যাত্রা শুরু করলো দেশের প্রথম বিরতিহীন ট্রেন ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’

ইয়ানুর রহমান ও শেখ কাজিম উদ্দিন:বেনাপোল-ঢাকা-বেনাপোল রুটে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে যাত্রা শুরু করলো দেশের প্রথম বিরতিহীন ট্রেন ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধনের পর ১২ বগী নিয়ে ট্রেনটি যাত্রা শুরু করে।
এ উদ্বোধনকে ঘিরে বুধবার সকাল থেকেই বেনাপোল রেলস্টেশনসহ বন্দর এলাকার চারিদিকে দলমত, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে রঙ মেখে বাদ্যের তালে তালে উদ্বোধনের অপেক্ষায় ছিলেন উৎসুক জনতা। দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি বাস্তবায়নে শার্শা উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যানার ফেস্টুন সহকারে বর্ণাঢ্য র‌্যালি সহকারে উদ্বোধনস্থলে শরীক হন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ উৎসুকরা। চারিদিকে সাজ সাজ রব রব, পাখির কলতানের মতো চারিদিক থেকে মানুষের ঢল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে প্রাণবান্ধব করে তোলে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগ দিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। স্বাগত বক্তব্য দেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জল হোসেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী রেল উদ্বোধনের পর স্থানীয় উৎসুক জনতার অভিমত জানতে চাইলে যশোরের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক উৎসুক জনতার হাতে মাইক্রোফোন ধরিয়ে দেন।
অভিমত ব্যক্ত করেন, বেনাপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী আলীজা হাছমিন গিনি ও স্থানীয় ব্যবসায়ী আলী কদর সাগর।
এ সময় বেনাপোল রেলস্টেশনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ শেখ আফিল উদ্দিন, যশোর-২ আসনের এমপি নাসির উদ্দিন, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক শামছুজ্জামান, বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার বেলাল হুসাইন চৌধুরী, জেলার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হুসাইন শওকত, পুলিশ সুপার মইনুল হক, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, শার্শা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক মঞ্জু, সাধারণ সম্পাদক আলহাজ নুরুজ্জামান, শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসার পুলক কুমার মণ্ডল, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মৌসুমি জেরিন কান্তা, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ও যশোর জেলা পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খলিল, বেনাপোল পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আলহাজ এনামুল হক মুকুল, সাধারণ সম্পাদক আলহাজ নাসির উদ্দিন, বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন, জেলা নাগরিক অধিকার আন্দোলন কমিটির আহবায়ক নুর জালাল প্রমুখ।
উদ্বোধনের পর বেলা সোয়া একটার দিকে ট্রেনটি বেনাপোল থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। তবে এ যাত্রায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক শামসুজ্জামানের নেতৃত্বে সরকারি কর্মকর্তারা ছিলেন। বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ১০৪টি টিকিট বিক্রি হয়েছে বলে জানান বেনাপোল রেলস্টেশন মাস্টার সাইদুজ্জামান। ইতিহাসের স্বাক্ষী হিসেবে ট্রেনটির চালক ছিলেন বেনজির আহম্মদ।
বেনাপোল এক্সপ্রেসে রয়েছে নতুন ১২টি কোচ। এরমধ্যে দুটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। প্রচলিত সুইং ডোরের পরিবর্তে এসব কোচে রয়েছে নিরাপদ স্পাইডিং দরজা।
দেশের প্রথম বিরতিহীন এ ট্রেনের অন্যতম নতুন বৈশিষ্ট্য হলো- বায়ো-টয়লেট সংযোজন। ট্রেনটিতে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের হুইল চেয়ারসহ চলাচলের সুবিধার্থে থাকছে প্রশস্থ দরজা (মেইন ও টয়লেট দরজা) এবং নির্ধারিত আসনের সুবিধা। প্রতিটি কোচ স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি এবং অত্যাধুনিক যাত্রী সুবিধা সম্বলিত। প্রতিটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচে আধুনিক ও উন্নতমানের রুফ মাউন্টেড এয়ার কন্ডিশনার ইউনিট এবং এয়ার কার্টেইনের ব্যবস্থা রয়েছে।
যাত্রী সাধারণের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত চেয়ার, বার্থ, স্টেয়ার, পার্সেল রেক, টিভি মনিটর হ্যাঙ্গার, ওয়াই-ফাই রাউটার হ্যাঙ্গার, মোবাইল চার্জারের ব্যবস্থা রয়েছে। ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনটি ১২টি কোচ দ্বারা চলবে। ট্রেনটিতে এসি সিট, এসি চেয়ার ও শোভন চেয়ার শ্রেণির সর্বমোট ৮৯৬টি (৭৯৫ নম্বর ট্রেনের ক্ষেত্রে) এবং এসি বার্থ, এসি চেয়ার ও শোভন চেয়ার শেণির সর্বমোট ৮৭১টি (৭৯৬ নং ট্রেনের ক্ষেত্রে) আসনের ব্যবস্থা থাকবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান পরিবহন তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ শাহ নেওয়াজ বলেন, ৮৯৬ আসনের এ ট্রেন প্রতিদিন বেনাপোল স্টেশন থেকে ছেড়ে যশোর, ঈশ্বরদী জংশন ও ঢাকা বিমানবন্দরে যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য সাময়িক বিরতি দিয়ে শেষ গন্তব্যস্থল কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে থামবে। এ ট্রেনের শোভন চেয়ারের ভাড়া ৫৩৪ টাকা, তাপানুকূল চেয়ার ১০১৩ টাকা, তাপানুকূল প্রথম শ্রেণি ১২১৩ টাকা এবং তাপানুকূল বার্থ টিকেটের দাম রাখা হয়েছে ১৮৬৯ টাকা।
তিনি বলেন, নতুন এ ট্রেনে বেনাপোল থেকে ঢাকা যেতে সময় লাগবে আট ঘণ্টা। বেনাপোল থেকে দুপুর ১ টায় ট্রেনটি ছাড়বে আর ঢাকায় পৌঁছাবে রাত ৯ টায়। আবার রাত ১২টা ৪০ মিনিটে ঢাকার কমলাপুর থেকে ছেড়ে সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে বেনাপোল পৌঁছাবে। প্রতি সপ্তাহে বুধবার ট্রেনটি বেনাপোল থেকে চলাচল বন্ধ থাকবে। বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে চলাচল বন্ধ থাকবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে ঢাকা-বেনাপোল রুটটি অনেক লম্বা। টঙ্গী, কুড়িল, জয়দেবপুর, বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে ঈশ^রদী, দর্শনা, পাবনা, ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ যশোর হয়ে বেনাপোল ৩৮৫ কিলোমিটার। আমরা সরকারে এসে দুই বিভাগের সাথে রেল লাইন সংযুক্ত করে দিয়েছি। যোগাযোগ চালু করার যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো সহজ হওয়ার পথে। আমরা পদ্মা ব্রিজ করছি। সম্পূর্ণ হলে পদ্মা ব্রিজের উপর দিয়ে ভাঙ্গাতে একটি জংশন তৈরি করবো। পরে ফরিদপুরের সাথে যশোরের একটি লিংক রোড করে দেবো। তাতে ১৮০ কিলোমিটার পথ কমবে সেসাথে সময়ও কম লাগবে। সর্বোপরি জাতির পিতার দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশ ঘন বসতিপূর্ণ। যে কারণে রেল আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বাহন। দুর্ভাগ্য যে বিএনপি সরকার আমলে রেল যোগাযোগকে প্রায় বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল এবং বন্ধ করে দিয়েছিল প্রায়। ১৯৯৬ সালে আমরা প্রথম সরকারে আসার পর রেলকে আলাদা মন্ত্রণালয় করে দিয়েছি। কারণ, আমাদের দেশের মানুষ যাতে আলাদা সেবা পায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আমরা তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে আমরা রেলকে আলাদা মন্ত্রণালয় করেছি।
তিনি বলেন, অজ¯্র শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা দেশকে স্বাধীন করতে পেরেছি আমরা সেই সকল শহিদের রক্তের পরিবর্তে উন্নয়নের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে রোল মডেলের জাতিতে পরিণত করার চেষ্টা করছি। রেলকে আধুনিকায়ন করা, বৈদেশিক কেন্দ্রীক করা এবং যোগাযোগে আরো মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া এটাই আমাদের লক্ষ্য। সে কারণে আমরা সড়কপথ, নৌপথ, আকাশপথ এবং রেলপথকে আলাদা মন্ত্রণালয় করে মানুষের আরো কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
এদিন একই সময় ঢাকা-রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে বর্ধিত বিরতিহীন আন্তঃনগর ‘বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনও উদ্বোধন করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে এবং সবুজ পতাকা উড়িয়ে ট্রেন দুটির উদ্বোধন ঘোষণা করেন।