তিতাসের মৃত্যু : ভিআইপি কালচার রাজনৈতিক সরকারের জন্য নয়

ছোটবেলায় পড়তাম বা শুনতাম ফুলের মত মুখখানি। তখন ঠিক মনের গভীর থেকে এই ফুলের মত মুখখানির অর্থ বুঝতাম না। মনে হতো একটি সুন্দর মুখের উদাহরণ দেবার জন্যে ফুলের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। আজ এই পরিণত বয়সে এসে যখন শিশুদের মুখের দিকে তাকাই তখন বুঝতে পারি এই উপমাটি যিনি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন তিনি কত শক্তিশালী কবি!

চলতি পথে যখন কোন স্কুলের ছুটি হয়েছে বা শিশুরা দলবেঁধে স্কুলে যাচ্ছে দেখি, তখন অপলক তাকিয়ে তাকিয়ে থাকি, যেন কোন এক অজানা শক্তি পৃথিবীতে নিজহাতে এই ফুলের বাগান তৈরি করেছে। তখন মনে হয় মানব জীবনটি বড় সুন্দর। ওদের ছোটাছুটি একটা স্বর্গীয় আমেজ এনে দেয়। আমার বাসার কাছে শিশুদের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আছে। ছোট ছোট শিশুগুলো যখন বের হয় তখন আমাদের নিজস্ব রাস্তাটি একটি ফুলের বাগান হয়ে যায়। ড্রাইভারকে বলা আছে, আমাদের বের হবার সময় যদি স্কুল ছুটি হয়, তুমি রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখবে- ওরা চলে গেলে তারপরে আমরা যাবো। কারণ, অনেকক্ষণ মাকে ছেড়ে ওরা স্কুলে থাকে। তাই স্কুলের গেট থেকে বের হয়েই মাকে পেয়ে ওদের মনে একটা আলাদা আনন্দ আসে। ওই আনন্দে ওরা লাফালাফি করে, হঠ্যাৎ দৌড় দেয়। ওরা ওই সময়ে ঠিক নিজের ভেতর থাকে না।

গত দুই দিন তিতাসের মুখ আর ওই সব শিশুর মুখ কেবলই চোখের সামনে ভেসে উঠছে। কোন মতেই মেনে নিতে পারছি না তিতাসের মৃত্যুটা। অমন ফুলের মত মুখটার ঝরে যাওয়া। তিতাস নড়াইলের কালিয়ার ছেলে। সেখানে খোলা আকাশ আছে, মাঠ আছে। ও নিশ্চয়ই ওই আকাশের দিকে চেয়ে খোলা মাঠ বেয়ে দৌড় দিতো। দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরতো। তিতাস আর কোনদিন তার মাকে জড়িয়ে ধরবে না। তিতাস পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। তিতাস মারা গেছে। তিতাসকে মারা যেতে হয়েছে। তিতাসকে কেন মারা যেতে হয়েছে সে প্রসঙ্গে যাবার আগে কেবল একটি বিষয় মনে করা দরকার। পৃথিবীতে একটি মায়ের কোল খালি হয়েছে। বাস্তবে একটি মায়ের কোল খালি হওয়া, পিতার কাঁধে একটি সন্তানের মৃতদেহ – এ যে কী দুঃসহ তা বোঝানোর ভাষা অন্তত আমার হাতে নেই। রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেছেন, প্রকাশ করেছেন পৃথিবীর আরো অনেক বড় বড় কবি। যার ভেতর এক রাশিয়ান কবির একটি কবিতার লাইনের মমার্থ এই মুহূর্তে মনে পড়ছে, লাইনের বাংলা অর্থটি এমন ছিল- যে যেখানে যুদ্ধ করুক, যার গুলিতে যেই মারা যাক না কেন, ঠিকই খালি হয় একটি মায়ের কোল। তাই যার কারণে তিতাসের মৃত্যু ঘটেছে, তিনি কেবল একবার ভেবে দেখতে পারেন- তিনি যত বড় ভিআইপি হোন না কেন, যতই ক্ষমতাশালী হোন না কেন, তার কারণে খালি হয়েছে একটি মায়ের কোল! ভিআইপি সাহেবের যা বয়স তাতে তার ঘরেও মায়ের কোল আছে। তিনি নিশ্চয়ই সেই কোলের দিকে তাকিয়ে একবার ভেবে দেখবেন, কোনটি বড়- পৃথিবীতে ক্ষমতার দাপট দেখানো? না একটি মায়ের কোল ভরে সন্তান থাকা?

কোনটা তার কাছে ভালো লাগবে- একটি মায়ের শুন্য কোল? না তিনি যে ক্ষমতার দাপট দেখাতে পারেন সেটা?

আমরা মাঝে মাঝে এই পৃথিবীতে স্নেহ, মায়া, মমতা এমনকি আমাদের জীবনের নশ্বরতার কথা ভুলে যাই। কখনো ক্ষমতার মদ-মত্ততা, কখনো অর্থের মদ-মত্ততা, কখনো অজ্ঞতার মদ-মত্ততা আমাদের পৃথিবীর নশ্বরতা, স্নেহ মায়া, মমতা, বিনয়, নম্রতা এগুলো ভুলিয়ে দেয়। তা না হলে একজন সরকারী বড় কর্মকর্তা বলে তিনি তিন ঘণ্টা ফেরি আটকে রাখবেন। তিনি তো শিক্ষিত মানুষ। তার স্বাভাবিক বিবেচনায় তো আসার কথা, ওই পথে রোগি থাকতে পারেন, প্রসূতি থাকতে পারেন, শিশু থাকতে পারে, বৃদ্ধ থাকতে পারেন। এ সবই তো একজন মানুষের সংসারে আছে। তাই এ সাধারণ চিন্তাটুকু তিনি কেন করতে পারবেন না? আর ক্ষমতার অপব্যবহারের যেমন কোন কৃতিত্ব নেই, তেমনি এটা মানুষের আচরণের ভেতরও পড়ে না। প্রকৃত ক্ষমতাবান কখনো তা করেন না।

প্রকৃত যিনি ক্ষমতাবান হন তিনি কখনোই কিন্তু ক্ষমতায় মদমত্ত হন না। আমরা গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে ক্ষমতা দেখেছি মহাত্মা গান্ধীর। তার এক ডাকে সারা দেশের মানুষ বাড়িতে কোন রান্না না করে ‘অরন্ধন দিবস’ পালন করেছে। গোটা দেশের মানুষ না খেয়ে থেকেছে। সেই ক্ষমতাবান মানুষটির পোশাক, জীবনাচরণ, বিনয় আমরা ইতিহাস থেকে জেনে নিতে পারি। যিনি ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণিতে যাতায়াত করতেন। তারপরেও কিন্তু গোটা পৃথিবী জানতো, গোটা ভারতবাসী জানতো তিনিই ভারতের সব থেকে ক্ষমতাবান মানুষ। আমরা আমাদের এই বাংলার নরম মাটিতে দেখেছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে। যার ক্ষমতা সম্পর্কে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট লিখেছিলেন, শেখ মুজিব ডাক দিলে পদ্মার পানি উজানে চলে আসে। ওই ক্ষমতাধর মহামানব কিন্তু কোনদিন ক্ষমতা দেখাননি সাধারণ কোন মানুষের ওপর। বরং দেশের শত্রুদের, মানুষ হত্যাকারীদের শাস্তি দেবার রাষ্ট্রীয় ও আর্ন্তজাতিক বৈধতা পাবার পরেও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করেছিলেন। শুধু এ নয় তার নিজের মানুষের বিপদে তিনি সব সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের কাছে পৌঁছেছেন। একবার ঝড়ের ভেতর তিনি ভোলায় গিয়েছিলেন হেলিকপ্টার নিয়ে, তখনও বাতাস কমেনি, পাইলট বার বার বলছিলেন, ল্যান্ড করা বিপদ, তিনি বলেছিলেন, তিনি তার মানুষের কাছে যেতে কোন বিপদকে ভয় করেন না। পাইলট ঝড়ের মাঝেই হেলিকপ্টার নামিয়েছিলেন। আমরা কি এখান থেকে শিখতে পারিনা, ক্ষমতা মানুষকে আরো বেশি মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে। যা আমরা দেখতে পাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভেতর। ১৯৯১ সালে তিনি তখন বিরোধী দলীয় নেতা। ’৯১ এর ঝড়ের পরে চট্টগ্রামে দুর্গত এলাকায় গিয়ে তিনি যেভাবে নৌকায় উঠেছিলেন, আমরা অনেকে সেদিন ভয়ে ভয়ে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের শতভাগ মানুষ ভালোবাসতেন। গত সপ্তাহের কলরেডির জরিপ অনুযায়ী দেশের আশিভাগ মানুষ শেখ হাসিনাকে পছন্দ করেন। এর অর্থ তিনিও প্রায় বঙ্গবন্ধুর সমান ক্ষমতাধর এ মুহূর্তে- তিনি কি কখনো ক্ষমতার দাপট দেখান? তিনি কীভাবে একজন সাধারণ মানুষকে বুকের ভেতর টেনে নেন। তার কাছ থেকেও কি বর্তমান ভিআইপিরা শিক্ষা নিতে পারেন না?

হ্যা, প্রধানমন্ত্রীর চলাচলে প্রোটেকশন নিতে হচ্ছে। এর কারণ গোটা দেশের মানুষ জানেন। তার নিরাপত্তার ঝুঁকি পৃথিবীর যে কোন রাষ্ট্র নায়কের থেকে বেশি। তার নিরাপত্তা দেশের জনগণ চায়। তার নিরাপত্তার জন্যে পথ চলাচলে যেটুকু বাধার সৃষ্টি হয়, কষ্ট হয় মানুষ সেটা মেনে নেয়। কিন্তু কেউ বলতে পারবে না তিনি কখনো প্লেন আটকে রেখেছেন, তিনি না যাওয়া অবধি প্লেন যাবে না- এমনটি কিন্তু কখনো ঘটেনি। তাঁর জন্যে ফেরি বন্ধ করে রাখা হয়েছে এমনও ঘটে না। অথচ আমরা মাঝে মাঝে নিউজ পাই অমুক কর্মকতার জন্যে প্লেন দুঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে। তিনি আসার পরে তাই প্লেন ছাড়ে। কখনো দেখতে পাই নির্বাচন কমিশনার বিজনেস ক্লাসে টিকেট কেটেও বিজনেস ক্লাসে বসতে পারেন না, অন্য ভিআইপিকে বসানো হয়। আর যেখানে মানুষের দ্রুত ও নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যুদ্ধ করে পদ্মা সেতু তৈরি করছেন। ফোর লেন , সিক্স লেন করছেন- সেখানে তার অফিসের ভিআইপির কারণে তিনঘণ্টা ফেরি আটকে রাখা! একটি ছেলের মৃত্যু! একটি মায়ের বুক খালি! এটা কি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যায়? আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে যেই হোক না কেন, অন্যায় করে পার পাবে না। এর তদন্ত হবে। বিচার হবে।

বাস্তবে সবাই এর তদন্ত চায়। বিচার চায়। তবে পাশাপাশি এটা আরো বেশি করে চায় যে, এই তথাকথিত ভিআইপি কালচার থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এই সব কালচার ঔপনিবেশিক সরকারের কালচার, সামরিক সরকারের কালচার। এই কালচার কোন মতেই আওয়ামী লীগের মত একটি রাজনৈতিক দলের সরকারের সঙ্গে যায় না। আর রাজনৈতিক সরকারে সকলে কিন্তু এ কাজ করেন না। যেমন কামাল নাসের চৌধুরি যখন মুখ্য সচিব ছিলেন, তিনি কিন্তু নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি যে জেলায় পরিদর্শনে যান কেন, তাকে রিসিভ করার জন্যে যেন রাস্তায় কর্মচারীদের দাঁড় করানো না হয়। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি তখন এমপি ছিলেন সেই সময়ে তার এলাকায় গিয়ে দেখেছি, তিনি লুঙ্গি পরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মাঠের ভেতর দিয়ে ঘুরছেন, সাধারণ মানুষের সমস্যা শুনছেন। আর এ পথে চলতে পেরেছেন বলেই আজ তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে এবং এখনো সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান যখন অনেক বড় নেতা, বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি তখনও তাকে দেখেছি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ট্রেনে কিশোরগঞ্জ যেতে। মতিয়া চৌধুরি এখনও বাসে চড়ে নিজ এলাকায় যান।

আওয়ামী লীগের নেতাদের এমন হাজারটি উদাহরণ লিখতে খুব বেশি নথিপত্র ঘাটতে হবে না। স্মৃতি থেকেই লেখা যাবে। তাই সেই আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়, এই সময়ে দেশে এই তথাকথিত ভিআইপি কালচার চলবে, আর তার জন্যে ফুলের মত একটি শিশুকে প্রাণ দিতে হবে- এটা কি আওয়ামী লীগ দল হিসেবে মেনে নিতে পারে? সাধারণ মানুষের মেনে নেবার কথাটি পরে আসুক। তাই এ ক্ষেত্রে দল আওয়ামী লীগের দায়িত্ব আছে। তারা যদি তাদের রাজনৈতিক সরকারের আমলটি এমন তথাকথিত ভিআইপিদের হাতে ছেড়ে দেয়, তাদের অনেক মন্ত্রী এমপি যদি বড় বেশি ভিআইপি হয়ে যান তাহলে ভবিষ্যতে তাদেরই মূল্য দিতে হবে সব থেকে বেশি। কারণ, দলের বিপদের সময় এই সব ভিআইপিরা রঙ বদলিয়ে ফেলে। ১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্ট থেকে শুরু করে ১/১১ অবধি এদেশের মানুষ এমন বহু রঙ বদল দেখেছে। আমরাও দেখেছি। তাই দল আওয়ামী লীগকেই নিশ্চিত করতে হবে, রাজনৈতিক সরকারের আমলে ভিআইপি কালচার নয়।