নারী শিক্ষার আলোকবর্তিকা বামুনিয়া সোনাতনকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়

::আসাদুজ্জামান নয়ন::

ছায়া ঢাকা পাখি ডাকা অজপাড়াগাঁয়ের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বামুনিয়া সোনাতনকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় নারী শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। এক সময় শিক্ষা থেকে দূরে থাকলেও এ গ্রামের মানুষ এখন শিক্ষার দিকে ঝুঁকেছে। নারীরাও পিছিয়ে নেই এক্ষেত্রে। এ গ্রামে শিক্ষার আলোক বর্তিকা হিসেবে যার নাম সবার মুখে মুখে তিনি হচ্ছেন তৎকালীন ডেপুটি কালেক্টর শহীদ রহমতুল্লাহ।

মূলত তার হাত ধরেই এ অঞ্চলের মানুষ শিক্ষার আলো খুঁজে পায়। তার ছেলে সাংবাদিক কেবিএম মাহমুদ শিক্ষার গতি সঞ্চার করছেন। এজন্য তিনি এলাকার শিক্ষানুরাগী মানুষকে নিয়ে শিক্ষার আলো জ্বালাতে বালিকা বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন । বিদ্যালয়টি বর্তমানে এ অঞ্চলে নারী শিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে।

যশোর সাতক্ষীরা মহাসড়কের বাগআঁচড়া সাতমাইল গরুহাটের পাশ দিয়ে ৪কিলোমিটার পূর্বদিকে শার্শা উপজেলার অজপাড়াগাঁ বামুনিয়া সোনাতনকাটি গ্রামের বুক চিরে চলে যাওয়া সড়কের পাশে বিদ্যালয়টি অবস্থিত। মূল সড়ক থেকে নেমে ইট বিছানো রাস্তা বেয়ে ১০/১২ হাত দূরেই স্কুলের প্রধান ভবন। চার পাশে গাছগাছালি আর হরেক ফুল গাছ দিয়ে সাজানো গোছানো পরিপাটি স্কুল চত্বর। সৃজনশীল মানুষের হাতের ছোঁয়ায় স্কুলটি দেখতে যেমন সাজানো গোছানো তেমনি লেখাপড়ার পরিবেশও সুন্দর।

বর্তমানে বিদ্যালয়টি এগিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় সবার সহযোগিতায়। এক সময় নারী শিক্ষা যেখানে দূরহ ছিল সেখানে অনায়াশেই নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে আপন গতিতে। একজনের দেখাদেখি আরেকজন উদ্বুদ্ধ হচ্ছে শিক্ষায়। এ স্কুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেকে চাকরি করছেন আবার অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করছেন। উচ্চ শিক্ষার সিঁড়ি বেয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন।

স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের ১৪ বছরের সভাপতি আব্দুল খালেক জানালেন, এলাকার সবার সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৩ সালে ৪৬ শতক জমির উপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টির বর্তমানে শিক্ষক ১৪ জন ও কর্মচারী ৪জন। ছাত্রী সংখ্যা ৩শ’। ১৯৯৭ সালে এমপিওভুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নসহ নানাকাজে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ শেখ আফিল উদ্দিনের ছোঁয়া রয়েছে। ২০১০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি স্কুলের বিজ্ঞান ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

তিনি জানান, স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের কোনো বৃত্তির ব্যবস্থা নেই। তবে সরকারিভাবে মেধাবৃত্তি পেয়ে থাকে অনেক শিক্ষার্থী।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম বলেন, স্কুলে প্রতি বছর এসএসসি ও জেএসসিতে পাসের হার অনেক ভাল। হিসেবে দেখা যায় ২০১৫ সালের এসএসসিতে ২১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করে ১৭ জন, জেএসসিতে ৪২জনের সবাই পাস করে। জিপিএ-৫ পায় ৩ শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালে এসএসসিতে ৩৩জনের মধ্যে পাস করে ২৯জন, জেএসসিতে ৪২ জনের মধ্যে শতভাগ পাস করে। ২০১৭ সালে এসএসসিতে ৩০জনের মধ্যে ২৫জন পাস করে, জেএসসিতে ৪৬জনের সবাই পাস করে। জিপিএ-৫ পায় একজন। ২০১৮ সালে এসএসসিতে ৩৬জনের মধ্যে ২৯ জন পাশ করে, জেএসসিতে ৪৭জনের মধ্যে ৩২জন পাস করে। জিপিএ-৫ পায় একজন। ২০১৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৮, পাস করে ৩৬ শিক্ষার্থী।

তিনি জানান, ২০১৮ সালে জেএসসিতে ফারহানা ইয়াসমিন নামে এক শিক্ষার্থী বৃত্তি পায়।
পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কাজে ও খেলাধুলায় দক্ষ করানো হয়। এজন্য প্রতি বৃহস্পতিবার ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।

স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য প্রবীণ সাংবাদিক কেবিএম মাহমুদ বলেন, স্কুলটি সুচারুভাবে পরিচালনা ও মনোরম পরিবেশে এগিয়ে যাচ্ছে। সামনে আরো উন্নতির জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ছাত্রীরা যাতে লেখাপড়ার পাশাপাশি আয়বর্ধক কিছু করতে পারে এজন্য তাদের হাতেকলমে শিক্ষা দিতে কারিগরি কোর্স চালু করা হবে। লেখাপড়ায় উদ্বুদ্ধ করতে অভ্যন্তরীণ বৃত্তির ব্যবস্থা করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এই গ্রামে শিক্ষার পিছনে তার বাবা সাবেক ডেপুটি কালেক্টর শহীদ রহমতুল্লাহর অবদান রয়েছে। এক সময় গ্রামটি কুসংস্কারচ্ছন্ন ও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। ওই সময় গ্রামের মানুষ লেখাপড়া করা ভালো চোখে দেখত না। এ কারণে রহমতুল্লাহর দাদির কথামতো শিক্ষার জন্য তিনি গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে কলকাতায় পর্যন্ত গিয়েছেন। সেখানে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চাকরি করেছেন। তাই পশ্চাৎমুখী অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রামকে আলোকিত করতে শিক্ষার আলো জ্বালাতে তিনি নানামুখি পদক্ষেপ নেন।
এ পদক্ষেপকে এগিয়ে নিচ্ছেন কেবিএম মাহমুদ। এরই অংশ এই বালিকা বিদ্যালয়টি।

শিক্ষাবিদ রহমতুল্লাহর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিদ্যালয়ের নাম শহীদ রহমতুল্লাহ মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় করার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানালেন এই সাংবাদিক।