‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ উদ্বোধন আজ,সাজসাজ রব

ইয়ানূর রহমান ও শেখ কাজিম উদ্দিন:
অবশেষে চালু হচ্ছে যশোরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন যশোর-বেনাপোল রুটে বিরতিহীন ট্রেন সার্ভিস। আজ বুধবার বিরতিহীন ট্রেন পরিসেবা ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ নামের এ সার্ভিসটি দুপুর ১টার দিকে ১২ বগি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা করবে। গতকাল মঙ্গলবার বেনাপোল রেলস্টেশন পরিদর্শনে গিয়ে এতথ্য নিশ্চিত করেছেন যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন।
এ দিন সকাল সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ট্রেন চলাচলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। এ যাত্রায় যাত্রী হবেন শুধুমাত্র রেলওয়ের কর্মকর্তারা। ট্রেনটি যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করবে আগামী ২৭ জুলাই থেকে। বেনাপোল-ঢাকা রুটের এ ট্রেনটি চলবে সপ্তাহে ছয়দিন। এতে সাড়ে সাত ঘণ্টায় পৌঁছানো যাবে ঢাকায়। উদ্বোধনকে ঘিরে এলাকায় সাজসাজ রব পড়েছে। বেনাপোল রেল স্টেশনকে সাজানো হয়েছে এক অপরুপ সাজে। নববধূর সাজে স্টেশনে উদ্বোধনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে ঢাকাগামী ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’।
রেলওয়ের সূত্র মতে, ট্রেনটি বেলা দেড়টায় বেনাপোল ছাড়বে। আবার রাত সাড়ে বারোটার দিকে বেনাপোলের উদ্দেশে ছেড়ে আসবে। ১২ বগির ৮৯৬ আসনের এই ট্রেন প্রতিদিন বেনাপোল স্টেশন থেকে ছেড়ে যশোর, ঈশ্বরদী জংশন ও ঢাকা বিমানবন্দরে যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য সাময়িক বিরতি দিয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের শেষ গন্তব্যে গিয়ে থামবে। বেনাপোল এক্সপ্রেস নন এসি শোভন ৪৮৫ টাকা, এসি চেয়ার ৯৩২ টাকা, এসি কেবিন ১৬৭৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে যাত্রীদের আর কোনো চার্জ দিতে হবে না। আধুনিক এ ট্রেনের কোচগুলো (বগি) ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়েছে। এ ট্রেনে বিমানের মতো বায়ো-টয়লেট সুবিধা রয়েছে। আসনগুলোও আধুনিক।
বেনাপোল স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে যশোর-থেকে ঢাকার মধ্যে যে ট্রেন সার্ভিস চালু রয়েছে তা ঢাকায় পৌঁছানোর মধ্যে ১৪টি স্থানে বিরতি নেয়। এতে যশোর থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। সেখানে চালু হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বেনাপোল-ঢাকা বিরতিহীন ট্রেনটি সাড়ে ৭ ঘণ্টার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছবে।
বেনাপোল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার সাঈদুজ্জামান জানান, বেনাপোল থেকে ট্রেনটি ছেড়ে অপারেশনাল স্টেশন যশোর জংশনে পৌঁছে ১৫ মিনিটের বিরতি করবে। এ সময়ের মধ্যে রেলের ইঞ্জিন ঢাকামুখী ঘোরানো হবে। এরপর ঈশ্বরদী গিয়ে ট্রেনের চালকসহ অপারেশনাল কর্মী বদলের জন্য আরও ১৫ মিনিটের বিরতি থাকবে। পরে ট্রেনটি ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে শেষ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। তবে এর আগে ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে কিছুক্ষণের জন্য ট্রেনটি থামানো হবে।
এদিকে, মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানিকৃত অত্যাধুনিক ট্রেনটি বেনাপোল স্টেশনে এসে পৌঁছেছে। ইতোমধ্যে বর্ণিল সাজে সাজিয়ে ট্রেনটি উদ্বোধনের উপযোগী করা হয়েছে। বেনাপোলবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি বাস্তবায়ন হতে চলায় এলাকায় কয়েকদিন ধরে সাজসাজ রব চলছে। বেনাপোল রেল স্টেশনকে সাজানো হয়েছে এক অপরুপ সাজে। নববধূর সাজে স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকাগামী ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’। যাকে ঘিরে কয়েকদিন যাবত বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মাঝে চলছে এক আনন্দঘন মুহূর্ত। দফায় দফায় সরকারের রেলমন্ত্রীসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পরিদর্শন করছেন বেনাপোল রেল স্টেশন।
মঙ্গলবার বিকেলে সাংসদ শেখ আফিল উদ্দিন বেনাপোল রেল স্টেশন পরিদর্শনে আসলে স্থানীয় জনতার ঢল নামে। বেনাপোল রেল স্টেশনে দন্ডায়মান ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ দেখে বাহবা দেন সাংসদকে। যার ঐকান্তিক প্র”েষ্টার ফসল হিসেবে আজ বেনাপোল-ঢাকা-বেনাপোল রুটে রেল চলাচল শুরু হচ্ছে।
এ সময় শেখ আফিল উদ্দিন এমপি বলেন, বেনাপোলবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ছিল ঢাকা-বেনাপোল-ঢাকা রেল চলাচল চালু হলে ফেরিঘাটের সমস্যা লাঘব হবে। দিনের পর দিন ঘন কুয়াশা আর বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফেরিতে ওঠার লম্বা লাইনে পড়ে থাকত সড়ক পরিবহনে থাকা যাত্রীরা। যেকারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকার পরেও নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পারায় বানচাল হয়ে যেতো সে সকল কাজগুলো। বিশেষ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন ফেরিঘাটে দাঁড়িয়ে থাকায় অনেক মুমূর্ষু রোগী চিকিৎসার অভাবে ফেরিঘাটেই মৃত্যুবরণ করতেন। ঢাকামুখী ছাত্রছাত্রীরা সঠিক সময়ে পরীক্ষার হলে অংশগ্রহণ করতে না পারায় শিক্ষার উন্নত চুড়াসহ জীবন যুদ্ধের চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই, শার্শা উপজেলাবাসীর দীর্ঘদিনের চাওয়া এ রেল চলাচল বেনাপোল বন্দরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য একটি উন্নয়নের মাইল ফলক ও নব দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন শার্শা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক মঞ্জু, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পূলক কুমার মন্ডল, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ নুরুজ্জামান, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও যশোর জেলা পরিষদের সদস্য ইব্রাহিম খলিল, বেনাপোল পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আলহাজ এনামুল হক মুকুল, সাধারণ সম্পাদক আলহাজ নাসির উদ্দিন, উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও যশোর জেলা পরিষদের সদস্য অহিদুজ্জামান প্রমুখ।
শেখ আফিল উদ্দিন জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্থাপন করেছিলেন বেনাপোল স্থলবন্দর। যে কারণে বেনাপোল বন্দরের উন্নয়ন নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। তাইতো, তাঁর জীবদ্দশায় বারবার এসেছিলেন বেনাপোল বন্দর পরিদর্শনে। একমাত্র এই বিশ^াসকে হৃদয়ে ধারণ করে এমপি আফিল উদ্দিন বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছায়ার মতো লেগেছিলেন কেবল এ দিনটির অপেক্ষায়। সর্বশেষ বেনাপোলবাসীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে যার চাওয়া ছিল এ ট্রেনটির নামকরণ ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ দেয়া হোক। যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহমত পোষণ করে ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ নামকরণ করেছেন।
আজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বেনাপোল রেলস্টেশনে উপস্থিত থাকবেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য এমপি, সংসদ সদস্য শেখ আফিল উদ্দিন, নাসির উদ্দিন, নাবিল আহমেদ, রনজিৎ কুমার রায়, ইসমাত আরা সাদেক, যশোর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পূলক কুমার মন্ডলসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক, সামাজিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।