স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় আব্দুল হাকিম গুরুতর অসুস্থ

::ক্রীড়া প্রতিবেদক::

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল এবং বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড় শেখ আব্দুল হাকিম গুরুতর অসুস্থ হয়ে লড়ছেন জীবন যুদ্ধে। বর্তমানে তিনি শয্যাশায়ী। বাংলাদেশ তথা যশোরের গর্বিত সন্তান আব্দুল হাকিম ছিলেন ৭০ থেকে ৮০ দশকের দেশ সেরা লেফট উইংব্যাক ফুটবলার।

তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের পক্ষে অংশ নিয়ে বিশ্বের দরবারে ক্রীড়ার মাধ্যমে দেশকে মহান স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।

গত জানুয়ারি হতে তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। তাঁর এ মরণব্যাধীর সাথে যোগ হয়েছে ডায়াবেটিস। ব্রেন স্ট্রোকের কারণে একটি চোখ প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত। অসুস্থ হবার পর থেকেই তিনি চিকিৎসা নিয়েছেন কোলকাতা ও ঢাকায়। কিন্তু তাঁর চোখসহ ক্ষতিগ্রস্থ অন্যান্য অঙ্গের জন্য জরুরী ভিত্তিতে আরো উন্নত অর্থাৎ ব্যায়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজন। এরই মধ্যে চিকিৎসার্থে এ যাবৎ খরচ করেছেন বিপুল অর্থ। নিজ ব্যবসা অসুস্থতার কারণে বন্ধ প্রায়। মুক্তিযোদ্ধা ভাতার মাসিক ১০ হাজার টাকাও প্রাত্যহিক জীবন ধারণের জন্য ব্যায় করতে হয়। এমতাবস্তায় ৭০বছর বয়সের যশোর তথা দেশে গর্বিত সন্তান হাকিমের জীবন সংকটাপন্ন। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য কামনা করেছেন।

শেখ আব্দুল হাকিমের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত
শেখ আব্দুল হাকিম ১৯৪৯ সনের ৪ ডিসেম্বর পশ্চিম বঙ্গের বারাসাত কাজীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শরাফত আলী, মাতা হাফিজা খাতুন। তিনি পিতার একমাত্র পুত্র সন্তান। ১৯৭৬ এ সাতক্ষীরার মোমেনা খতুনকে বিবাহ করেন। তিনি এক পুত্র এবং তিন কন্যা সন্তানের পিতা। আব্দুল হাকিম ১৯৬৩ সালে যশোর উপশহরে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন।

শিক্ষা জীবনে ১৯৬৬ সালে যশোর মুসলিম একাডেমি থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৬৮ সালে যশোর এমএম কলেজ থেকে আইএ পাশ করেন। ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৬৫ সালে যশোর মডেল হাইস্কুলের পক্ষে আন্তঃস্কুল খুলনা বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হন। ওই বছরই তিনি যশোর জেলা ফুটবল দলের পক্ষে খেলায় অংশ নেন।

তিনি কর্মজীবনে ১৯৬৮ থেকে ফুটবল খেলোয়াড় সুত্রে খুলনা প্লাটিনাম জুট মিলস এ পার্সেল অফিসার হিসেবে যোগদেন। ১৯৬৮ সালে ইস্ট পাকিস্তান যুব দলে যশোরের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনি অংশগ্রহণ করার সুযোগ পান।

১৯৬৯ এ পূর্ব পাকিস্তান সম্মিলিত বিশ্ববিদ্যালয় দলের পক্ষে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর খেলার মূল পজিসন ছিল রাইট ব্যাক কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে কৃতিত্ত্বের সাথে খেলেছেন লেফট ব্যাক হিসেবে। তিনি ১৯৬৮-৬৯ ঢাকা লীগের দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব এর পক্ষে অংশগ্রহণ করেন এবং তার দল রানাস আপ হবার গৌরব অর্জন করে। ১৯৭০-৭৬ এ ইপিআইডিসি বর্তমান বিজেএমসিতে যোগদান করেন। ওই সময়ে তিনি ঢাকায় অনুষ্ঠিত আগাখান গোল্ডকাপে অংশ নিয়ে বিদেশী দলসমূহের বিপক্ষে কৃতিত্ত্বের স্বাক্ষর রাখেন।

১৯৭২ এ তিনি আসামের গৌহাটি বরদুলই শীল্ডে, ঐ বছরই ঢাকা স্টেডিয়ামে কলকাতা মোহন বাগান এবং ইস্টবেঙ্গল দলের বিরুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৭ এ ঢাকা ওয়ান্ডারার্স এবং ১৯৭৮ সালে ওয়ারী ক্লাবের পক্ষে ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে কৃতিত্ত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৩ এবং ১৯৭৫ এ তিনি বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত মারদেকা আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেন। আব্দুল হাকিম দেশ তথা আমাদের যশোরের গর্বিত সস্তান।

তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের’ পক্ষে ভারতের এলাহাবাদ, বিহার, বেনারস,পাঞ্জাব প্রভৃতি স্থানে প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নিয়ে বিশ্বের দরবারে ক্রীড়ার মাধ্যমে দেশকে মহান স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। যশোর তথা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের গর্বিত সন্তান শেখ আব্দুল হাকিম তাঁর প্রাপ্য সম্মান পাননি। কেবলমাত্র ১৯৯৬ সালে আব্দুল হাকিমকে যশোর চাঁদের হাট কর্তৃক পদক প্রদানের মাধ্যমে সম্মনিত করা হয়।