কপির চারা উৎপাদনে লাভবান কৃষক

::বিল্লাল হোসেন::

যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের আব্দুলপুর গ্রামের একটি মেঠো পথের চারপাশে সবুজ রঙয়ের দৃশ্য। যেকোনো পথচারীর নজর ছুঁয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে বাণিজ্যিকভাবে কপি চারার আবাদ করছেন চাষিরা। বীজ অঙ্কুরোদগমের মাধ্যমে চারা উৎপাদন প্রতি মৌসুমে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। বর্তমানে চারার ক্ষেতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। এখানকার উৎপাদিত কপির চারা প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। চারা উৎপাদনে অনেকেই নিজেদের ভাগ্য ঘুরিয়েছেন। ইতিমধ্যে অর্ধশত চাষি হয়েছেন লাখপতি।

স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আষাঢ় মাস থেকে কার্তিক মাসের শেষ অবধি বাঁধাকপি ও ফুলকপির চারা উৎপাদন চলবে। এরই মধ্যেই চারা বিক্রি করা হয়। বেড তৈরি করে একই জমিতে তিন বার চারা উৎপাদন করতে পারেন চাষিরা।

চারা উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে জানা গেছে, বীজতলার আকার ১ মিটার পাশে ও লম্বায় ৩ মিটার হওয়া উচিত। সমপরিমাণ বালি, মাটি ও জৈবসার মিশিয়ে ঝুরঝুরা করে বীজতলা তৈরি করতে হয়। দ্বিতীয় বীজতলায় চারা রোপণের আগে ৭-৮ দিন পূর্বে প্রতি বীজতলায় ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫০ গ্রাম টিএসপি ও ১০০ গ্রাম এমওপি সার ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। পরে চারা ঠিকমত না বাড়লে প্রতি বীজতলায় প্রায় ১০০ গ্রাম পরিমাণ ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দেয়া ভালো।

আব্দুলপুর গ্রামের চাষি আজিজুর রহমান জানান, আষাঢ়ের শুরুতে জমিতে বেড দিয়ে বীজতলা প্রস্তুত করা হয়। তারপর বপণ করা হয় বাঁধাকপি ও ফুলকপির বীজ। বীজ থেকে চারা গজাতে এক মাস সময় লাগে। এ চারা চাষিদের কাছে বিক্রি করা হয়। তিনি ৬ বছর ধরে কপির চারা উৎপাদন করছেন।

আজিজর রহমান জানান, এবারও তিনি ১২ কাটা জমিতে মোট ৮০টি বীজতলা তৈরি করে বাঁধাকপির বীজ বপন করে। প্রতি বেডে চারা উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে আনুমানিক ১ হাজার টাকা। কিন্তু বেড প্রতি আড়াই হাজার টাকার বেশি চারা বিক্রি করেছেন। তিনবার চারা উৎপাদনে লক্ষাধিক টাকা লাভের সম্ভাবনার কথা জানান।

বর্তমানে বাজারে ফুলকপির ভালো মানের চারা (সনোবক্স) ১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৬০ পয়সা বিক্রি হচ্ছে। একটু দুর্বল চারা বিক্রি হচ্ছে ১ টাকা পিস। আর বাঁধাকপির প্রতিটি চারা (গ্রিন-৬০) ৫০ পয়সা থেকে ৬৫ পয়সা বিক্রি হচ্ছে বলে জানান চাষি আজিজুর রহমান।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আব্দুলপুর গ্রামের প্রায় সাড়ে তিনশ’ বিঘা জমিতে কপির চারা উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে গ্রামটি কপি পল্লী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। চারা উৎপাদন লাভজনক হওয়ায় আবাদকারীদের সংখ্যাও বেড়েছে। বর্তমানে দেড়শ’ চাষি চারা উৎপাদন করছেন। নিজস্ব জমি না থাকলেও জমি লিজ নিয়ে ঝুঁকেছেন কয়েকজন।

আরেক চাষি ওসমান গনি জানান, তিনি এক জমিতে চারা উৎপাদন করছেন। এখানকার কপির চারার মান ভালো হওয়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সুনাম রয়েছে। ফলে চারা বেশি দামেও বিক্রি করতে পারেন তারা।
তিনি আরো জানান, যশোর ছাড়াও খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, মাগুরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গার জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে চাষিরা এসে কপির চারা কিনে নিয়ে যান। কপির চারা উৎপাদন করে তিনি লাখ লাখ টাকা লাভবান হয়েছেন।

আইয়ুব আলী জানান, গতবারের মতো এবারো ১ বিঘা জমিতে বীজ বোপণের পর চারা উৎপাদন করেছেন। এখানো তার চারা বিক্রি চলছে। ইতিমধ্যে তিনি দুই লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। আরো দেড় লাখ টাকার চারা বিক্রি করতে পারবেন। সব মিলিয়ে তিনি মোটা অংকের টাকা লাভ করতে পারবেন বলে আশাবাদী।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে বীজ রোপন করে চারা উৎপাদন করতে ১ লাখ টাকার সামান্য বেশি টাকা খরচ হয়।

চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানান, বীজ থেকে কপির চারা উৎপাদন অন্য এলাকার চাষিদের জন্য আদর্শ দৃষ্টান্ত হতে পারে। এখানকার চারার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। যে কারণে চাষিদের যে কোনো সমস্যার সমাধানে নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করা হয়। কপির চারা উৎপাদন করে অনেক চাষি নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পেরেছেন। ভরা মৌসুমে নারী-পুরুষ মিলে জমিতে ব্যস্ত সময় পার করেন।