কোরবানি পশুহাটে এবার ক্রেতাদের পছন্দ দেশি জাতের ছোট আকৃতির গরু

 

 

:: স্পন্দন ডেস্ক ::
কোরবানীর ঈদ যতই এগিয়ে আসছে বিভিন্ন স্থানের পশুহাটগুলো জমে উঠছে। এবার বিভিন্ন হাটে অধিক সংখ্যক গরু ছাগলের আমদানি হয়েছে। পশুর তুলনায় ঝিনাইদহ, মাগুরা, বাগেরহাট ও ডুমুরিয়ায় হাটে পশুর চেয়ে ক্রেতা সংখ্যা কম। স্থানীয় ক্রেতাদের একটি অংশ কৃষকদের বাড়ি থেকে সরাসরি গরু কিনছেন। তাছাড়া বাইরের ব্যাপারিদের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় ছোট ছোট খামারিরা ভাবনায় পড়েছেন। অনেকেই লোকসানের আশঙ্কা করছেন। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের রিপোর্টে-

ঝিনাইদহ থেকে খাইরুল ইসলাম নিরব জানান, দেশীয় পদ্ধতিতে খড়, সবুজ ঘাষ, দানাদার খাবার খাইয়ে গরু মোটা তাজা করে ভালো লাভের আশায় বাজারে বিক্রয় করতে আসা খামারিদের মুখে তেমন হাসি নেই। অনেকে স্বল্প লাভে বিক্রয় করছে গরু। এমনই চিত্রের দেখা মিলেছে ঝিনাইদহের পশুর হাটগুলোতে। তবে শেষ মুহূর্তে ভারতীয় গরু আমদানীর শঙ্কা না থাকায় অনেকে আবার বেশি লাভের আশায় হাটে গিয়ে দিন গুণছেন। এমনকি অনেকের ধারণা এখন পর্যন্ত গরুর দাম যেমন আছে এমন থাকলেও তারা কিছুটা হলেও লাভবান হবেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে এবার জেলায় কোরবানির জন্য ২৩৭ টি খামারে দেশীয়, পাবনায় ষাঁড়, নেপালী ষাড়, সিন্ধি সহ বিভিন্ন জাতের ৫৫ হাজার ৮ শ’ ৯৬ টি গরু বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়েছে। দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করনের ফলে চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, মাদারিপুর এমনকি ফেনীসহ বিভিন্ন জেলায় ঝিনাইদহের গরুর যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফলে জেলার চাহিদা পুরন করে অর্ধেকেরও বেশি গরু বাইরের জেলায় বিক্রির আশা খামারি ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের। ইতোমধ্যেই অনেক খামারি গরু বিক্রি করতে শুরু করেছেন। জেলার বিভিন্ন উপজেলার ২৪টি স্থায়ী ও ৩টি অস্থায়ী গরুর হাট বসানো হয়েছে। হাটগুলোতে আনা হচ্ছে বিভিন্ন জাতের গরু।

এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলছেন, ঝিনাইদহে কোরবানীর চাহিদা মিটিয়ে এ গরু দেশের বিভিন্ন জেলার চাহিদা মিটিয়ে থাকে। যদি এবার সব জেলায় গরু ভালোভাবে পৌঁছাতে পারে তাহলে খামারিরা লাভবান হবেন।

সদর উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া গ্রামের গরু খামারি পারভেজ মাসুদ লিল্টন বলেন, তার ফার্মে এবার ৩৭টি গরু আছে। দাম বেশি না হওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। তবে ঈদের আগের বাজারে গরুগুলি বিক্রয়ের চেষ্টা করবেন।

পোড়াহাটি ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের গরু খামারি শাহ আলম বলেন, তার ৩৫ মণ ওজনের একটি ষাঁড় রয়েছে। নাম তার যুবরাজ । ষাড়টি বাড়িতে থাকা অবস্থায় গরুর ব্যাপারীরা দাম দিয়েছিল ১৮ লাখ। ষাঁড়টি বিক্রয়ের জন্য ঢাকার গাবতলী পশু হাটে নিয়েছেন। কিন্তু আশানারুপ দাম পাচ্ছেন না তিনি। একই রকমভাবে জেলার বিভিন্ন খামারিরা এবার গরু দাম নিয়ে চিন্তিত।

এদিকে ঝিনাইদহ পুলিশ সুপার-হাসানুজ্জামানের নির্দেশে জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি বিশেষ টিম জেলার পশুর হাটে সার্বিক নিরাপত্তা ও জাল টাকা শনাক্ত করণে টহল নিচ্ছে ও সচেতনতামূলক প্রচারণা করে যাচ্ছেন।

মাগুরা থেকে এস আলম তুহিন জানান: আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মাগুরায় শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে পশু কোরবানির হাট । ক্রেতাদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে জেলার প্রতিটি পশু খামারিরা ভালো ও উন্নত মানের পশু হাটে তুলছেন । প্রতিটি হাটে উঠছে ছোট-বড় মাঝারি সাইজের হাজার-হাজার গরু। তবে দাম নিয়ে খুশি নয় কোনো পক্ষই। ক্রেতারা বলছেন, দাম বেশি। স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যাপারীদের কাছে চাহিদার সৃষ্টি করেছে গৃহস্থদের পালা স্বাস্থ্যসম্মত দেশি জাতের গরু। যা স্থানীয় পশু হাটগুলোতে সকলের কাছে ‘টাইট গুরু’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মাগুরা বিভিন্ন এলাকায় বসেছে গরুর হাট। তবে সদরের রামনগর, কাটাখালী, ইটখোলা বাজার, আলমখালী, শত্রুজিৎপুর, মহম্মদপুরের বেথুলিয়া, বেথুলিয়া, নহাটা, শালিখার আড়পাড়া, সীমাখালী, বুনাগাতী ও শ্রীপুর উপজেলার লাঙ্গলবাধ, সারঙ্গদিয়ায় বসেছে জেলার বড়- বড় কোরবানির গরুর হাট। এসব হাটে উঠেছে ছোট-বড় সাইজের বিভিন্ন জাতের হাজার-হাজার গরু। সাধারণ ক্রেতাদের পাশাপাশি ব্যাপারীদের নজর কেড়েছে গৃহস্থদের পালা মাঝারি সাইজের কেমিকেল মুক্ত দেশি গরু। রামনগর, কাটাখালী, ইটখোলা বাজার পশু হাট ঘুরে দেখা গেছে, ক্রেতাদের চাহিদার শীর্ষে থাকা এ ধরনের টাইট গরু ৭০ থেকে ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোরবানির জন্য কিনতে আসা অধিকাংশ ক্রেতাকেই দেখা গেছে এ ধরনের গরু কিনে বাড়ি ফিরতে।

মাগুরা হাসপাতাল পাড়া এলাকার আকিদুল ইসলাম জানান, তিনি আলোকদিয়ার হাট থেকে ৭০ হাজার টাকায় বাড়িতে পালা একটি টাইট গরু কিনেছেন। দাম একটু বেশি মনে হলেও কেমিক্যাল মুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত গরু কিনতে পেরে তিনি খুশি। জগদল এলাকা সাইফুল ইসলাম জানান, তার পালা মাঝারি সাইজের দুইটি টাইট গরু কাটাখালী হাটে এনে প্রথম দিনেই বিক্রি করতে পেরেছেন। তবে গুরুর খাবারের দাম বেশি হওয়ায় তিনি বেশি লাভ করতে পারেনি বলে জানান।

সাইদুর রহমান নামে এক ব্যাপারী বলেন, বাইরের জেলাগুলোতে মাগুরার কেমিকেল মুক্ত মাঝারি সাইজের গরু ব্যাপক চাহিদা। তিনি কাটাখালী রামনগর হাট থেকে এ ধরনের ২০ টি গুরু কিনেছেন। যা সিলেট নিয়ে বিক্রি করে লাভবান হবেন বলে জানান।

তবে হাটগুলোতে বড় সাইজের গরু নিয়ে আসা খামারিরা পড়েছেন বিপাকে। বেশি দামের অজুহাতে ক্রেতারা এ ধরনের বড় গরুর কাছে ভিড়ছেন না। খামারিরা বলছেন, ভারত থেকে গরু আসায় তারা বিপাকে পড়েছেন। কারণ খাবারের উচ্চ মূল্যর কারণে গরু প্রস্তুত করতে তাদের যে খরচ হয়েছে সে দামে গরু বিক্রি হচ্ছে না।

শৈলকুপা থেকে আসা খামারি আবুল হোসেন জানান: তিনি হাটে বড় সাইজের চারটি গরু এনেছেন। প্রতিটি গরু দুই লাক্ষের উপরে দাম চেয়েছেন। ক্রেতারা একটির দাম ৯৬ হাজার ও অপরটির দাম দিয়েছে এক লাখ ১০ হাজার টাকা। খাবারসহ উপকরণের উচচ মূল্যর কারণে দেড় লাখের নিচে বেচলে তার খরচের টাকা উঠবে না।

আবুল কালাম নামে অপর খামারি জানান, কোরবানি সামনে রেখে বড় সাইজের ২০ টি গরু প্রস্তুত করেছেন। ছোট গরুর চাহিদা থাকলেও কোনো হাটেই ক্রেতারা তার বড় গরুর উপর্যুক্ত দাম বলছে না। সব ক্রেতা-বিক্রেতায় মাঝারি সাইজের টাইট গরুর দিকে ছুটছেন। যে কারণে তাকে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে।

সদরের রামনগর, কাটাখালী হাট ইজারাদার নূরে আলম সিদ্দিকী দিপু জানান, বর্তমানে হাটে ভালো উন্নত জাতের স্বাস্থ্যসম্মত গরু ৬০-৭০ হাজার টাকা দামে দেশি গরু বেশি বিক্রি হচ্ছে। বড় সাইজের গরুর চাহিদা কম। তবে ঈদের আগে দিন শেষ হাটে সব ধরনের গরু কেনার চাহিদা বাড়বে। বিক্রিও আরো জমজমাট হবে বলে তিনি আশা করছেন। প্রশাসন ও পুলিশের তৎপরতায় মাগুরা বিভিন্ন হাটে দালাল, পকেটমারদের আনাগোনা কম রয়েছে । পাশাপাশি জেলা প্রাণিসম্পদের কর্মকর্তারা বিভিন্ন হাটে স্বাস্থ্যসম্মত পশু রয়েছে কিনা তা তদারক করছেন ।

তিনি আরো জানান, হাটে জাল টাকা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে । প্রতিটি হাটে টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে মাইকিং করা । শেষ মুহূর্তে শ্রাবণের বৃষ্টির কারণে অনেক হাটে পশু কেনাবেচা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে । বৃষ্টি না হলে শেষ মুহূর্তে অনেক ক্রেতা বাড়বে ও বেচাকেনা ভালো হবে ।

বাগেরহাট থেকে নকিব সিরাজুল হক জানান: বাগেরহাটের চিতলমরীতে জমে উঠছে কোরবানি পশুর হাট। স্থানীয় ক্রেতাদের পাশাপাশি হাটগুলোতে ভিড় করছে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা গরু ব্যবসায়ীরা। এ বছর বড় বড় গরু আসলেও ক্রেতারা ঝুকেছে ছোট ও মাঝারি আকারের গরু। এ উপজেলার হাটগুলোতে ভারতীয় গরু না আসায় ভালদাম পেয়ে খুশি স্থানীয় বিক্রেতা ও খামারিরা। দাম বেশি হলেও পছন্দ মতো গরু কিনতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ক্রেতারা।

বুধবার বিকেলে চিতলমারী গরুর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, ছোট বড় মাঝারিসহ বিভিন্ন আকারের অসংখ্য গরু উঠেছে। হাটে কথা হয় কলিগাতি গ্রামের সাইফুল ইসলামের সাথে। তিনি জানান, এ বছর হাটে পছন্দ মতো গরুর অভাব নেই। তার সাধ্যের মধ্যে ৭৫ হাজার টাকায় মাঝারি আকারের একটি গরু কিনতে হাটে এসেছেন। গত বছরও এ ধরনের গরু ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

তিনি আরো জানান, এবার ভারতীয় গরুর চাপ কম থাকায় স্থানীয় বাজারে দেশি গরুর দাম একটু বেশি। হাটে কচুয়া উপজেলার দেপাড়া থেকে আসা এক গরু ব্যাবসায়ী জানান, এ উপজেলার বিভিন্ন হাট থেকে তিনি ছোট ও মাঝারি আকারের গরু কিনে ইন্দিরহাট ও ঢাকা নিয়ে বিক্রি করেন। এবার ভারতীয় গরুর চাপ কম থাকায় স্থানীয় বাজার থেকে চড়া দামে গরু কিনতে হচ্ছে। তারপরও তার লাভ হচ্ছে। তবে শেষ সময়ে দেশে ভারতীয় গরুর চাপ বাড়লে দেশীয় গরুর খামারি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

চিতলমারী উপজেলা উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা পরমেশ গোলদার বলেন, হাটে আনা গরু অসুস্থ হলে তা চিকিৎসার জন্য ৩ সদস্যর মেডিকেল টিম রয়েছে।

ডুমুরিয়া থেকে সুব্রত কুমার ফৌজদার জানান: লাগাতার বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে গবাদিপশুতে হাট কানায় কানায় পরিপূর্ণ হলেও কাক্সিক্ষত ক্রেতার দেখা মিলছে না। হাট বাজারে ক্রেতার চেয়ে কোরবানি পশুর আমদানি বেশি লক্ষ্য করা গেছে। শেষ মুহূর্তে হাটে ক্রেতার ভিড় না হওয়ায় গরুর খামারি ও ব্যাপারীরা ভীষণভাবে হতাশ হয়ে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শেষ বিকাল পর্যন্ত উপজেলার খর্ণিয়া ও শাহপুর পশুহাট ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

শাহপুর, আঠারোমাইল, চুকনগর, খর্ণিয়া ও বানিয়াখালী পশুহাটে গরু-ছাগল-মহিষসহ কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু বিক্রি হয়। কোথাও অস্থায়ী হাট না থাকায় নিদিষ্ট হাটগুলোতে অনেক পশু ওঠে। গতকাল খর্ণিয়া ও শাহপুর হাটে গরু-ছাগলের আমদানি যথেষ্ট ছিল। বেশকিছু মহিষও উঠেছিলো। তবে দেশি জাতের গরুর সংখ্যা ছিলো অনেক কম। সয়লাব ছিলো দেশে পালিত বিদেশি জাতের গরুতে। কিন্তু দিনভর বিরামহীন বৃষ্টির কারণে ক্রেতার উপস্থিতি ছিলো অনেক কম। ঈদের আর মাত্র তিনদিন বাকি। তাই শেষ বাজারে ক্রেতার দেখা না মেলায় চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন গরুর খামারিসহ ব্যাপারীরা।

গরুর ব্যাপারী কেশবপুর উপজেলার ভান্ডারখোলা গ্রামের মোতলেব মোড়ল জানান, খর্ণিয়া বাজারে ৮টি গরু এনেছি। গরুর বাজার অনেক কম। ৬০-৬৫ হাজার টাকা দিয়ে এক একটি গরু কিনে যেখানে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা করে লাভ হয়ে থাকে, সেখানে কেনাদামে বা মাত্র ১ হাজার টাকা লাভেও গরু ছাড়তে হচ্ছে। তালা উপজেলার কাশিমনগর গ্রামের ব্যাপারী আবু সাঈদ জানান, এবছর যে পরিমাণে গরু উঠেছে সেভাবে ক্রেতা নেই। যে কারণে আমাদের বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে।

ক্রেতা তোফায়েল আহমেদ বলেন, একদিকে বৈরি আবহাওয়া অন্যদিকে বাজার ব্যবস্থাপনা ভালো না থাকায় অধিকাংশ সাধারণ ক্রেতারা এবার গ্রামাঞ্চলে গিয়ে গরু কিনছে।

গরুর খামারি শোভনা গ্রামের করিম শেখ, খর্ণিয়ার রবিউল ইসলামসহ অনেকেই জানান, বাজারে গরুর যে দাম উঠেছে তাতে খরচের টাকা উঠবে না।

খর্ণিয়া পশুর হাট কমিটির সভাপতি শেখ হেফজুর রহমান বলেন, ৭২ লাখ টাকা দিয়ে এবছর হাট কিনেছি। গত বছর ঈদের হাটে ২৫ লাখ টাকা খাজনা পেয়েছিলাম। এবার যেভাবে দিনভর বিরামহীন বৃষ্টি হচ্ছে তাতে অর্ধেক টাকাও উঠবে না।