যশোরে মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে পুলিশের কথোপকথনের অডিও ফাঁস

::নিজস্ব প্রতিবেদক::
যশোর কোতয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সহিদুল আলমকে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধ্রমজাল। ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে ক্লোজড করা হয়েছে এ সংবাদের সত্যতা স্বীকার করলেও কী কারণে ক্লোজড তা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ বলতে পারছেন না। তবে ক্লোজড হওয়ার পেছনে কোতয়ালি থানা থেকে সদ্য বদলি হওয়া এক পুলিশের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

একজন মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ক্লোজড করানো হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড এখন বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার হাতে রয়েছে। ওই অডিওটি এখন পুলিশের কাছে হটকেক।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত ১৬ জুলাই কোতয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাহিদুল আলমের শহরে টহল ডিউটি (মোবাইল-১৩) ছিল। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি গোপন সূত্রে সংবাদ পেয়ে উপশহরের ৭ নম্বর সেক্টরের জি-১০ বাড়িতে অভিযান চালান। পুলিশের কাছে খবর ছিলো; মৃত রুহুল আমিনের ছেলে রবিউল ইসলাম লিটন ওই বাড়িতে ইয়াবা ট্যাবলেট নিয়ে অবস্থান করছেন। কিন্তু তিনি সেখানে গিয়ে লিটনকে পেলেও তার কাছে কোনো মাদকদ্রব্য পাননি। তবে এসআই সাহিদুল আলমের সাথে ছিলেন পুলিশ লাইন্সে কর্মরত কনস্টেবল মোশাররফ হোসেন। তিনি কোতয়ালি থানার একটি সাদা পোশাকের টিমের সদস্য ছিলেন। ওই মোশারফ ঘরের মধ্যে গিয়ে মাদক ব্যবসায়ী লিটনকে কয়েকটি চড় থাপ্পড় মারেন।

এ ঘটনা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পৌঁছালে গত ১৭ জুলাই এসআই সাহিদুল আলমকে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজড করা হয়।

সূত্রটি জানায়, ১৭ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপশহর ক্যাম্পের পুলিশ লিটনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে এবং তার কাছ থেকে ২ পিস ইয়াবা জব্দ করে। এ ঘটনায় একটি মামলাও হয়।

এসআই সাহিদুল আলম এ বিষয়ে জানান, কনস্টেবল মোশাররফ হোসেনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এবং তাকে সাথে নিয়ে তিনি উপশহরের ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিলেন। কিন্তু লিটনকে পাওয়া গেলেও তার কাছে কোনো মাদকদ্রব্য ছিলো না। পরে তিনি লিটনের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেও ভেতরে কিছু সময় ছিলেন কনস্টেবল মোশাররফ হোসেন। তার অনুপস্থিতিতে মোশাররফ হোসেন মাদক ব্যবসায়ী লিটনকে চড়থাপ্পড় মেরেছিলেন বলে পরে তিনি জানতে পেরেছেন।

এ ঘটনার পর ১৭ জুলাই কর্তৃপক্ষ তাকে পুলিশ লাইন্সে ক্লোজড করেছে। মাদক ব্যবসায়ী লিটনের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেয়ার কারণে তাকে ক্লোজড করা হয়েছে এমন অভিযোগ সম্পর্কে এসআই সাহিদুল আলম জানান, লিটনের কাছ থেকে কোনো টাকা নেয়া হয়নি। মোশাররফও তার কাছ থেকে কোনো টাকা নেয়নি এটাই সত্য কথা।

এসআই সাহিদুল আলম জানান, কোতয়ালি থানা থেকে সদ্য বদলি হওয়া এএসআই আফজাল হোসেন এক সময় সাদা পোশাকের একটি টিমের সদস্য ছিলেন। ওই টিমের সদস্য ছিলেন কনস্টেবল মোশাররফ হোসেন। মাদক ব্যবসায়ী লিটনের সাথে এএসআই আফজাল হোসেনের সখ্যতা রয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। যে কারণে ১৬ জুলাই বিকেলে তার অভিযানকালে কনস্টেবল মোশাররফ হোসেন চড়থাপ্পড় মারলে তাৎক্ষণিক বিষয়টি লিটন মোবাইল ফোনে এএসআই আফজাল হোসেনকে জানান। মাদক ব্যবসায়ী লিটন মোবাইল ফোনে ধারণকৃত রেকর্ড অনুযায়ী, ‘ভাই আপনি (এএসআই আফজাল) ১০ হাজার টাকা যে মোশাররফকে দিয়েছিলেন সে অন্য এক দারোগাকে সাথে নিয়ে আমার বাড়িতে এসেছে। আমাকে চড়ও মেরেছে মোশাররফ।’ এরপর এএসআই আফজাল হোসেনের সাথে মাদক ব্যবসায়ী লিটনের কয়েকদফা কথা হয়েছে। দুজনের মধ্যে কথোপকথনের বিষয়টি মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে রাখেন লিটন। মোবাইল ফোনে মাদক ব্যবসায়ী লিটনের সাথে কথোপকথনে এএসআই আফজাল হোসেনকে এ কথা বলতে শোনা গেছে যে ‘উপর মহলে বলে দেখ আমি কী খেলা বাঁধিয়ে দিই। দুই একদিনের মধ্যে খেলা শুরু হয়ে যাবে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা তদন্তে গেলে বলবে তার (লিটন) কাছ থেকে টাকা নিয়ে গেছে। তুই আমার ভাই, ও (এসআই সাহিদুল আলমকে লক্ষ্য করে) কিছু না’।

রেকর্ডের আরেক জায়গায় এসআই সাহিদুল আলমকে উদ্দেশ্যে করে খিস্তিখেউড় দিয়ে এএসআই আফজালকে বলতে শোনা গেছে ‘তার জন্যে আমার বদলি হয়েছে। আমিও তাকে (এসআই সাহিদুল আলম) এক সপ্তাহের মধ্যে বদলি করিয়ে ছাড়বো’। একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলির পেছনে আরেক পুলিশ কর্মকর্তার হাত এবং একজন মাদকসেবীর সাথে কথোপকথনের অডিও রেকর্ড এখন পুলিশের কাছে মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাতে এএসআই আফজাল হোসেনের সাথে মোবাইল ফোনে কথা হয়। তিনি জানান, লিটনের সাথে তার কী কথা হয়েছে তা মনে নেই। তবে তিনি বার বার বলতে থাকেন যে, এসপিবিএনে তার বদলি হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামাল আল নাসের এসআই সাহিদুল আলমকে ক্লোজ করার বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে নিশ্চিত করেছেন।

থানা পুলিশের ইন্সপেক্টর (অপারেশনস) সামসুদ্দোহাও ক্লোজের সত্যতা স্বীকার করেছেন। কিন্তু কী কারণে এসআই সাহিদুল আলমকে ক্লোজড করা হয়েছে সে বিষয়ে পুলিশের এ দুই কর্মকর্তা কোনো কিছু বলেননি।