গান্ধী-মুজিবের চেতনা ‘আজও লড়ছে বিশ্বজুড়ে’

নিজস্ব প্রতিবেদক : মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশত জন্মজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে এ আলোচনার আয়োজন করে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট

মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশত জন্মজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে এ আলোচনার আয়োজন করে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট

ভিন্ন সময়ে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তারা লড়েছেন অহিংস বাণী আর অসহযোগের অস্ত্র নিয়ে; লক্ষ্য ছিল জনতার মুক্তি, আর সেই লড়াইয়ে জিতেছেন দুজনই। মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- বেঁচে থাকলে আজকের পৃথিবীর সমস্যাগুলোর মোকাবিলা কীভাবে করতেন তারা?

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী মনে করেন, তাদের অনুপস্থিতিতেও তাদের সেই লড়াই থামেনি।

“আমাদের দুই মহানায়কই জীবদ্দশায় ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। বিশ্বকে তারা শিখিয়েছেন, কীভাবে এই ক্ষমতাবানদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়, কীভাবে তাদের পরাজিত করতে হয়। আর মৃত্যুর পর, এই বিশ্বে তারা আরও বেশি প্রভাব রাখছেন।”

মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশত জন্মজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট আয়োজিত এক আলোচনা সভায় কথা বলছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

ভারতীয় উপমহাদেশের দুই মহারথীর শেখানো আদর্শ আজ বিশ্বময় কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কতটা প্রাসঙ্গিক, সে বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, ভারতীয় হাই কমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাস, সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।

জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গান্ধী আশ্রম বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান সাংবাদিক স্বদেশ রায়।

মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুর সময়ে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব থাকলেও তারা তা ব্যবহার করেননি: আব্দুর রাজ্জাক

মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুর সময়ে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব থাকলেও তারা তা ব্যবহার করেননি: আব্দুর রাজ্জাক
আজকের পরিবেশবাদী তরুণদের আন্দোলনেও গান্ধী-বঙ্গবন্ধুর চেতনার ধারা দেখতে পান তৌফিক ইমরোজ খালিদী

আজকের পরিবেশবাদী তরুণদের আন্দোলনেও গান্ধী-বঙ্গবন্ধুর চেতনার ধারা দেখতে পান তৌফিক ইমরোজ খালিদী
আলোচনায় কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুর সময়েও রাজনীতিতে ধর্মের অনেক প্রভাব ছিল, কিন্তু কখনও তারা রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার করেননি।

তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকে বুঝেছিলেন, ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করা যাবে না। গান্ধীও বলেছিলেন, ধর্মান্ধ যারা, যারা ধর্মকে ব্যবহার করে তারা মানবজাতির শত্রু। বঙ্গবন্ধু এটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন।”

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গ টেনে এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, “তখন মুসলিম লীগ প্রায় ধর্মের সমতুল্য। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা। তখন তিনি এসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।”

গান্ধীর কথা ও কৌশল এখনও প্রযোজ্য মন্তব্য করে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অ্যালায়েড ফোর্সের বিজয়ের পর তিনি বলেছিলেন, সৈন্যদের বিজয় হয়েছে, মানুষের বিজয় হয়নি। অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে মিত্রশক্তির বিজয় হয়েছে। তাই এখনও দেখেন, সারা পৃথিবী ঝঞ্ঝাময়।”

গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এই সদস্য বলেন, “তিনি মনে করতেন, ব্রিটিশ বাহিনীর যে শৃঙ্খলা, শক্তি- সেটির সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা পারব না। অসহযোগ ও অহিংসার আন্দোলন তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হবে। এটির সময় একটু বেশি লাগতে পারে, কিন্তু শক্তি কোনো অংশে কম নয়। তিনি বারবার সেটি প্রমাণ করেছেন, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে।”

বঙ্গবন্ধুর গড়ে ওঠা প্রসঙ্গে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “সাধারণত মানুষ আত্মমুখী, পরিবারমুখী। নিজের পরিবারের বাইরে চিন্তা করে না। এটা মানুষের স্বভাব। কিন্তু কোনো কোনো সময় নেতা আসে, যে সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। সেটা বঙ্গবন্ধু করেছিলেন। সাড়ে সাত কোটি মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।”

আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে জীবন-যাপনেও গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছেন রীভা গাঙ্গুলী দাস

আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে জীবন-যাপনেও গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছেন রীভা গাঙ্গুলী দাস
ভবিষ্যতের তরুণরাও তাদের সমস্যাগুলোর মোকাবিলায় দুই মহামানবের পথ অনুসরণ করবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্বদেশ রায়ের

ভবিষ্যতের তরুণরাও তাদের সমস্যাগুলোর মোকাবিলায় দুই মহামানবের পথ অনুসরণ করবে, এমনটাই প্রত্যাশা স্বদেশ রায়ের

ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাস বলেন, “গান্ধীজীর বিশ্বাস ছিল- ন্যায্যতা থেকে সাহস আসে, শক্তিপ্রয়োগ থেকে নয়; ক্ষমতা আসে সত্য থেকে জোরজবরদস্তি করে নয়; মানসিক শক্তি থেকে বিজয় আসে, নতজানু হওয়া থেকে নয়। তার এমন শিক্ষা আমাদের শেখায়, সংঘাত থেকে অবিরত কুণ্ডলীর মতো সংঘাতেরই জন্ম হয়, ঘৃণা ও প্রতিশোধের স্পৃহা জাগায়।”

তিনি বলেন, “অহিংস আন্দোলন চায় অংশগ্রহণ ও উদ্বুদ্ধ করতে- সে কারণে এর ফলাফল অনেক ভালো হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা ও মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের সাফল্যেও উঠে আসে উদ্বুদ্ধকরণ আর অহিংসার মাধ্যমে এমন কিছু অর্জন করা যায়, যেটা বলপ্রয়োগ করে সম্ভব নয়।”

সেমিনার, আলোচনা সভা ও বার্ষিক আয়োজনে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবন-যাপনে গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুকে ধারণ করার আহ্বান জানান রীভা গাঙ্গুলী।

আলোচনায় গান্ধী-মুজিব

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “উন্নয়নের পথে চলার সময় বাংলাদেশের মানুষের, বিশেষ করে তরুণদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মনে ধারণ করতে হবে; যাতে তারা বহুজাতির, বহু সংস্কৃতির বাংলাদেশ তৈরি করে বঙ্গবন্ধু- মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের মূল্য দিতে পারে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, “গান্ধীজী ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু সবকিছুকে তিনি ধর্মের বাইরে রেখেছিলেন। যদিও জাতপাতের অনেক বিভাজন ছিল সে সময়।”

বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে অনেক গোয়েন্দা রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে, একটা বিষয়েও আপনি দেখাতে পারবেন না, বঙ্গবন্ধু ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তার দলের এখনকার নেতারা ধারণ করতে পেরেছেন কি-না, তা নিয়ে সন্দিহান মুনতাসীর মামুন

বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তার দলের এখনকার নেতারা ধারণ করতে পেরেছেন কি-না, তা নিয়ে সন্দিহান মুনতাসীর মামুন
অহিংস আন্দোলনে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপসহীন: নারায়ণ চন্দ্র চন্দ

অহিংস আন্দোলনে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু ছিলেন আপসহীন: নারায়ণ চন্দ্র চন্দ
“বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা পর্যন্ত প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে ধর্মকে ব্যবহার করেছেন। আওয়ামী লীগ আমলেও করা হয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি কখনও ধর্মকে রাজনৈতিক প্রত্যয় হিসাবে ব্যবহার করতে চাননি।”

’ধর্ম নিয়ে খেলা আগুন নিয়ে খেলার সমান’ মন্তব্য করে এই অধ্যাপক বলেন, “আমরা সে কারণে আজকের দিনে মহাত্মা গান্ধীকে প্রাসঙ্গিক মনে করি, অন্তত রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। তিনি সশস্ত্রের উপর নিরস্ত্রের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। এবং সেটি ছিল আদর্শ, যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধারণ করেছিলেন।”

আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের কর্মকাণ্ডে হতাশা প্রকাশ করে মুনতাসীর মামুন বলেন, “বঙ্গবন্ধু কী করেছিলেন, তার জীবনচর্চা কী ছিল- সেটি তার দল, তার দলের সহযোগী সংগঠন তারাও উপলব্ধি করে কি না সন্দেহ। উপলব্ধি করলে প্রতিদিন খবরের কাগজে এ সমস্ত খবর আসত না।”

মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশত জন্মজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে এই দুই মহানায়ককে নিয়ে এ আলোচনার আয়োজন করা হয় জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে

মহাত্মা গান্ধীর সার্ধশত জন্মজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ সামনে রেখে এই দুই মহানায়ককে নিয়ে এ আলোচনার আয়োজন করা হয় জাতীয় জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে
গান্ধীর অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলনকে বঙ্গবন্ধু নতুনভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব এই প্রত্যয়টাকে তিনি নতুনভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি লক্ষ্য স্থির করেছেন, তারপর আন্দোলনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অসহযোগকে বেছে নিয়েছিলেন। এবং অসহযোগকে কার্যকর করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। সে কারণে বাংলাদেশ আন্দোলন কখনও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হয়নি।”

সভাপতির বক্তব্যে সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, “এখানে যে তরুণরা উপস্থিত হয়েছেন তারা যেন ভবিষ্যৎ বিশ্বে যে সমস্যাগুলো আসবে এবং বর্তমানে যে সমস্যাগুলো আছে, সেগুলো মোকাবেলায় দুই মহামানবের পথকেই অনুসরণ করেন।”

আলোচনা সভার সঞ্চালক ছিলেন গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের পরিচালক রাহা নব কুমার।