যশোরে ঘের ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা: পান্নুর গাড়ি-বাড়ি ভাঙচুর, অস্ত্রগুলি উদ্ধার

:: নিজস্ব প্রতিবেদক ::
যশোরে ঘের ব্যবসায়ী ইমামুল ইসলাম ওরফে ইমরোজকে (২৮) গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ছোট ভাইয়ের বিরোধ মেটাতে গিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে। তিনি যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের ভাতুড়িয়া পূর্বপাড়ার নুরুল ইসলাম নুরোর ছেলে।

বুধবার দুপুরে ভাতুড়িয়া-সাড়াপোল সড়কের কালাবাঘা এলাকায় ইমামুলের মাছের ঘেরের সামনে ঘটনাটি ঘটে। বিকেলে ইমামুলের মরদেহ বাড়িতে নেয়া হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি গুলি ও ২-৩টি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে।

ঘটনার পর নিহতের স্বজন ও গ্রামবাসি ভাতুড়িয়া বাজারে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এলাকাবাসী একজোট হয়ে এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে চাঁচড়া দাড়িপাড়া এলাকার জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত মৎস্য চাষি সেলিম রেজা পান্নুর হাত আছে অভিযোগ তুলে তার বাড়িঘর ও গাড়ি ভাঙচুর করেছে।

এ সময় পুলিশসহ অন্তত তিনজন আহত হয়েছে। পুলিশ সেলিম রেজা পান্নুর পরিবারের সদস্যদের হেফাজতে নিয়েছে। চাঁচড়া বাজার মোড়ে তার ঘর তল্লাশি করে অস্ত্রগুলি ও ম্যাগজিন উদ্ধার করেছে। পান্নু স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত।

এদিকে এ ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে পুলিশ বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে বলে শোনা গেলেও কোতয়ালি থানার নবাগত ওসি মনিরুজ্জামান তা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, কী নিয়ে গোলযোগ তা আমরা অনুসন্ধান করে বের করার চেষ্টা করছি। তবে ইমামুলকে গুলি করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। কারা এ ঘটনার সাথে যুক্ত এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, বুধবার বেলা ১১টার দিকে মণিরামপুর থেকে এক যুবক একটি মেয়েকে সাথে নিয়ে কালাবাঘার মোড়ের পূর্বে খড়িঞ্চাডাঙ্গা সাড়াঘুটোর রোডে একটি শ্মশানের সামনে স্বপনের ঘেরের কাছে গল্প করছিলেন।

এ সময় ইমামুলের ছোটভাই ইসরাজুল ইসলাম ও তার এক সহযোগী সেখানে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলেন। দুইজনকে ইসরাজুল তাদের ঘেরের সামনে নিয়ে যান। ওই যুবক সে সময় ভাতুড়িয়া এলাকায় তার পরিচিত কয়েকজনকে ফোন দেয়। তার ফোন পেয়ে ইসরাজুলের বয়সের ছোট কয়েকজন ঘেরের সামনে গেলে ওই ছেলেমেয়েকে ছাড়তে নারাজ ইসরাজুল। এরপর সংবাদ পেয়ে ইমামুল ঘেরের সামনে গেলে ওই যুবকদের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। পরে সংবাদ পেয়ে ভাতুড়িয়ার কাজলের ছেলে মোস্তর (সেলিম রেজা পান্নুর আশ্রিত) নেতৃত্বে তিনটি মোটরসাইকেলে করে ৯জন সেখানে যায় এবং দুপুর সোয়া একটার দিকে কিছু বলার আগেই মোটরসাইকেল থেকে নেমে ইমামুলকে ছুরিকাঘাত করে। তিনি দৌড়ে হরিয়ানা বিলের মধ্যে যাওয়ার সময় তাকে গুলি করা হয়। একটি গুলি তার বুকের বাম পাশে লাগে। সে সময় দুর্বৃত্তরা ইসরাজুলকে গুলি করে। কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এছাড়া দুর্বৃত্তরা ইমামুলকে পেছন থেকে দা দিয়ে কোপ মারে। এতেও তিনি জখম হন। পরে মোটরসাইকেলে করে দুর্বৃত্তরা ফের ভাতুড়িয়ার দিকে চলে যায়।

পরে একটি মোটরসাইকেলে করে ইমামুলকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা পৌনে ৩টার দিকে ইমামুল মারা যান।

হাসপাতালে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মনিরুজ্জামান লড মৃত্যুর আগে ইমামুলকে ঢাকায় রেফার্ড করেছিলেন। কারণ গুলিটি তার বুকের ভেতরে রয়ে গিয়েছিল। তাকে ঢাকায় নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তার পরিবারের লোকজন।

নিহতের পিতা নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি ঘটনার সময় অফিসে (জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের স্টাফ) ছিলেন। কারা এ ঘটনার সাথে যুক্ত তা তিনি জানেন না।

এ দিকে ইমামুলের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর ভাতুড়িয়া ও আশপাশের গ্রামের লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা ভাতুড়িয়া মোড়ে অবস্থান নিয়ে দোকান পাট বন্ধ করে দেয়। সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে পান্নুর পোষ্য সন্ত্রাসী বাহিনী ইমামুলকে গুলি করে হত্যা করেছে। এলাকার লোকজন চাঁচড়া দাড়িপাড়ায় পান্নুর বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। বাড়ির সামনে রাখা পান্নুর ব্যক্তিগত (ঢাকা মেট্টো-ক-০২-০৫৬৫) জিপ গাড়িটিও ভাঙচুর করে।

এ সময় প্রথম সংবাদ পেয়ে চাঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির সদস্য সেলিম রেজা পান্নুর বাড়ির সামনে যায়। সেখানে বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের উপরও হামলা চালায়। এ সময় চাঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির এটিএসআই আনারুল ইসলাম মাথায় আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত জখম হন। এছাড়া ভাতুড়িয়ার শের আলীর ছেলে আনিসুর রহমান আহত হয়েছে। তাদের দুইজনকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সংবাদ পেয়ে পুলিশের একাধিক টিম ভাতুড়িয়া এলাকায় যায়। পিবিআই ও ডিবি পুলিশের সদস্যরাও ভাতুড়িয়া বাজারে অবস্থান নেন। পুলিশ সেলিম রেজা পান্নুর বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রী লাকি, মেয়ে তরু এবং তার শাশুড়িকে হেফাজতে নিয়েছে।

এ ঘটনার পর কোতয়ালি থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই আমিরুজ্জামান বিকেলে সেলিম রেজা পান্নুর অফিসে তল্লাশি চালায়। সেখান থেকে ৪ রাউন্ড গুলি একটি শর্টগান জব্দ করেছে।

তিনি বলেছেন, ঘটনাস্থলে যে গুলি পাওয়া গেছে ওই গুলির সাথে উদ্ধার করা গুলির মিল রয়েছে। এখন দেখতে হবে গুলি বা শর্টগান বৈধ কি-না।

এর আগে যে ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে এই গুলির ঘটনা তাদেরকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে বলে প্রচার হলেও কোতয়ালি থানার ওসি মনিরুজ্জামান আটকের কথা অস্বীকার করেছেন। আর হামলা চালানোর অভিযোগে পুলিশ আয়নালের ছেলে মান্নানকে আটক করে। হত্যার অভিযোগে তানভির নামে এক যুবকের নাম উঠায় তাকে না পেয়ে তার পিতা রাজাকে আটক করার সংবাদ পেলেও পুলিশ আটকের কথা অস্বীকার করেছে।

ওসি মনিরুজ্জামান জানান, পুলিশ আসামি আটকের জন্য অভিযান চালাচ্ছে। নিহতের পরিবারের লোকজন মামলা করলে তা গ্রহণ করা হবে।