সৌদি আরবে নারীদের নির্যাতিত হওয়ার কথা স্বীকার মন্ত্রণালয়ের

নিজস্ব প্রতিবেদক : সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশি নারীকর্মীরা সেখানে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করলেও তা নিয়ে নীরব ছিল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

তবে সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো এক প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে কাজ নিয়ে যাওয়া নারীরা নানা নির্যাতনের পাশাপাশি যৌন নিপীড়নেরও শিকার হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৬ অগাস্ট সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা নারী গৃহশ্রমিকদের ৩৮ জন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ৪৮ জন নারীকে নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়া হত না।

বৃহস্পতিবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপন করা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রণালয় তাদের ফিরে আসার ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে।

কোনো কোনো নারী শ্রমিক একইসঙ্গে একাধিক কারণ উল্লেখ করেছেন। যেমন- একই নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, আবার বেতন-ভাতাও পাননি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী যেসব নারীকর্মীরা ফেরত এসেছিলেন তা হল- নিয়মিত বেতন না দেওয়ায় ৪৮ জন, পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়ায় ২৩ জন, শারিরীক ও যৌন নির্যাতন ৩৮ জন, ছুটি না দেওয়ায় ৪ জন, একাধিক বাড়িতে কাজ করানোয় ৭ জন, অন্য কফিলের কাছে বিক্রি করে দেওয়ায় ১ জন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১০ জন, পারিবারিক কারণে ১ জন, ভিসার মেয়াদ না থাকায় ৮ জন, চুক্তি (দুই বছর) শেষ হওয়ায় ১৬ জন এবং অন্যান্য কারণে ২ জন।

২০১৫ সালে এক চুক্তির পর বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মী পাঠানো শুরু হয় সৌদি আরবে। কিন্তু কিছু দিন যেতে যেতেই নারীদের ফেরত আসা শুরু হয়।

ফিরে আসার পর ওই নারী যৌন নির্যাতনের অভিযোগ জানালেও মন্ত্রণালয় এবিষয়ে ছিল নিশ্চুপ। সৌদি আরব সফর করে এসে সংসদীয় একটি দলও দাবি করছিল, নারী গৃহকর্মীদের ফেরার কারণ নির্যাতন নয়।

ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সভাপতি বজলুল হক হারুন বলেছিলেন, “সৌদি আরবে অবস্থানরত শ্রমিকরা এবং গৃহকর্মীরা বেশ ভাল আছেন। সেখানে নিয়োজিত গৃহকর্মীদের ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা, সৌদি খাবার খাওয়ার প্রতি অনাগ্রহ এবং দেশের থাকার প্রতি অতি আগ্রহকে দেশে ফিরে আসার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।”

তবে তারপরও আসা থামেনি; অভিযোগও ছিল আগের মতোই। গত ২৬ আগস্ট ১১১ জন নারী গৃহকর্মী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন।

সৌদি আরবে নির্যাতন, ফিরে ঠাঁই হয় না পরিবারেও

‘নির্যাতন- প্রতারণায়’ সৌদি ছাড়ছেন বাংলাদেশি নারী শ্রমিকরা

সৌদি থেকে নারী গৃহকর্মীদের ফেরার কারণ নির্যাতন নয়: সংসদীয় দল

এই ১১১ নারীর মধ্যে ৩৪ জন সৌদি আরব যাওয়ার এক থেকে ছয় মাসের মধ্যে দেশে ফিরে আসেন।

গত বছর জুলাই মাসে এক আদেশে হাই কোর্টে সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যৌন হয়রানিসহ শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশের ফিরে আসা নারী কর্মীদের তালিকাসহ তাদের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছিল।

সৌদি আরব থেকে নারীকর্মী ফেরতের দুদিন পর গত ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত কমিটির চতুর্থ বৈঠকে কমিটির সদস্য আলী আশরাফ প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন।

ওই বৈঠকে তিনি সৌদি আরব থেকে সর্বস্ব হারিয়ে ফেরত আসার বিষয়টি উল্লেখ করে তার কারণসহ বিস্তারিত বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন উপস্থাপনের পরামর্শ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরব থেকে নারীকর্মীদের ফিরে আসার কারণ চিহ্নিত করে পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

মন্ত্রণালয় প্রতিবেদন দিলেও তা নিয়ে বৃহস্পতিবার সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়নি।

আলী আশরাফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সময় না থাকায় আমরা এটা নিয়ে আলোচনা করতে পারিনি। পরের বৈঠকের জন্য এটি স্থানান্তর করা হয়েছে।”

সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায়, প্রবাসী বাংলাদেশীদের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য বর্তমানে বিশ্বের ২৬টি দেশে বাংলাদেশ মিশনে মোট ২৯টি শ্রম কল্যাণ উইং চালু আছে। এছাড়া নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে বোয়েসেল জাপানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মী প্রেরণের পদক্ষেপ নিয়েছে।

কমিটির সভাপতি আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সভাপতিত্বে কমিটির সদস্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ, মো. আলী আশরাফ, মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, মৃনাল কান্তি দাস, আয়েশা ফেরদাউস, পংকজ নাথ ও সাদেক খান বৈঠকে অংশ নেন।