যশোরে করলা গ্রাম লেবুতলা!

:: নিজস্ব প্রতিবেদক ::
গ্রাম্য রাস্তার দু’পাশে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজের সমারোহ। মাঠজুড়ে মাচা দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে করলা গাছ। গাছে ঝুলন্ত করলা আর মাচার উপর সবুজ জমিনে হলদে ফুলের উপস্থিতি। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় পুরো মাঠ এভাবে করলার আবাদে এক অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা করেছে। প্রায় সারা বছর ফলন হয় আর বিক্রি করা যায় বলে লাভও বেশি। সে কারণে যশোর সদরের লেবুতলা ইউনিয়নের কৃষক করলা চাষে বেশি ঝুঁকে পড়েছেন।

যশোর-মাগুরা সড়কের কোদালিয়া বাজার থেকে বায়ে ঢুকে কিছুদূর যাওয়ার পরই চোখে পড়ে মাঠের পর মাঠ করলা আবাদে সবুজ হয়ে গেছে- এ যেন ‘করলা গ্রাম’।

লেবুতলা ইউনিয়নের ৪নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর শওকত আলী জানান, পুরো ইউনিয়নে করলা চাষ বেশি হলেও ফুলবাড়ি, কোদালিয়া, নোঙরপুর, লেবুতলা, শর্শুনাদহ এবং বীরনারায়ণপুর গ্রামের কৃষক এ চাষ বেশি করছে। এসব গ্রামের প্রায় ৬০০ বিঘা জমিতে চাষ হচ্ছে করলা।

তিনি জানান, একবার গাছ লাগালে চারমাস ধারাবাহিকভাবে ফলন হয়। প্রতি সপ্তাহে বিঘাপ্রতি প্রায় ২০ মণ করলা ধরে। প্রতিমণ করলা পাইকারি বিক্রি হয় ৬০০ টাকা বা তার উপরে। সে হিসেবে মাসে এক বিঘা জমিতে ৪৮ হাজার টাকার করলা বিক্রি হয়। চার মাসে বিক্রি হয় এক লাখ ৯২ হাজার টাকা। আবাদে বিঘাপ্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয় বলে লাভও বেশি। টাকা পাওয়া যায় ধারাবাহিকভাবে। সে কারণে কৃষকের আগ্রহ করলা চাষের দিকেই বেশি।

তিনি জানান, প্রায় ২০ বছর আগে গ্রামগুলোর মানুষ করলা চাষ শুরু করলেও এর ব্যাপকতা শুরু হয়েছে ১০ থেকে ১২ বছর আগে।

বীরনারায়ণপুর গ্রামের কৃষক নন্দ ঘোষ এবার তিনবিঘা জমিতে করলা চাষ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ধানের থেকে করলা চাষে লাভ বেশি। এটা পুরো মৌসুম ধরেই বিক্রি করা যায়। কৃষকের হাতে টাকার কোনো ঘাটতি পড়ে না। করলা চাষ বৃদ্ধির এটাও একটা কারণ।

ফুলবাড়ি গ্রামের আব্দুল খলিল বলেন, আমাদের এলাকার অধিকাংশ কৃষক বছরে দুইবার করলা চাষ করে। অনেকে তিনবারও এ চাষ করছে।

শর্শুনাদহ গ্রামের কৃষক মিরাজ আলী বলেন, ইউনিয়ন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা চাষের ব্যাপারে আমাদেরকে সব ধরণের সহযোগিতা করেন। তারা গ্রামে এসে কৃষকদের সাথে কথা বলেন, নানা পরামর্শ দেন।

সাধারণত চাষের জন্য উন্নতমাণের বীজ নির্বাচন, আবহাওয়া ভেদে গাছের পরিচর্যা, পোকার ধরণ ও এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কোনো কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য দিয়ে থাকেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানালেন শর্শুনাদহ গ্রামের আরেক কৃষক আশরাফুল ইসলাম।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শেখ এমদাদ হোসেন বলেন, একবিঘা জমিতে প্রায় আড়াইটন করলা উৎপন্ন হয়। প্রতি বিঘায় কৃষক প্রায় এক লাখ টাকা লাভ করতে পারে। সে কারণেই কৃষক বর্তমানে করলা চাষে উৎসাহী হয়ে উঠছে।

তিনি জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়।

কৃষকরা জানান, এ বছর আবহাওয়া প্রতিকুল হওয়ায় ফলন একটু কম। সপ্তাহে বিঘাপ্রতি করলা পাওয়া যাচ্ছে ১০ থেকে ১২ মণ। বছরের প্রথম দিকে দু’একদিন সামান্য বৃষ্টি হওয়াতে গাছগুলো ভাল হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ খরা ও তাপদাহে গাছের কোনো ক্ষতি না হলেও ফলনটা কমে গেছে। এতে আশানুরূপ লাভ একটু কমে যাবে বলে তাদের অভিমত।

কৃষকরা আরো জানান, এ এলাকার করলা সাধারণত লেবুতলা, খাজুরা এবং ভাটারহাটে উঠানো হয়। অনেক পাইকার মাঠে এসেও কিনে নিয়ে যান। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণ অবস্থার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে হাটে করলা তোলা যায় না। সামান্য বৃষ্টিতেই গ্রামের রাস্তুগুলো যান চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। তখন পাইকারদেরও দেখা মেলে না। অনেক করলা মাঠে বা রাস্তায় পড়ে নষ্ট করা ছাড়া উপায় থাকে না।

মেম্বর শওকত আলীর তথ্যমতে ছয় করলাগ্রামে প্রায় ২০ কিলোমিটার রাস্তা রয়েছে। এরমধ্যে লেবুতলা থেকে শর্শুনাদহ ৪ কিলোমিটার, লেবুতলা থেকে কাশিমপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার, কোদালিয়া থেকে বীরনারায়ণপুর ৩ কিলোমিটার, ফুলবাড়ি থেকে হাফানিয়া ৩ কিলোমিটার এবং শর্শুনাদহ থেকে লাউখালি পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার রাস্তা রয়েছে। এর মাত্র ৩ কিলোমিটার হেরিংবন-তাও চলাচলের অনুপযোগী। বাকী ১৭ কিলোমিটার রাস্তা কাঁচা। বৃষ্টি হলেই এসব রাস্তা দিয়ে মানুষ হাটতে পর্যন্ত পারে না।

লেবুতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলিমুজ্জামান মিলন বলেন, করলা চাষে স্থানীয় কৃষকরা স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন। কৃষি কর্মকর্তারা ভাল সহযোগিতা দেন। বাজারও ভাল। সে কারণে লাভ বেশি। তাই এ এলাকার কৃষক বেশি বেশি করলা চাষ করছে।

রাস্তা সমস্যার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে চেয়ারম্যান আলিমুজ্জামান মিলন বলেন, অভিযোগ সত্য। আমি চেয়ারম্যান হওয়ার আগে রাস্তার অবস্থা আরো ভয়াবহ ছিল। আমি পাশ করার পর অনেক রাস্তা করেছি। আরো কিছু রাস্তার টেন্ডার হয়েছে। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি পর্যায়ক্রমে রাস্তার জন্য বরাদ্দ নিয়ে আসতে।