পুত্র সন্তানের মা হলো ১০ বছরের সেই শিশু

 

::বিল্লাল হোসেন:

শনিবার বেলা পৌনে ১টা। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডের গিয়ে দেখা যায় ৫ নম্বর বিছানায় নির্বাক হয়ে শুয়ে আছে ১০ বছরের সেই শিশু। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক যন্ত্রণায় মাঝে মাঝে ছটফট করছে। শিশুটির দুই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। অবুঝ এ শিশুর সন্তান জন্ম দেয়া সম্পর্কে ধারণা নেই। অথচ নিজেই হয়েছে পুত্র সন্তানের মা। কিন্তু কোনো আনন্দ নেই মনে। চোখে মুখে শুধুই আতঙ্কের ছাপ।

ওয়ার্ডের বাইরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন প্রসূতির পিতা-মাতা। তারা নানা নানী হওয়ার পরেও মুখে হাসি নেই। গভীর দুশ্চিন্তা ভর করেছে তাদের। কারণ এক লম্পটের লালসার শিকার হয়ে অপ্রাপ্ত বয়সে সন্তান জন্ম দেয়া মেয়েটি কখন না জানি কোনো শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম আজাদ লিটু জানান, বর্তমানে নবজাতক সুস্থ আছে। কিন্তু প্রসূতি শিশুর অবস্থা গুরুতর। তার উন্নত চিকিৎসাসেবা চলছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সোমেন দাস জানান, নবজাতকের পরিচয় শনাক্ত করার জন্য ডিএনএ টেস্ট করানো হবে।

হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা ওই শিশুকে ৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিন আল্ট্রাসনো রিপোর্টের মাধ্যমে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন তার গর্ভে ৩৩ সপ্তাহ ৬ দিনের সন্তান রয়েছে। শিশুর জীবন সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন চিকিৎসক।

কিন্তু পরিবারের লোকজন তাকে খুলনায় না নিয়ে বাড়ি চলে যায়। ফের শারীরিক সমস্যা গুরুতর হলে শুক্রবার রাত ১১টা ৫০ মিনিটে ওই শিশুকে ফের যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালের গাইনী বিভাগের আবাসিক সার্জন নিলুফার ইসলাম এমিলি জানান, বয়স কম হওয়ার কারণে অন্তঃসত্ত্বা শিশুটির অবস্থা বরাবরই গুরুতর ছিলো। আল্ট্রাসনো রিপোর্ট অনুযায়ী আগামী ১৭ অক্টোবর ডেলিভারির তারিখ ছিলো। কিন্তু শনিবার সকালে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর দেখা যায়, গর্ভের সন্তান লিভারে চলে গেছে। যেটি মা ও সন্তানের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় থাকলে যেকোনো সময় খারাপ কিছু হতে পারে। যে কারণে তাকে তড়িঘড়ি করে অস্ত্রোপচার কক্ষে নেয়া হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বের করা হয় ফুটফুটে পুত্র সন্তান। যার ওজন হয়েছে আড়াই কেজি। কিন্তু সেই তুলনায় বাচ্চা অপুষ্ট রয়েছে।

প্রসূতির বাবা জানান, কি দিয়ে কি হয়ে গেলো তারা কিছুই ভেবেই পাচ্ছেন না। তার অবুঝ মেয়ের জীবন এখন সংকটাপন্ন। চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তার নেই। এর আগে খুলনায় রেফার্ড করা হলেও অর্থের অভাবে মেয়েকে নিয়ে যেতে পারেননি।

তিনি আরো জানান, ঘটনার সাথে জড়িত ওই লম্পটের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হোক। যাতে করে আর কেউ অবুঝ এ রকম শিশুর জীবন নিয়ে খেলা করতে না পারে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সোমেন দাস জানান, প্রথম থেকেই ধর্ষণের ঘটনা ও সন্তানকে অস্বীকার করে আসছে আটককৃত গোলাম কিবরিয়া। তিনি পুলিশের কাছে দাবি করেছেন ওই সন্তান তার না। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। যে কারণে নবজাতকের ডিএনএ টেস্ট করানো হবে। তাহলে নিশ্চিত হওয়া যাবে সন্তানের পিতা কে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম আজাদ লিটু জানান, সিজারের জন্য ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই ওই শিশুর পরিবারের। তাই রোগী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে কিছু ওষুধ দেয়া হয়। আর বাকি ওষুধ সামগ্রী হাসপাতাল থেকে ম্যানেজ করে চিকিৎসক তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেছেন। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কারণ ইনফেকশনে আক্রান্ত হলে প্রসূতি শিশুর অবস্থা মারাত্মক আকার ধারণ করবে। উৎসুক মানুষ যাতে সেখানে ভিড় করতে না পারে সেই জন্য পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ জানান, ওই প্রসূতি ও শিশুর খোঁজ নিতে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি গিয়ে তার পরিবারের সাথে কথা বলেছেন। পরিবার যদি অপারগতা প্রকাশ করে তাহলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মা ও সন্তানের চিকিৎসার খরচ বহন করা হবে।

পুলিশ ও পরিবারের ভাষ্য মতে, শিশুটি মণিরামপুরে উপজেলার পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের সহকারী কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে থাকতো। তিনি বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে ওই শিশুর সাথে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। ওই শিশু ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর বিষয়টি ফাঁস হয়। তখন পরিবার এনজিও কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করার পর পুলিশ তাকে আটক করে জেলহাজতে পাঠান। ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট আসার পর পুলিশ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে।