জ্বরে বাসের মধ্যে মৃত্যু: কীভাবে চলবে ভূমিহীন ইকরামের পরিবার

বাসের মধ্যে মৃত ইকরাম হোসেন

:: নিজস্ব প্রতিবেদক, নড়াইল ::
নড়াইলে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ইকরাম হোসেনকে (৪৫) কেড়ে নিল ডেঙ্গু। তার মৃত্যুর পর তিন সন্তানসহ ৪ সদস্যের পরিবারের উপার্জনক্ষম বলতে এখন আর কেউ থাকলো না। জীবিকার তাগিদে নড়াইল থেকে ঢাকায় গেলেও মাত্র দেড় মাস পরই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নড়াইলে পরিবারের কাছে ফেরার সময় হানিফ পরিবহনেই তার মৃত্যু হয়।

২৫ জুলাই (বৃহস্পতিবার) সকালে হানিফ পরিবহন থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ভূমিহীন ইকরামের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবারের সদস্যরা।

জানাগেছে, সদর উপজেলার বাগডাঙ্গা গ্রামে নিহত ইকরাম হোসেন ভূমিহীন ছিলেন। সরকারি জায়গায় একটি টিনের ছোট ঘরে স্ত্রী, তিন সন্তান ও মাকে নিয়ে ৫ সদস্যের সংসার ছিল তার। কখনও দিন মুজুর, কখনও ইজিবাইক চালিয়ে কোনো রকমের পরিবার নিয়ে দিন কেটে যাচ্ছিল তার। একটু ভালোভাবে থাকার জন্য পরিচিত এক লোকের মাধ্যমে ঢাকায় ৯ হাজার টাকা বেতনে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি পান তিনি। প্রথম মাসে ১৭দিনের কাজের বেতনও পেয়ে বাড়িতে টাকা পাঠান তিনি।

পরবর্তী মাসের বেতন পেয়ে বাবা টাকা পাঠাবেন. সে টাকা দিয়ে তিন বেলা পেট ভরে খেতে পারবে এবং স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারবে এমনই আশা নিয়ে বসে ছিলো ইকরামের ৩ সন্তানেরা। স্বামী টাকা পাঠালে সেই টাকা দিয়ে বাজার করে সন্তানদের মুখে তিন বেলা খাবার রান্না করে দিতে পারবে এমন স্বপ্নও দেখেছিলেন ইকরামের স্ত্রী লতিফা বেগম (৩৬)। ছেলে টাকা পাঠালে এখন থেকে ঠিক মত ওষুধ খেতে পারবেন বলে ভেবেছিলেন ৬৫ বছর বয়সী ইকরামের মা। কোমলমতী সন্তান, স্ত্রী ও বৃদ্ধা মায়ের সকল স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে ডেঙ্গুতে।

ইকরামের স্ত্রী লতিফা বেগম জানান, তার বড় ছেলে মেহেদী হাসান (১৪) ৮ম শ্রেণিতে, ছোট ছেলে ফেরদৌস (৬) ৩য় শ্রেণিতে পড়ে। মেয়ে ফাতেমা খানমকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর টাকার অভাবে আর পড়ালেখা করাতে পারিনি। তাদের এক শতক জমিও নেই। এক টাকা ইনকাম করবে এমন কোন মানুষ তাদের সংসারে নেই। ভূমিহীন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম তার স্বামীই ছিলেন।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি আরও বলেন, ঢাকায় যেয়েই তার স্বামীর ডেঙ্গু হয়েছে। ঢাকাতে না গেলে তার স্বামীর ডেঙ্গু হতনা।

ইকরামের মেয়ে ফাতেমা খানম বলেন, আমরা সরকারি জায়গায় ঘর বেধে থাকি। বাবা মারা গেছে এখন আমাদের সাহায্য করার মত কোনো মানুষ নেয়। ভাই ২টা এখনও অনেক ছোট। এখন আমরা কোথায় যাব কি খাব।

নিহতের চাচাতো ভাই কবির হোসেন বলেন, ইকরাম বাড়িতে থাকা অবস্থায় দিন মুজুর, ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালাতো। পরিবার নিয়ে একটু ভালোভাবে থাকার জন্য ঢাকায় একটি সিকিউরিটি কোম্পান্নিতে চাকরি নেয়। এলাকাতে ইকরাম একজন সৎ মানুষ হিসেবে সবার কাছে প্রিয় ছিল।

স্থানীয় ইউপি সদস্য রকিবুল ইসলাম জানান, লাশ বাড়িতে আসার ২দিন আগে শুনেছিলাম ঢাকায় যেয়ে ইকরামের ডেঙ্গু হয়েছে। ২দিন পরই দেখলাম সে মারা গেল। ইকরামের পরিবার এখন খুবই দরিদ্র। তাদেরকে সাহায্য করার মত কোনো মানুষ নেয়। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে বিষয়টি অবগত করবেন।

জানাগেছে, গত সপ্তাহে ইকরাম বাড়িতে ফোন করে বলে তার ডেঙ্গু হয়েছে। ২৪ জুলাই (বুধবার) রাতে ঢাকার আব্দুল্লাহপুর থেকে নড়াইল সদর উপজেলার বাগডাঙ্গা গ্রামের ইকরাম হোসেন হানিফ পরিবহনে ওঠে। দৌলদিয়া ঘাটে এলে পরিবহনের সুপারভাইজারের কাছে জানতে চান এটা কোথায়। নড়াইলের কালনা ফেরিঘাটে এসে বাসের পিছনের যাত্রীরা বাইরে নামলেও ইকরাম নামেনি।

এ সময় পরিবহনের লোকজন বুঝতে পারে তার মৃত্যু হয়েছে। পরিবহনের লোকজন বাস নিয়ে নড়াইল সদর থানায় চলে আসেন। পরে পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে প্রেরণ করে।