৪৭ বছরেও বিএসটিআই-বিএসআইআরের শাখা হয়নি বেনাপোল স্থলবন্দরে

::নিজস্ব প্রতিবেদক::

৪৭ বছর আগে স্থলবন্দর হিসেবে বেনাপোলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর হিসেবে এটি পরিচিত। এ পথ চলার প্রায় পাঁচ দশক হতে চললেও বন্দরটিতে এখনও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে বিএসটিআই ও বিএসআইআরের কোনো শাখা না থাকায় খাদ্যদ্রব্যসহ অনেক পণ্যই পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না এখানে।

এতে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়া, দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। যার প্রভাব পড়ছে বাজারে ভোক্তাদের ওপর। তবে কিছু কিছু কেমিকেল বেনাপোল কাস্টমস হাউজে স্থাপিত ল্যাবে পরীক্ষণ করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, খাদ্যদ্রব্যের কাঁচামাল, কসমেটিকসসহ কয়েকটি পণ্যের নমুনা বন্দরের বাইরে থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে হয়। সেই রিপোর্ট আসতে এক মাসেরও বেশি সময় লেগে যায়। এতে ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হন যেমন, তেমনি বন্দরে লম্বা সময় পণ্যের চালান আটকে থেকে গুণগত মানও নষ্ট হয়। এ কারণে বেনাপোল স্থলবন্দরে পণ্য পরীক্ষণের নিজস্ব ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বন্দর সূত্রে জানা যায়, যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়াতে দেশের স্থলপথে যে পণ্য আমদানি হয় তার ৭০ শতাংশ আসে বেনাপোল দিয়ে। এ পথে বছরে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। যা থেকে সরকারি কোষাগারে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জমা হয়। যদিও গত ৬ বছর ধরে বন্দরটি থেকে রাজস্ব আদায় কমে যাচ্ছে।

বেনাপোল কাস্টম অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা, সেখানে আদায় হয়েছে ৪ হাজার ৪০ কোটি টাকা। রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে এক হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানি পণ্যের উপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার ১৯৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪ হাজার ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এতে ঘাটতি হয়েছে ১৭৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্যমাত্রা ৩ হাজার ৭৬০ কোটি ৩০ লাখ টাকার বিপরীতে বছর শেষে আদায় হয়েছিল ৩ হাজার ৮০৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ছিল ৪৫ কোটি ৪০ লাখ।

এছাড়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ১৪৩ কোটি। বছরের শেষ মুহূর্তে আবার তা কমিয়ে ২ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরে ২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা আদায় করে উদ্বৃত্ত দেখানো হয়েছিল। এভাবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঘাটতি ছিল ১৩৪ কোটি ৭৩ লাখ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ঘাটতি ৪৫২ কোটি ৮৯ লাখ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ১৯৪ কোটি।

বিদেশ থেকে আমদানি পণ্য বন্দরে খালাসের আগে পরীক্ষণ বাধ্যতামূলক। বেনাপোল বন্দর দিয়ে বছরে বিভিন্ন ধরণের সাড়ে তিন শতাধিক পণ্য আমদানি হয়। যার মধ্যে খাদ্যের কাঁচামাল, কসমেটিকস ও শিল্প কারখানার কেমিকেল জাতীয় ৫৫টি পণ্য পরীক্ষণ সার্টিফিকেট ছাড়া খালাস করা যায় না। কিন্তু এর ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই বেনাপোলে।

আমদানিকারক রেজোয়ান আহমেদ বলেন, ভারত থেকে যেসব পণ্য বেনাপোল বন্দরের মাধ্যমে আমদানি হয় তার বড় একটি অংশ খাদ্যদ্রব্য আর শিশুখাদ্য। বন্দরে পণ্য পরীক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় খুলনা বা ঢাকা থেকে নমুনা পরীক্ষা করাতে ১৫ থেকে ২০ দিন আবার কখনো এক মাসের বেশি সময় লেগে যায়। এতে দীর্ঘদিন ধরে এসব পণ্য বন্দরে পড়ে থাকায় অনেক সময় মানও নষ্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি আমদানি পণ্য বন্দর শেডে বা ট্রাকে রেখে মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় ব্যবসায়ীদের। যার প্রভাব পড়ছে ভোক্তাদের ওপর।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, বন্দরে বিএসটিআই ও বিএসআইআরের যে মারাত্মক সমস্যা রয়েছে তা নিরসন হওয়া দরকার। এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি পণ্য আমদানি করতে এলসিসহ ধাপে ধাপে বিভিন্ন খরচ আছে। পরীক্ষণ সমস্যায় লম্বা সময় পণ্যের চালান আটকে থাকলে সব খরচ ব্যবসায়ীদের ঘাড়ের ওপর পড়ে। এ ছাড়া সময়মতো কাঁচামাল কারখানায় না পৌঁছালে তা কাজে লাগাতে পারেন না ব্যবসায়ীরা।

ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের ল্যান্ডপোর্ট সাব কমিটির চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান বলেন, পরীক্ষা করাতে হয় এমন অনেক পণ্য ভারতের পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে রফতানি হয়। কিন্তু সেখানে ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে পণ্যের রিপোর্ট ই-মেইলের মাধ্যমে চলে আসে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য বেনাপোল বন্দরে এ সুবিধা নেই।

বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী জানান, বেনাপোলে এ সুবিধা না থাকায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এতে শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি প্রভাব পড়ে বাজারে ভোক্তার ওপর। বেনাপোল বন্দর কাস্টমস হাউজে স্বল্পপরিসরে বিএসটিআইয়ের একটি শাখা চালু হয়েছে। আর বিসিএসআইআরসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর শাখাও যাতে শিগগিরই স্থাপন হয়, সে জন্য লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।