বৃষ্টিহীন বর্ষাকাল: বীজতলা ফেটে চৌচির, শুকিয়ে যাচ্ছে আমন চারা

:: আবদুল কাদের ও প্রকাশ ঘোষ বিধান ::
‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন, ঝরো ঝরো ঝরেছে’। বৃষ্টি এলো কাশবনে, জাগলো সেথা ঘাসবনে’ কবিদের এসব কথায় এখন আর বৃষ্টি আর আসছে না ফসল আর জাগছে না। বর্ষাকাল আষাঢ় শ্রাবণেও কাঙ্খিত বৃষ্টির দেখা নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেখানে অতিবৃষ্টিতে বন্যা কবলিত হচ্ছে, সেখানে যশোর ও পাইকগাছার কৃষকরা বৃষ্টির অভাবে আমন ধান রোপণ করতে পারছে না।

আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেও বৃষ্টির পরিবর্তে প্রচণ্ড রোদ আর খরায় ধানের চারা রোপণ বাধাগ্রস্ত করছে। নষ্ট হচ্ছে বীজতলা। সচ্ছল চাষিরা বাধ্য হয়ে স্যালোমেশিন থেকে ঘণ্টা চুক্তি পানি নিয়ে ধান রোপণ করছেন। অসচ্ছল কৃষকরা এখনও রোপণ শুরু করতে পারছেনা। একেতো কৃষি পণ্যের দাম কম, তারপরও যদি শুরুতেই পানি ক্রয় করে ধান রোপণ করতে হয় তাহলে কৃষকের লোকসানের পরিমাণটা অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা।

যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের তথ্যমতে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার ৯৭৫ হেক্টর জমি। কিছু এলাকায় চাষিরা আবাদ শুরু করেছেন। গত বছর জেলায় রোপা আমন আবাদ হয়েছিল এক লাখ ৩৮ হাজার হেক্টর। কৃষি বিভাগ আশংকা প্রকাশ করেছেন এবার তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না।

ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া এলাকার নিশ্চিন্তপুর, কানাইরালী, সাদিপুর, দিঘড়ী, সোনাকুড়, হাজিরবাগ, শিত্তরদাহ, বল্লা গ্রামের মাঠ ঘুরে দেখা যায়, মাঠে ধান রোপণের জন্য পর্যাপ্ত পানি নেই। পানির জন্য স্যালোমেশিন চালিয়ে পানি তুলতে হচ্ছে। স্যালোমেশিন মালিকদের নিকট থেকে ১২০-১৬০ টাকা ঘণ্টা পানি ক্রয় করতে হচ্ছে। ফলে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক শিমুল কবির জানান, কৃষক ধান চাষের মৌসুম পায় তিনটি। ইরি, আউশ ও আমন। ইরি চাষ করতে হয় শীতের সময়। ইরি চাষ করতে হয় স্যালোমেশিনের পানি দিয়ে। ফলে খরচ হয় অনেক বেশি। বৃষ্টি না হওয়ার কারণে আউশ চাষ এখন আর হয় না। তাই লাভের আশা করতে হয় আমন চাষে। কিন্তু চলতি বছরে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসেও কোনো বৃষ্টি নেই। ফলে ধান রোপণে খুব বিপদে আছি।

একই গ্রামের কৃষক রেজাউল ইসলাম ও বাবুল আক্তার জানান, কৃষি পণ্যের দাম কম, বিশেষ করে ধানের। তারপরও যদি পানি কিনে ধান রোপণ করতে হয়, তাহলে কৃষকের লোকসানের পরিমাণ অনেক বেশি হবে।

বাঘারপাড়া উপজেলার ধলগ্রামের কৃষক আবুল হোসেন জানান, গতবার ধানের ন্যাষ্য দাম পায়নি। তারউপর এবার বৃষ্টির দেখা নেই। পানির অভাবে আমন ধান রোপণ করতে পারছি না। সচ্ছল কৃষকরা স্যালোমেশিন দিয়ে পানি দিয়ে ধানের আবাদ করছেন। শার্শা উপজেলার শালকোনা গ্রামের সাহেব আলী জানান, সারাদেশে পানিতে ডুবছে, অথচ যশোরে বৃষ্টির দেখা নেই। দু’একদিন যে বৃষ্টিপাত হয়েছে তা মাটি চুষে নিয়েছে। এখন পানির অভাবে আমাদের অঞ্চলের চাষিরা আমন রোপণ করতে পারছে না।

ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি অফিসার দিপঙ্কর দাশ বলেন, আকাশের পানি আর স্যালোমেশিনের পানির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। চলতি বছরে উপজেলায় আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার হেক্টর। বৃষ্টির জন্য চাষিরা হাহাকার করছেন।

যশোরে গভীর নলকূপের সংখ্যা ১ হাজার ৬০২। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক নলকূপ ১ হাজার ৪৮৬ ও ডিজেলচালিত ১১৬টি। অন্যদিকে স্যালো টিউবওয়েল রয়েছে ৬৩ হাজার ৮৯৯টি। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক ৬ হাজার ৭৮৪ ও ডিজেলচালিত ৫৭ হাজার ১১৫টি। কৃষি বিভাগ বলছে, বর্ষা মৌসুমে গভীর এবং অগভীর নলকুপের সব গুলোই চলছে এখন।

এ ব্যাপারে যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপপরিচালক এমদাদ হোসেন জানান, এখন বর্ষার ভরা মৌসুমে কমপক্ষে দেড়শ’ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হওয়া প্রয়োজন ছিল। চলতি মৌসুমে এপর্যন্ত মাত্র ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। যার মধ্যে ১১ থেকে ১৪ জুলাই হয়েছে ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টি। বাকি সময় চলেছে তীব্র খরা। অথচ গত মৌসুমের এ সময় বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১১২ মিলিমিটার। বৃষ্টির অভাবে জেলায় আমন রোপনে বাঁধার সৃষ্টি করছে। কিছু চাষি সেচপাম্প দিয়ে পানি তুলে আমন রোপন শুরু করেছন। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়েও চিন্তিত।

বিএডিসি (সেচ) যশোর অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহাবুব আলম জানান, আমাদের আওতায় জেলায় ৩ হাজার ৪শ সেচপাম্প রয়েছে। এগুলো নিজেদের খরচে চাষিরা পানি তুলতে পারবেন।
পাইকগাছা : ভরা বর্ষা মৌসুমে কাঙ্খিত বৃষ্টি না হওয়ায় আমন চাষাবাদ নিয়ে বিপাকে পড়েছে কৃষকরা। দেরিতে হলেও বৃষ্টি আসবে এমন অপেক্ষায় ছিল কৃষকরা। কিন্তু শ্রাবণ মাসেও বৃষ্টির দেখা নেই। এরপরেও কিছু কিছু এলাকায় সেচ দিয়ে বীজতলা তৈরি করলেও বৃষ্টির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।

পাইকগাছা উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানাগেছে, উপজেলায় আমন আবাদের জন্য এক হাজার একশ হেক্টর বীজতলা তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এ পর্যন্ত ১০৫ হেক্টর বীজতলা তৈরি হয়েছে। বৃষ্টি অভাবে কৃষকরা বীজতলা করতে পারেনি। তবে মাঝে মধ্যে হালকা বৃষ্টিপাত হওয়ায় কৃষকরা আমন আবাদের জন্য বীজতলা তৈরি শুরু করলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় বীজতলা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অনেক বীজতলার চারা শুকিয়ে গেছে। ফলে সময়মত বৃষ্টিপাত না হলে এবার আমন চাষাবাদে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার এএইচএম জাহাঙ্গীর আলম জানান, বর্ষা মৌসুমে কাঙ্খিত বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষকরা বীজতলা তৈরি করতে পারিনি। উপজেলার যে সকল এলাকায় পানি সরবরাহ আছে সেখানে কৃষকদের সেচ দিয়ে বীজতলা তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কৃষি অফিস কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। তবে উপকূল এলাকার আমন আবাদ কিছুটা নাবীতে চাষাবাদ শুরু হয়। সেজন্য আগামীতে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে কৃষকরা বীজতলা তৈরি করতে পারবে।