বিষ প্রয়োগের একদিন পরেই বাজারজাত, পোকামুক্ত সবজি মানেই বিষ

::বিল্লাল হোসেন::

যশোরে সবজির রাজ্যে বিষের গন্ধ। পোকা-মাকড় দমনে প্রতিদিনই বিষ প্রয়োগ করছেন কৃষকরা। বিষমুক্ত বেগুন, শিম, ফুলকপি ও শাকসহ যাবতীয় সবজি বিষ স্প্রে করেই চাষিরা বাজারজাত করছে। সবজির নামে বিষ খাচ্ছে মানুষ।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিষমুক্ত সবজি চাষে কৃষকদের নানাভাবে সচেতন করা হয়। এছাড়া পোকা মাকড় দমনে ফেরোমন ফাঁদ ও আইপিএমএর বিভিন্ন পদ্ধতিতে সবজি চাষে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তারপরেও সবজিতে অতিরিক্ত বিষ ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি, হৈবতপুর ও কাশিমপুর ইউনিয়নে মাঠের পর মাঠ সবজির সবুজ সমারোহ। এখন শীতকালীন আগাম সবজির আবাদ চলছে পুরোদমে।

যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্র জানিয়েছে, যশোর জেলায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে সবজির চাষ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পরিমানে চাষ হয়েছে চুড়ামনকাটি, হৈবতপুর ও কাশিমপুরে। চাষকৃত সবজির মধ্যে মুলো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, বেগুন উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, হৈবতপুর ইউনিয়নে ১ হাজার ৬৩০ হেক্টর, চুড়ামনকাটি ইউনিয়নে ৮২৮ হেক্টর ও কাশিমপুর ইউনিয়নে ৫৫৩ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে। এখানে উৎপাদিত সবজির সুনাম দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও রয়েছে। কিন্তু আগের মতো সেই স্বাদ আর নেই। কারণ সবজির সাথে বিষ খাচ্ছে মানুষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবজিতে ছিটানো হচ্ছে মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপুর্ণ রিনকর্ড, সিমবুন, সুমিসাইডিন, হেপ্টাক্লোর, থায়াডিন, ডিডিটি প্রভৃতি বিষ। এছাড়াও নগস, সুমিথিয়ন, ডাইমেক্রন, ম্যালালাথিয়ন, অ্যারোমাল ইত্যাদিও ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব কীটনাশক প্রয়োগের পর ৩ থেকে ২১ দিন আগে সবজি খাওয়া মানেই বিষ খাওয়া। এমনকি কোন কোন বিষয় প্রয়োগের ৬ মাস পরেও এর বিষক্রিয়া থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

চাষিরা সকল বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বিকেলে বিষ প্রয়োগ করছে পরদিন সকালে নিচ্ছে বাজারে। তরতাজা সবজি বেশি দামে বিক্রির আশায় চাষিরা মানুষকে বিষ খাওয়াচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চুড়ামনকাঠি, আব্দুলপুর, ছাতিয়ানতলা, সানতলা, নুরপুর, বাগডাঙ্গা, দোগাছিয়া, সাজিয়ালী, শ্যামনগর, হৈবতপুর, তীরেরহাট, মানিকদিহি, মথুরাপুর, শাহাবাজপুর, মুরাদগড়, কাশিমপুর, বিজয়নগর, দৌলতদিহি, বালিয়াঘাট ললিতাদাহ, বালিয়াডাঙ্গা, বেনেয়ালী, ডহেরপাড়া, লাউখালী, নাটুয়াপাড়ার প্রতিটি মাঠে আবাদকৃত সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত বিষ ছিটানো হচ্ছে। অনেকেই খালি শরীরে মুখে কাপড় না বেঁধে বিষ ছিটানোর কাজ করছে।

সবজি চাষি আতিকুর রহমান, জয়নাল আবেদীন, মিন্টু মিয়া, জামাল উদ্দিন, শহিদুল ইসলাম, আশাদুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, বজলু মিয়াসহ অনেকেই বলেন, ‘কি আর করবো বিষ না দিলে সবজির চেহারা ঠিক থাকে না। ফেরোমন ফাঁদ দেয়ার পরও পোকামাকড়ের অত্যাচার আছেই ক্ষতিকর পোকা-মাকড় মরেনা। তাই বিষ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি।’

বিভিন্ন ইউনিয়নে দায়িত্বরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সবজিতে মাত্রাতিরিক্ত বিষ দেয়ার বিষয়ে চাষিদের বার বার নিষেধ করা হচ্ছে। তাদের সচেতন করতে মাঠ দিবস ও উঠান বৈঠকসহ বিভিন্নভাবে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠান করা হচ্ছে।

কীটনাশক ছাড়াই উন্নত মানের সবজি কিভাবে আবাদ করা যায় তার প্রশিক্ষণও দেয়া হয় কৃষান কৃষানীদের। তবে পূর্বের তুলনায় চাষিরা এখন অনেক সচেতন। অনেকেই বিকল্প পদ্ধতিতে সবজি ক্ষেতে পোকা মাকড় দমন করছে। তবে বেগুন ও শিমে কিছু কিছু চাষি অতিরিক্ত বিষ ব্যবহার করে।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক এমদাদ হোসেন জানিয়েছেন, যশোর সবজির জেলা হিসেবে সারা দেশে পরিচিত। যে কারণে এখানে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের ব্যাপারে চাষিদের বরাবরই সচেতন করতে হয়। সবজির পোকা-মাকড় দমনে কীটনাশকের বিকল্প ব্যবস্থাপনার উপর বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। চাষিদের বলা হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার ও নিয়ম মেনে বাজারজাত করার জন্য। তাহলে মানবদেহে এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

তিনি আরো বলেন, সবজিতে বিষ ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ আইন গঠন করা উচিত। তাহলে নিয়ম না মেনে বিষ ব্যবহার করলে চাষিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে পরিবেশের জন্য উপকারী পোকা মাকড়ও ধ্বংস হচ্ছে। আবার জমির উর্বরা শক্তিও কমে যাচ্ছে।

যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম লিটু জানান, অতিরিক্ত বিষ ছিটানো সবজি নিয়ম না মেনে বাজারজাত করা মোটেও ঠিক না। কীটনাশক ব্যবহার মানবদেহের জন্য শুধু ক্ষতিকরই নয়, মৃত্যুঝুঁকিও থাকে। কারণ এই সবজি খেলে ধীরে ধীরে কিডনি, লিভার ও ক্যান্সারসহ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।