ফের কিংস হসপিটাল: এবার সিজারে নবজাতকের মাথা কাটলেন চিকিৎসক

নবজাতক ও তার মা

::বিল্লাল হোসেন::
পাইলস রোগীর জরায়ু কাটা যশোর শহরের কিংস হসপিটালে এবার প্রসূতি মায়ের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে নবজাতকের মাথা কেটে ফেললেন আরেক চিকিৎসক। কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে অস্ত্রোপচারের সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে এমবিবিএস ডা. আতিকুর রহমান খান কাটলেন গর্ভে থাকা নবজাতকের মাথা।

দুই দিন আগে ঘটনাটি হলেও গোপন রাখার জন্য নবজাতকের চিকিৎসা পর্যন্ত করতে দেননি তিনি। অবস্থার অবনতি হওয়ায় শুক্রবার সকালে নবজাতককে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির পর বিষয়টি ফাঁস হয়ে পড়েছে। এর আগে কিংস হসপিটালে পাইলসের রোগীর জরায়ু কেটে সমালোচিত হয়েছিলেন ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহারকারী ডা. সাদিয়া শাহীন।

যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের সতিঘাটা পান্থাপাড়া গ্রামের ইকরাম হোসেন জানান, তার স্ত্রী নাজনীন নাহার পলি (২৩) অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর যশোর সদর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন। ১০ জুলাই বিকেলে পেটটা একটু শক্ত হয়। এ সময় তাকে আনা হয় কিংস হসপিটালে। সেখানে যেতেই সামনে পড়ে ডা. আতিকুর রহমানের সহকারী আমিনুর রহমান।

বিষয়টি নিয়ে তার সাথে কথা বলতেই তিনি তাদের জানান, কোনো সমস্যা নেই স্যারের কাছে চলেন। চেম্বারে রোগীকে নিয়ে যাওয়ার সাথেই ডা. আতিকুর রহমান খান তাদের বলেন এখনই ভর্তি করে দেন। রোগীর দ্রুত সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।

ইকরাম হোসেন আরো জানান, ভর্তির পরপরই কোনো রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ডা. আতিকুর রহমান তার স্ত্রীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন। নবজাতককে বাইরে আনার পর দেখা যায় মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছে। তখন বিষয়টি জানানো হলে ডা. আতিকুর রহমান খান তাদের বলেন মাথায় হালকা নখের চোট লেগেছে। সমস্যা নেই ঠিক হয়ে যাবে। এরপর বাচ্চাকে কোনো ডাক্তার দেখাতে দেয়া হয়নি।তাদেরকে বারবার বলা হয়েছে বেশি বেশি বুকের দুধ খাওয়ান। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

ইকরামের অভিযোগ, মাথা কেটে ফেলার ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়ে ওই চিকিৎসক নবজাতককে কোনো চিকিৎসার পরামর্শ দেননি। এখন তিনি বুঝতে পারছেন মূলত অর্থের লোভে ডা. আতিকুর রহমান তড়িঘড়ি করে নাজনীনের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেছেন। ডা. আতিকুরের অজ্ঞতায় তাদের প্রথম সন্তানের এই পরিণতি হয়েছে।

ইকরাম হোসেন জানান, বৃহস্পতিবার রাত থেকে তার সন্তান দুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। শুধু কান্নাকাটি করতে থাকে। শুক্রবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। যে কারণে নবজাতক সন্তানকে কিংস হসপিটাল থেকে নিয়ে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

হাসপাতালে জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক কাজল মল্লিক জানিয়েছেন, ছেলে নবজাতক শিশুটির মাথা কাটা অবস্থায় আনা হয়। কিভাবে তার মাথা কেটেছে ভর্তির সময় শোনা হয়নি। তবে মাথার আঘাতটি গুরুতর বলে মন্তব্য করেছেন এ চিকিৎসক।

এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডা. আতিকুর রহমান খানের কোনো বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ডিগ্রি নেই। তিনি একজন এমবিবিএস চিকিৎসক মাত্র। তৎকালীন সময়ে তিনি যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার পদে কর্মরত ছিলেন। পরে যশোরের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হিসেবে যোগদান করেন। এ পদ থেকেই তিনি অবসরে যান। বর্তমানে কিংস হসপিটালে ডা. আতিকুর রহমান খান গাইনী ও সার্জারি বিভাগের রোগীদের অস্ত্রোপচার করেন। আবার অস্ত্রোপচারের আগে নিয়ম না মেনে তিনি নিজেই রোগীকে অজ্ঞান করেন। প্রভাবশালী ডা. আতিক জেলা স্বাচিপের সভাপতি হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা তার বিরুদ্ধে নিরব ভূমিকায় থাকেন।

এ বিষয়ে ডা: আতিকুর রহমান খান জানিয়েছেন, রোগীর পানির পরিমাণ একেবারেই কম ছিলো। তাই তড়িঘড়ি করে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এ সময় ব্লেডের আঘাতে মাথায় আনুমানিক তিন মিলিমিটার লম্বায় ও আধা মিলিমিটার গভীরে ক্ষত হয়েছে। সামান্য বিষয়টিকে বড় করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গাইনী বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক জানান, ডা. আতিকুর রহমান কিভাবে রোগীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করলেন এটা তার বোধগম্য নয়। এসব চিকিৎসকের কারণে চিকিৎসক সমাজ কলঙ্কিত হচ্ছে।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. দিলীপ কুমার রায় জানান, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় নবজাতকের মাথা কেটে যাওয়ার ঘটনাটি শুনেছি। রোগীর স্বজনরা লিখিত অভিযোগ করলে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, যে কোনো রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষার পরই অস্ত্রোপচার করার নিয়ম।

তিনি জানান, একই চিকিৎসক রোগীর অস্ত্রোপচার ও অজ্ঞান করার দায়িত্ব পালনের কোনো নিয়ম নেই। অবশ্যই সেখানে আলাদা একজন অজ্ঞানের চিকিৎসক উপস্থিত থাকতে হবে। ডা. আতিকুর রহমান নিজেই অস্ত্রোপচার করার পাশাপাশি রোগীর অজ্ঞানের চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করেন কিনা জানা নেই। বিষয়টি শুনলাম, খোঁজ নিয়ে দেখবো।

উল্লেখ্য, এ ঘটনার আগে গত ১ জুলাই কিংস হসপিটালে গাইনী বিভাগের চিকিৎসক পরিচয়দানকারী ডা. সাদিয়া শাহীন রোগী ছায়রা বেগমের (৪৫) পাইলসের পরিবর্তে জরায়ু অস্ত্রোপচার করেছিলেন। তিনিও পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে রোগীর অস্ত্রোপচার করেছিলেন বলে স্বজনদের অভিযোগ। এই ঘটনায় ব্যাপক আলোচনায় ছিলো কিংস হসপিটাল ও ডা. সাদিয়া শাহীন।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার তদন্ত প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন তদন্ত কমিটির প্রধান যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. হারুন অর রশিদ।