পীর জাফর আউলিয়ার মাজার রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়ন দাবি

::পলাশ কর্মকার, কপিলমুনি::

উত্তরে হাসপাতাল, পশ্চিমে কপিলমুনি বাজার, পূর্বে জাফর আউলিয়া মাদ্রাসা, দক্ষিণ-উত্তর কোণে কপিলেশ্বরী কালী বাড়ি। এরই মধ্যে পীর জাফর আউলিয়া (রহঃ) এর মাজার। অবহেলিত মাজারটি রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের দাবি এলাকাবাসীর।

খুলনা জেলা সদর থেকে ৫০ কিঃ মিঃ দূরে কপিলমুনিতে জাফর আউলিয়া মাজার । অনেকটা অবহেলার শিকার দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম এ পীরের মাজারটি। তাঁকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য কীর্তিগাঁথা। আর মাজার ও পীরকে ঘিরে রয়েছে লোকমুখে রয়েছে অনেক ঘটনা। স্থানীয় একাধিক প্রবীণ ব্যক্তির তথ্য মতে, কয়েকশ বছর আগে সাধক পীর জাফর আউলিয়া (রহঃ) কপিলমুনিতে ধর্ম প্রচারের জন্য আসেন।

তখন এ অঞ্চল ছিল বনজঙ্গলে ভরা, সুন্দরবনের একটি অংশ বলাচলে। এই নির্জন স্থানেই সাধনা আশ্রম গড়ে তোলেন তিনি।

তিনি হজরত খাজা খানজাহান আলী (রহঃ)-এর শিষ্য ছিলেন, তবে কোন সময় তিনি কপিলমুনিতে আসেন এর সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। সে সময় বেতবনে ঘেরা কপিলমুনিতে যে সাধনা আশ্রম গড়ে তোলেন তার স্মৃতিচিহ্ন এখনো রয়েছে। তার অসংখ্য শিষ্য ও ভক্ত ছিল। আর সাধনা আশ্রমেই তার মৃত্যু হয় বলে জানা যায়। সেখানে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

স্থানীয়রা জানান, ১৯৬৯ সালে জাতীয় সংসদের সাবেক স্পীকার প্রয়াত শেখ রাজ্জাক আলী ৮ শ টাকা খরচ করে শেখ নেছার আলীর তত্বাবধানে মাজারটি ১ম সংস্কার করান। তারপর ৩ দফায় সরকারি ও ব্যক্তিগত অর্থায়নে তিনি দর্শনীয় একটি মাজারে রূপ দেন। ১৯৫৮ সালে তাঁর নামানুসারে এলাকার কিছু প্রগতিশীল মানুষের প্রচেষ্টায় জাফর আউলিয়া ডিগ্রি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়। পরে জাফর আউলিয়া জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।

পীর জাফর আউলিয়ার মাজারে প্রতিদিন আসে অসংখ্য ভক্ত। সাম্প্রদায়িক বিভেদ ভুলে হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্মের মানুষ মানত ও শিরনি নিয়ে আসেন করুণা প্রত্যাশার আশায়। তাছাড়া চৈত্র মাসে কপিলমুনি কপোতাক্ষ নদে বারুনি স্নান উপলক্ষে মাসব্যাপী মাজারের চার পাশে বসতো মেলা। কপিলমুনি-কাঠামারী সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামানুসারে ‘জাফর আউলিয়া সড়ক’। পীরজাফর আউলিয়াকে (রহঃ) ঘিরে রয়েছে অনেক অলৌকিক কাহিনী।

জানা যায়, একদিন তিনি তাঁর অন্যতম শিষ্য ছালাওয়ালা ফকিরসহ দুর্গম এলাকায় যান। সেখানে কিছুদিন অবস্থানকালে এক বৃদ্ধা তাকে পানের জন্য দুধ দিতেন। হঠাৎ বৃদ্ধার গাভীটি মারা যায়। এদিকে প্রতিদিনের মতো পীর সাহেবের শিষ্য ছালাওয়ালা বৃদ্ধার বাড়ি যান দুধ আনতে। তিনি বৃদ্ধার গরুর মৃত্যু খবর শুনে হতবাক হয়ে পড়েন। দুধ না হলে হুজুর কি খাবেন? তিনি বৃদ্ধার কাছ থেকে জেনে নেন মরা গাভীটির কোথায় ফেলা হয়েছে।

এরপর ছালাওয়ালা ফকির মরা গাভীটি লেজ ধরে টেনে বলেন, এই গাভী ওঠ। অমনি জীবিত হয়ে ওঠে গাভীটি। আর ওই গাভীর দুধ এনে পান করান পীরকে। বিষয়টি আধ্যাত্বিক দৃষ্টিতে পীর কেবলা বিষয়টি অবগত হন।

তিনি ছালাওয়ালাকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘তুই আমাকে মরা গরুর দুধ খাওয়াবি’। সঙ্গে সঙ্গে এহেন অপরাধে অন্য শিষ্যরা ছালাওয়ালাকে বস্তাবন্দী করে নদীতে ফেলে দেয়। পুরো এলাকায় কানাঘুষা শুরু হয়, পীর কেবলা তার এক শিষ্যকে বস্তাবন্দী করে নদীতে ডুবিয়ে মেরেছে’। হুজুরে অলৌকিক শক্তি বলে সম্ভবত তিনি চমক দেয়ার জন্যই ওই এলাকা ত্যাগ করে কপিলমুনি ফিরে আসেন এবং শিষ্যদের নিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করে তিনি স্থায়ী স্থান তৈরি করেন।

তিনি ইসলাম প্রচার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে আধ্যাত্মিক বলে মানুষের খেদমত শুরু করেন। নদীভাঙন, খালের বাঁধ, বনে বাঘের হাত থেকে রক্ষা পেতে তদবির দিতেন। এ ধরনের অসংখ্য অলৌকিক শক্তির কথা শোনা যায় পীর জাফর আউলিয়া সম্পর্কে।

মাজারে আসা ভক্ত নরিম শেখ বলেন, ‘আমি অনেক দিন ধরে এই পীরের মাজারে আসি। এখান থেকে ধুলিমাটি নিয়ে যাই, প্রার্থনা করি, মনোবাসনা পুরণ হয়’।

মাজারটির খাদেম ইউনুস আলী ফকির বলেন, ‘আমরা বংশ পরমপরায় মাজারের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

কপিলমুনি ইউপি চেয়ারম্যান মো. কওছার আলী জোয়ার্দার বলেন, ‘দেশে এখন উন্নয়নের জোয়ার বইছে। মন্দির, মসজিদ, মাজারসহ সকল প্রতিষ্ঠানে সরকার অনুদান দিচ্ছে। আশাকরি তার ধারাবাহিকতায় জাফর আউলিয়া মাজারে উন্নয়ন হবে। আমার ব্যক্তিগত সকল সহযোগিতা থাকবে।’