অভয়নগরে আশ্রয়ন প্রকল্পের পদে পদে অনিয়ম

::নিজস্ব প্রতিবেদক::

যশোরের অভয়নগর উপজেলার চলিশিয়া ইউনিয়নের গ্রামের বিধবা রিজিয়া বেগম। সরকারের আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের আওতায় তিনি একটি ঘর পেয়েছেন। ঘরটি নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল এক লাখ টাকা। সম্প্রতি তার ঘরটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু ঘরটি নির্মাণের জন্য তার নিজের ব্যয় হয়েছে তিন হাজার টাকা।

রিজিয়া বেগম বলেন, ‘শেখ হাসিনা আমারে ঘর দিয়েছেন। সব খরচ তার। তারপরও ঘরে বালু ও মাটি ভরাট, মিস্ত্রীদের খাওয়ার খরচ এবং বকশিস বাবদ আমার মোট তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ঘরে দেয়া কাঠ ভালো না। মেঝেতে ইট বসিয়ে সিমেন্ট বালু দিয়ে ডলে দিয়েছে। ঘরে দুটি জানালা দিয়েছে। জানালায় কোনো রড নেই।’

রিজিয়া বেগমের মতো উপজেলার অন্য উপকারভোগীরা অভিযোগ করেছেন, ঘর নির্মাণে তাদের বিভিন্ন উপকরণ দিতে হচ্ছে। বালু ও মাটি দিয়ে ঘরের মেঝে ভরাট করে দিতে হচ্ছে। খেতে দিতে হচ্ছে নির্মাণ শ্রমিকদের। আর নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের সামগ্রী।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প সূত্র জানায়, অভয়নগর উপজেলায় আটটি ইউনিয়নে ও একটি পৌরসভা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পরিচালিত আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ‘যার জমি আছে ঘর নেই তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ উপ-খাতের আওতায় উপকারভোগীদের ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। উপজেলায় মোট ১৮৬ জন উপকারভোগীকে এ ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়।

এরমধ্যে নওয়াপাড়া পৌরসভায় ২৩ জন, প্রেমবাগ ইউনিয়নে ২১ জন, সুন্দলী ইউনিয়নে ১৮ জন, চলিশিয়া ইউনিয়নে ৮ জন, পায়রা ইউনিয়নে ২১ জন, শ্রীধরপুর ইউনিয়নে ১৭ জন, বাঘুটিয়া ইউনিয়নে ১৩ জন, শুভরাড়া ইউনিয়নে ২০ জন এবং সিদ্দিপাশা ইউনিয়নে ৪৫ ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন। ইতিমধ্যে ঘরের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি ঘরের নির্মাণ ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক লাখ টাকা। উপজেলায় মোট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

প্রকল্প সূত্র জানায়, কাজটি বাস্তবায়নের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কমিটির আহ্বায়ক, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সদস্য সচিব এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কমিটির সদস্য। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পিআইসি দ্বারা উপজেলা প্রশাসন সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ঘর নির্মাণ কাজ সম্পাদন করবে। নির্মাণ কাজের সাথে অবশ্যই শ্রমিক হিসেবে উপকারভোগী পরিবারকে সম্পৃক্ত রাখতে হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির কয়েকজন সদস্য অভিযোগ করেছেন, কোনো সভা বা আলোচনা ছাড়াই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহীনুজ্জামান নিজেই নির্মাণ শ্রমিকদের দিয়ে ঘর নির্মাণের সব কাজ করাচ্ছেন। এ কাজে তিনি সহযোগিতা নিচ্ছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রিজিবুল ইসলামের।

সরেজমিনে গেলে কয়েকজন উপকারভোগী অভিযোগ করেন, ঘর নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। ঘরের মেঝে এবং বারান্দা মাটি ও বালু দিয়ে ভরাট করার কথা। কিন্তু উপকারভোগীদের দিয়ে মাটি ও বালু ভরাট করা হচ্ছে। কোনো কোনো ঘরে খোয়া ছাড়াই মেঝে করা হয়েছে। মেঝেতে ৩ ইঞ্চি ঢালাই দেয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হচ্ছে ১ ইঞ্চি বা তার চেয়েও কম। মেঝেতে ঢালাইয়ের নিচে পলিথিন এবং খোয়া দেয়া হচ্ছে উপকারভোগীর কাছ থেকে নিয়ে। চারটি জানালার বদলে দেয়া হচ্ছে দুটি-তিনটি করে জানালা।

দরজায় রঙ করার নিয়ম থাকলেও তা করা হচ্ছে না। ঘরের বেড়া, ঘর ও চালে কাঠ ব্যবহারের তালিকায় রয়েছে শাল, গর্জন, জামরুল, কড়াই, মিল কড়াই, শিশু, তাল, পিতরাজ, দেবদারু ও আকাশমনি। কিন্তু দেয়া হচ্ছে সারি-অসারি মেহগনি কাঠ। ল্যাট্রিনে আটটি রিংস্লাব দেয়ার কথা থাকলেও দেয়া হয়েছে ছয়-সাতটি করে। ঘর নির্মাণ শ্রমিকদের চার-পাঁচ দিন দুই বেলা করে খেতে দিতে হচ্ছে। নির্মাণকাজের শ্রমিক হিসেবে উপকারভোগী পরিবারকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না।

পায়রা ইউনিয়নের কাদিরপাড়া গ্রামের হতদরিদ্র মোমেনা বেগম একটি ঘর পেয়েছেন। মেঝে ছাড়া তার ঘরের নির্মাণকাজ শেষও হয়েছে। মোমেনা বেগম বলেন,‘ঘর করতে আমি ১০০ ইট দিয়েছি। এ ছাড়া, ইট ভেঙ্গে খোয়া বানাতে এবং ঘরে ও বারান্দায় বালু ভরাট করতে আমার সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কর্জ করে টাকা দিয়েছি। এখন দেনাদাররা টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। এরপরও ঘরের কাজ ভালো হয়নি। দুটি জানালা দিয়েছে তাতে রড দেয়া হয়নি। কাঠ এবড়োথেবড়ো। ল্যাট্রিনে রিংস্লাব বসানো হয়নি।’

একই গ্রামের অস্থায়ী পাটকল শ্রমিক আমিন উদ্দিন শেখ দৈনিক স্পন্দনকে বলেন, ‘ঘরের মেঝে ও বারান্দা মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে বলেছে। আমি লোকজন নিয়ে তা দিয়েছি। এখন বলছে বালু দিয়ে ভরাট করে দিতে। বালু ভরাট না করলে রাজমিস্ত্রী কাজ করবে না। বালু ভরাট করতে দুই-তিন হাজার টাকা লাগবে। টাকার অভাবে বালু ভরাট করতে পারছি না। প্রায় এক মাস ধরে ঘর সেইভাবে পড়ে আছে।’

অভয়নগর গ্রামের বিধবা ফজিলাতুন্নেছা বেগম দৈনিক স্পন্দনকে বলেন, ‘আমাকে ১০০ ইট দিতে হয়েছে। ঘরের মেঝে ও বারান্দা বালু দিয়ে ভরাট এবং মিস্ত্রীদের খাওয়া বাবদ আমার অন্তত আট হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। তারপরও ঘরের মেঝে মাত্র ১ ইঞ্চির মতো ঢালাই দিয়েছে। ঘরে তিনটি জানালা দিয়েছে।’

পাইকপাড়া গ্রামের দিনমজুর জামাল শেখ দৈনিক স্পন্দনকে বলেন,‘আমার ৭০০ টাকার পলিথিন কিনে দিতে হয়েছে। এ ছাড়া, ঘরের মেঝে এবং বারান্দায় মাটি ও বালু ভরাট এবং মিস্ত্রীদের খাওয়া দিয়ে আমার দুই হাজার টাকা খরচ হয়েছে।’

বাঘুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদেও (ইউপি) চেয়ারম্যান শেখ গোলাম হোসেন দৈনিক স্পন্দনকে বলেন,‘ঘর নির্মাণের বিষয়ে ইউএনও আমাকে কিছুই জানাননি। সকল কাজ উনি করছেন। মাঝে একদিন উনি আমাকে ডেকে বললেন, ঘরের তালিকায় আপনার স্বাক্ষর লাগবে। সেইভাবে আমি স্বাক্ষর করেছি। এর চেয়ে বেশি আমি আর কিছুই জানি না।’

প্রেমবাগ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মফিজ উদ্দীন দৈনিক স্পন্দনকে বলেন, ‘আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর নির্মাণের ব্যাপারে ইউএনও সাহেব কোনোদিন কোনো সভা করেননি। কমিটিতে আছি সেটাই জানতাম না। পরে শুনেছি। কয়েকদিন আগে একটি কাজে ইউএনও অফিসে গিয়েছিলাম। ইউএনও সাহেব বললেন, প্রেমবাগ ইউনিয়নে ২১ জনের তালিকা হয়েছে। তালিকায় স্বাক্ষর করেন। তাই করেছি। কাজ উনি নিজেই করছেন।’

শ্রীধরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ আলী দৈনিক স্পন্দনকে বলেন,‘শুনেছি ঘর নির্মাণ কমিটির সদস্য আছি। তবে কী কাজ, কীসের কাজ কিছুই জানি না। ইউএনও সাহেব একাই সব করছেন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহীনুজ্জামান বলেন,‘আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর নির্মাণ যথাযথভাবে করা হচ্ছে। নির্মাণসামগ্রী মানও ভালো। কমিটির অন্যান্য সদস্যদেরও কাজ দেখাশোনার দায়িত্ব রয়েছেন। তারা যে অভিযোগ করছেন তা সঠিক নয়। তাঁরা কাগজপত্রে স্বাক্ষর করছেন।’ উপকারভোগীদের কাছ থেকে নির্মাণ সামগ্রী নেয়া এবং নির্মাণ শ্রমিকদের খেতে দেয়ার বিয়য়ে তিনি বলেন,‘এ ব্যাপারে আমাকে কেউ কিছু বলেননি। আপনারা উনাদেরকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেন। আমি বিষয়টা দেখবো।’

এ ব্যাপারে যশোরের জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ দৈনিক স্পন্দনকে জানান, অভয়নগর আশ্রয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শফিকুল ইসলামকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি তদন্ত করে দেখবেন। প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।