো যা নিত্যজীবনে পারষ্পরিক প্রয়োজনে চর্চিত হয় না। ধর্ম পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে একই সূত্রে আবদ্ধ করতে পারে, ভাষা সেখানে মুখ্য নয়। আচারের সাদৃশ্যই ধর্মবিশ্বাসীগণকে পারলৌকিক পথযাত্রায় সঙ্গী করতে পারে। কিন্তু ভাষা সম্পূর্ণই ইহলৌকিক বিষয়। বৈষয়িক সমস্বার্থ ও সাংস্কৃতিক একাত্মতায় এক একটি ভাষা এক একটি নিয়মক হিসেবে কাজ করে।

ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হলেও ভাষাগত ঐক্য ও সমস্বার্থ বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল তার ভাষার ওপর আঘাতের প্রতিক্রিয়ায়। একই ধর্মীয় বিশ্বাসের মোটা দাগের সূত্র পাকিস্তানের বাঙালিকে পাঞ্জাবি, পাঠানের সঙ্গে মেলাতে পারেনি। উর্দুকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা শুরু হতেই বাঙালির ধর্মীয় জাতীয়তাবোধের ঠুনকো বন্ধন কাচের মতো ভেঙে পড়ে। ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তদানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ধর্মীয় জাতীয়তার গোড়া উপড়ে যায়। বাঙালি তার মূলধারায় নিজেকে খুঁজে পায়। তারপর মূলধারায় চলতে গিয়ে সৃষ্টি করে ৬২, ৬৬, ৬৯ এবং সবশেষে ৭১ এর মতো জাতীয় মহাকাব্যের দ্যোতনাগুলো। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ডালপালা মেলতে শুরু করে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কা-ে সুগঠিত মহীরূহ। আসলে জাতীয়তাবাদ একটি কংক্রিট বিষয়। জাতীয়তাবাদ কেবল সমভাষা ও সমসাংস্কৃতিক ঐক্য নিয়েই গড়ে উঠতে পারে। ভাষা দিয়ে অবশ্য রাষ্ট্র নামের বৃহৎ একটা সংগঠনও হয়। তবে ওই সংগঠনটি কেবল ভাষাভিত্তিকই নয়, তার সাথে থাকতে পারে ধর্মীয় বিভিন্নতা, আঞ্চলিক নৈকট্য এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের অভিন্নতাও। সে সংগঠন প্রয়োজনের, প্রাণের নয়। স্বার্থে আঘাত পড়লে রাষ্ট্র ভেঙে পড়তে পারে, কিন্তু জাতীয়তা কখনো বিভক্ত হয় না। এমনকী একটি জাতি বহুরাষ্ট্রের অধিবাসী হয়েও ভাষার টানে নিজেদের প্রাণের সুর একই তারে বাঁধা দেখতে পায়। আর রাষ্ট্রের অধীনে যে জনগোষ্ঠী, তারা আসলে জাতি নয়, একটি রাষ্ট্রের নাগরিক মাত্র।

৭৫ এর পর বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যে রাষ্ট্রটির সৃষ্টি হয়েছিল, তার অস্তিত্বে প্রথম আঘাত হানে অপশক্তি। রাষ্ট্রের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যার পর রাষ্ট্রটির খোল নলচে পাল্টে দিতে শুরু করে জাতীয়তাবাদের বিরোধী ক্ষমতাসীনরা। জাতীয়তা পাল্টে গিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এক শব্দে গিয়ে ঠেকে। নিছক একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমারেখাকে ভিত্তি ধরে তৈরি হয়ে যায় বাংলাদেশী নামের একটি অভিনব জাতীয়তা। জাতীয়তাবাদের বিশাল উর্বরা ভূমিকে অগ্রাহ্য করে গণ্য করা হয় একটি ক্ষুদ্র খরখরে অনুর্বর জমিকে। রাজনৈতিক মতলববাজ এবং তাদের উচ্ছিষ্টপ্রত্যাশী প-িতেরা যুক্তি দেখায়, বাংলাদেশে যেহেতু বহু জাতিসত্তার বাস, তাই তাদের অনুভূতির দিকে লক্ষ্য রেখেই নতুন জাতীয়তাবাদকে মেনে নেয়া উচিত।

এই অর্থে অবশ্য বাংলাদেশী কথাটা ঠিক আছে। কিন্তু সেটা অবশ্যই জাতীয়তা অর্থে নয়, নাগরিকতার হিসেবেই হওয়া উচিত। ভূখ-ের সব বাসিন্দা এক জাতি হবে না, তবে নাগরিক হতে দোষ নেই–বরং সেটাই হওয়া উচিত। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি রাষ্ট্রে নাগরিক হিসেবে বহু জাতির সন্নিবেশ, জাতি অর্থে নয়।

বাঙালি মুহম্মদ ইউনুস এবং অমর্ত্য সেন একই ভাষাভিত্তিক জাতির সদস্য হয়েও দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক রাষ্ট্রের বাসিন্দা। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য এই দুই রাষ্ট্রের কোনোটিরই বাসিন্দা ছিলেন না। কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করা হবে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার নোবেল কয়জন বাঙালি পেয়েছেন, তখন এ তিনজনের নাম এক সঙ্গেই লেখা হবে। বাংলাদেশি কিংবা ভারতীয় নাগরিকতা তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।
আর এটাই হলো বাঙালির মূলধারা। এই ধারা স্বতঃস্ফূর্ত, অবিনাশী। একে ব্যাহত করতে গেলে কারো হয়তো সাময়িক কার্যসিদ্ধি হতে পারে, কিন্তু এর দীর্ঘস্থায়ী মাশুল গুণতে হবে একটি জনগোষ্ঠিকে।
আন্তর্জাতিকতা অবশ্যই ভাল জিনিস। তবে সেটা যেন জাতীয়তাকে অস্বীকার করে না হয়।