শয্যা বাড়লেও সেবা বাড়েনি, চিকিৎসক আছেন অর্ধেকেরও কম

  • যশোরের আট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

::আবদুল কাদের::

যশোরের চৌগাছা উপজেলা হাসপাতাল ২০০৪ সালে মডেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যা হয় ২০০৭ সালে। অথচ সেই ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই চলছে হাসপাতালটি। এখানে চিকিৎসক পদের সংখ্যা ২১ জন, আছে ১০ জন, ২২ জন নার্স পদের বিপরীতে আছে ১৯ জন। গতকালও রোগী ভর্তি ছিল ১৫৭ জন।

বৃহস্পতিবার বহিঃবিভাগে রোগী ছিল প্রায় ১ হাজার। চৌগাছা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার নাহিদ সিরাজ জানান, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারি সংকটের মধ্যে আমরা রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি।

শুধু চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই নয়, বাঘারপাড়া, মণিরামপুর, অভয়নগর, কেশবপুর ও শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেরও একই অবস্থা। এসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শুধুই শয্যা বাড়ানো হয়েছে, জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বাড়েনি।

মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইনচার্জ ডাক্তার শুভ্রারাণী দেবনাথ জানান, আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শষ্যায় উন্নীত করা হলেও সেই পুরনো জনবল দিয়ে চলছে। যেখানে ২৬ জন চিকিৎসক থাকার কথা সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ৮ জন। তার মধ্যে বিশেষজ্ঞ রয়েছেন ২ জন। তিনি বলেণ, এখানে বহিঃবিভাগে প্রতিদিন ৫ শতাধিক রোগী চিকিৎসা নেন, এবং ভর্তি থাকেন গড়ে ৬৫-৭০ জন রোগী। এনালগ এক্সরে মেশিন থাকলেও টেকনিশিয়ান নেই, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন দীর্ঘদিন ধরে অকেজো, প্যাথলজিও করানো যাচ্ছে না।

যশোর সিভিল সার্জন দফতরের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল বাদে জেলায় সরকার অনুমোদিত চিকিৎসকের মোট পদ রয়েছে ২শ’ ৯টি। এর ভেতর কর্মরত আছেন ৯৫ জন। বাকি ১শ’ ১৪টি পদে কোনো চিকিৎসক নেই। চিকিৎসকদের এ সকল পদ বছরের পর বছর শূন্য রয়েছে।

চিকিৎসক সংকটের ভেতর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্স কোনো রকম চললেও গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিয়োজিত উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসক নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় গ্রামীণ জনপদের মানুষ তাদের নিকটস্থ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে তেমন চিকিৎসা পাচ্ছেন না। জেলায় ২২টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ৪৯টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। যেখানে একজন করে মেডিকেল অফিসার থাকার কথা। অথচ চিকিৎসকই নেই অনেক কেন্দ্রে। ২শ’৭৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেখানে নেই মেডিকেল অফিসার।

যশোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আওতায় মোট চিকিৎসকের পদ রয়েছে ১৮টি। চিকিৎসক আছেন ৯ জন। ৩টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ৩ জন চিকিৎসক। ১২টি ইউনিয়ন ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ৫ জন চিকিৎসক থাকলেও নেই কোনো ভবন বা স্থাপনা। ভবন অভাবে তারা যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন। অভয়নগর উপজেলায় ২৯টি পদের মধ্যে চিকিৎসক আছেন ১১ জন। এ উপজেলায় ৩টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ৫টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক নেই।

বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আওতায় ১৮টি চিকিৎসকের পদের ভেতর কর্মরত আছেন ১২ জন। এ উপজেলায় ১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ৭টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ৪ জন চিকিৎসক রয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্সে ৮ জনের ভেতর ২ জন এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে চারটি।

মণিরামপুর উপজেলায় ২৬ জন চিকিৎসকের ভেতর রয়েছেন ৯ জন। ১৭টি চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে এ উপজেলার। ২টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভেতর ১ জন ও ১৫টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ১ জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। বাকি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক নেই।

কেশবপুর উপজেলায় ৩১ জন চিকিৎসকের ভেতর কর্মরত আছেন ১৩ জন। নেই ১৮ জন চিকিৎসক। ১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ৯টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক নেই।

ঝিকরগাছা উপজেলায় ২১ জন চিকিৎসকের ভেতর কর্মরত আছেন ১২ জন। ৯টি চিকিৎসকের পদ শূন্য এ উপজেলায়। এর ভেতর ৩টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ভেতর ১ জন, ৮টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ৩ জন চিকিৎসক এবং উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১০ জনের মধ্যে ৮ জন কর্মরত রয়েছেন।

চিকিৎসকের দিক দিয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে শার্শা ও দেশের একমাত্র মডেল চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।

শার্শা উপজেলায় ২২ জন চিকিৎসকের ভেতর কর্মরত আছেন ৭ জন চিকিৎসক। এর ভেতর ৪টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ১ জন, ৭টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ১ জন মিলে ২ জন দায়িত্ব পালন করছেন। উপজেলা হাসপাতালে ১০ জনের ভেতর কর্মরত আছেন ৫ জন। অধিকাংশ চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে শার্শা উপজেলায়।

অনুরূপভাবে চিকিৎসকের ব্যাপক শূন্যতা দেখা দিয়েছে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এ উপজেলায় ৪টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোন চিকিৎসক নেই। ৭টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের জন্যে রয়েছেন ১ জন চিকিৎসক। উপজেলা হাসপাতালে ২১টি চিকিৎসকের ভেতর রয়েছেন ১১ জন চিকিৎসক। সব মিলে ১২টি চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে চৌগাছা উপজেলায়।

যশোরের সিভিল সার্জন দিলীপ কুমার রায় বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেগুলো ৩১ শষ্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও জনবল বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বাড়েনি। আবার পদোন্নতিজনিত কারণে অনেক পদ শূন্য হচ্ছে। সব মিলে চিকিৎসকের শূন্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাত্র ৫১ শতাংশ চিকিৎসক দিয়ে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো চালাতে হচ্ছে।