চৌগাছায় ভিজিএফের চাল নিয়ে চালবাজি

::নিজস্ব প্রতিবেদক::

যশোরের চৌগাছায় ভিজিএফের চাল বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি বস্তায় চাল কম থাকা থেকে শুরু করে তালিকা প্রণয়ন এমনকি বিতরণের সময় চাল কম দেয়া ছাড়াও রয়েছে অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগ।

জানা যায়, গরীব অসহায় জনগণের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঈদ উপহার ভিজিএফের চাল পৌরসভা থেকে শুরু করে সকল ইউনিয়নে বিতরণ করার কথা। কিন্তু এ চাল খাদ্যগুদাম থেকে সরবরাহ ও বিতরণের তালিকা প্রণয়নে যে অনিয়ম রয়েছে তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইউনিয়ন প্রতি সরকারের বরাদ্দকৃত চাল খাদ্যগুদাম থেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যখন বুঝে নেন সেখানেই থাকে প্রধান অসঙ্গতি। বরাদ্দকৃত চাল ৫০ কেজি ও ৩০ কেজির বস্তায় খাদ্যগুদাম থেকে সরবরাহ করা হয়। সেই চাল ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে ওজন দিলে দেখা যায় বস্তায় লিখিত ওজনের চেয়ে ৫০০ গ্রাম থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত কম আছে।

খাদ্যগুদামের হিসেব অনুযায়ী এবারের ঈদে চৌগাছা উপজেলায় ১১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ভিজিএফ ছিলো মোট ৭৪৭ মে. টন ২৩০ কেজি (৭৪৭.২৩০ মে.টন) চাল। সে হিসেবে ৫০ কেজি চালের বস্তা ছিলো ৪০৮৬টি এবং ৩০ কেজির বস্তা ছিলো ১১,১৮১টি।
ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের বক্তব্য অনুযায়ী তারা প্রতিটি বস্তায় ২০০ থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত চাল কম পেয়েছেন।

চাল কম থাকার কারণ হিসেবে উপজেলা খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কার্তিক বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তার প্রাপ্য চাল ঠিকমতো বুঝে নিয়ে যান।

যখন সরকারিভাবে চাল সংগ্রহ করেন তখন কী ওজনে কম থাকে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, না তেমন কোনো সুযোগ নেই। তবে দু’একশ গ্রাম চাল লোড আনলোডের সময় কম হতে পারে। কিন্তু এর বেশি কম হয় না।

ঈদের আগে চৌগাছার ১নম্বর ফুলসারা ইউনিয়নে চাল বিতরণের সময় দেখা যায়, প্রতি ৩০ কেজির বস্তায় চাল আছে ২৮ থেকে সাড়ে আঠাশ কেজি।

এর কারণ জানতে চাইলে খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা বলেন, এমন অভিযোগ পেয়ে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। আমার উপস্থিতিতে তারা আবার চাল মেপেছে। দুশ থেকে পাঁচশ গ্রাম বস্তায় কম আছে।

জানতে চাইলে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী মাসুদ চৌধুরী বলেন, চাল মেপে কম পাওয়ার পরে আমি খাদ্যগুদামের কর্মকর্তাকে ফোন করি। তখন তিনি আমাকে পুনরায় সমপরিমাণ চাল পৌঁছে দেন।

স্বরুপদাহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ার শেখ, নারায়ণপুর ইউপি চেয়াম্যান জয়নাল আবেদীন মুকুলেরও একই অভিযোগ। তারা বরাদ্দের চাল পেয়েছেন ৩০ কেজির বস্তায়।
তারা জানান, ওই ৩০ কেজির বস্তায় ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম চাল কম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি যে চাল পেয়েছেন তার ৫০ কেজির বস্তায় ১ কেজি এবং ৩০ কেজির বস্তায় ২০০ থেকে ৮০০ গ্রাম চাল কম ছিলো।
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের নামের তালিকাতেও রয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয় ইউপি জনপ্রতিধিরা তাদের কাছের লোকজন এবং আত্মীয় স্বজনদের নাম প্রথমেই তালিকাভুক্ত করেন। এরপরে তারা এমন মানুষের নাম তালিকায় উঠান যারা সেই চাল নিতে আসে না। সেই নামের মধ্যে প্রবাসী, স্থানীয় ধণাঢ্য ব্যক্তি এমনকি মৃত মানুষের নামও থাকে। তাদের নামের সেই চাল উত্তোলন করে তারাই আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ জনগণ। পরে স্থানীয় এক শ্রেণির ব্যবসায়ীদের কাছে অবৈধভাবে বিক্রি করে দেন। গরীব অসহায়দের বাইরে তাদের পছন্দের বিভিন্ন মানুষকে সেই চাল উত্তোলন করে বস্তায় ভরে বিক্রি করতে দেখা যায়।

আবার অনেক ক্রেতাকে ইউনিয়ন পরিষদের কাছেই ডিজিটাল মেশিনে মেপে কেজি প্রতি ১৬ থেকে ১৮ টাকা দরে কিনতে দেখা যায়।

ইউনিয়নের এ ভিজিএফের নামের তালিকা যাচাই বাছাই করেন উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চৌগাছা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইশতিয়াক বলেন, ভিজিএফের তালিকা চেয়ারম্যানরা দিলে সেটি মোটামুটি যাচাই বাছাই করা হয়। সেখানে ধণাঢ্য আর মৃত ব্যক্তিদের নামের বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

নরায়নণপুর ইউনিয়নে ভিজিএফের চাল বিতরণের অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, এবারে ভিজিএফের চালের তালিকায় নাম রয়েছে অস্ট্রেলিয়া ও জাপান প্রবাসীদের। এছাড়াও মৃত ব্যক্তিদের নামেও কার্ড থাকায় তাদের পরিবারও চাল নিয়েছেন। রোববার এসব ধনী ব্যক্তিদের মাঝে চাল বিতরণ করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ওই ইউনিয়নের ৭নম্বর ওয়ার্ডের তিন গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার ভিজিএফ এর চাল ঈদ উল আযহার আগে বিতরণ হয়নি। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর গত রোববার ওই ওয়ার্ডের ৮৩০ পরিবারের মধ্যে ভিজিএফের চাল বিতরণ করা হয়।
বিতরণকৃতদের সেই তালিকায় নাম রয়েছে নারায়ণপুর গ্রামের তিনতলা একটি ভবনের মালিক মৃত জালাল মিয়ার ছেলে রফিকুল ইসলামের। নাম আছে নারায়ণপুর গ্রামের অন্যতম ধনী ব্যক্তি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী রুবেল হোসেন এবং জাপান প্রবাসী আছির উদ্দীন মৃধাসহ মৃত নুর আলী মুন্সির ছেলে সামসুল মুন্সি, মোবারক সর্দারের ছেলে মনিরুল ইসলামের। গ্রামে তাদের সকলেরই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বহুতল বাড়ি। সকলেই তারা রোববার ভিজিএফ এর চাল নেয়ার তালিকায় ছিলেন। তাদের সকলের বাড়িতে ভিজিএফের চাল উত্তোলনের টোকেনও পৌঁছে দিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য।

কার্ডধারী এ সকল পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা নিজেরাই জানেন না তারা ভিজিএফের চালের কার্ডধারী। তালিকায় থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তিসহ সকলেই জানিয়েছেন, আমরা এর আগে কখনো চাল গ্রহণ করিনি। অথচ পূর্বের তালিকায়ও আমাদের নাম রয়েছে।

তাদের অভিযোগ, পূর্বের ওই তালিকার অন্তত ষাটভাগ সদস্য ধনী পরিবারের। তাদের বেশিরভাগই জানেন না তাদের নামে ভিজিএফ কার্ড রয়েছে। তালিকায় থাকা নারায়ণপুর গ্রামের মৃত বায়োজিদ সর্দারের ছেলে মোমিনুর রহমান ছয় বছর আগে মারা গেছেন, মৃত ওহেদ আলীর ছেলে আব্দুল হালিম দুই বছর আগে মারা গেছেন। তুহিনুর রহমান তুহিন ওই ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি। তিনি বিগত ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। চৌগাছা বাজারে ব্যবসা করেন তিনি। তার নামেও রয়েছে ভিজিএফএর চালের কার্ড।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার নাম যে তালিকায় রয়েছে এবারই প্রথম জানলাম। অথচ এতদিন আমার নামে চাল উঠে যাচ্ছে। তিনি এসব অনিয়মের সাথে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন।

একই গ্রামের মিজানুর রহমান, বাবর আলী, আমিনুর রহমান, শাহিনুর রহমান সকলেই এলাকায় অবস্থাশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তাদের সকলের দাবি তারা নিজেরাও জানেন না তাদের নামে ভিজিএফের এসব চাল উঠিয়ে নেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন, মৃত সাবেক ইউপি সদস্যের তালিকা অনুসরণ করে চালের স্লিপ করা হয়েছিল। তবে বিষয়টি প্রকাশ পেলে অনেক ধনী ব্যক্তি চাল নিতে আসেনি। সেই চাল আমরা দুস্থদের মধ্যে বিতরণ করেছি।