‘ভিআইপি’ থাকলেও অ্যাম্বুলেন্স অগ্রাধিকার পায় : হাই কোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক : অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষ

অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষ

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে যে ‘ভিআইপি’ সুবিধা প্রযোজ্য নয়, আর ফেরি পারাপারের মত ক্ষেত্রে যে অ্যাম্বুলেন্সকে অগ্রাধিকার দিতে হয়- সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন হাই কোর্টের একজন বিচারক।

একজন যুগ্ম সচিবের অপেক্ষায় তিন ঘণ্টা ফেরি না ছাড়ায় অ্যাম্বুল্যান্সে স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে এক রিট মামলার শুনানিতে বুধবার আদালতের ওই বার্তা আসে।

শুনানি শেষে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাই কোর্ট বেঞ্চ তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেয়।

পদমর্যাদায় অতিরিক্ত সচিবের নিচে নয়- এমন একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে বিষয়টি তদন্ত করে তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে জনপ্রশাসন সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

পাশাপাশি ওই স্কুলছাত্রের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে কেন ৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে আদালত।

নড়াইলের কালিয়া পৌর এলাকার ষষ্ঠ শ্রেণির স্কুলছাত্র তিতাস গত বৃহস্পতিবার সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পায়। গুরুতর অবস্থায় তাকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে ঢাকার পথে রওনা হয় তার পরিবার।

কিন্তু সরকারের এটুআই প্রকল্পে দায়িত্বরত আবদুস সবুর মণ্ডলের গাড়ির অপেক্ষায় মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ঘাটে ফেরি দাঁড় করিয়ে রাখা হয় তিন ঘণ্টা। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় তিতাস।

তার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএর কর্তাদের অনুরোধ করেও সেদিন কোনো কাজ হয়নি। সরকারি জরুরি সেবার হটলাই ৯৯৯ এ ফোন করা হলেও ফেরি দ্রুত ছাড়তে কেউ কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর যুক্ত করে এই রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জহিরুদ্দিন লিমন।

বুধবার ওই আবেদনের ওপর শুনানিতে হাই কোর্ট তার কাছে রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম জানতে চাইলে লিমন গত সোমবার একটি টেলিভিশনে সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব ড. সা’দত হোসেন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকের আলোচনার অনুলিখন আদালতে তুলে ধরেন।

সেখানে বলা হয়, দেশে ভিভিআইপি মাত্র দুইজন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী।

নৌ পরিবহন আইন অনুযায়ী, জাহাজ বা ফেরিতে ওঠার জন্যে অগ্রাধিকার পাবে ক্রমান্বয়ে লাশবাহী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স এবং ভিআইপি।

অর্থাৎ, কোনো ভিআইপির গাড়ি জাহাজ বা ফেরিতে ওঠার সময় তিন নম্বর ক্রমে অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু কোনোভাবেই জাহাজ বা ফেরি থামিয়ে রাখা যাবে না।

বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের তখন বলেন, “আমরা ঘটনাটি জানি। সরকারের কোনো স্তরের কর্মকর্তাই কেউ ভিআইপি নন। তারা পাবলিক সার্ভেন্ট। সারা বিশ্বে অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপণে ফায়ার সার্ভিস এবং নিরাপত্তার জন্য পুলিশের গাড়ি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেতে দেওয়া হয়।

“আর এখানে ঘটেছে তার উল্টোটা। ভিআইপি কারা সেটা আইনেই বলে দেওয়া আছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটা অন্য কারো ক্ষেত্রে নয়।

“ভিআইপি থাকলেও অ্যাম্বুলেন্সকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগে যেতে দেওয়া হয়ে থাকে, কারণ এর সঙ্গে একজন মানুষের জীবন-মৃত্যুর বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে।”

আইজীবী লিমন তখন সরকারের কোন স্তরের কর্মকর্তারা ভিআইপি সুবিধা পাবেন না সেটিও তুলে ধরেন।

আইন থেকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় কোনো বার্তাবাহক (রাষ্ট্রীয় দূত) হিসাবে তিনি জাহাজ বা ফেরিতে উঠবার অগ্রাধিকার পাবেন, এক্ষেত্রেও ফেরি/জাহাজ থামিয়ে রাখতে পারবেন না।”