নামেই যশোর করোনারি কেয়ার ইউনিট

::বিল্লাল হোসেন::

প্রাণঘাতী হৃদরোগে আক্রান্ত প্রত্যেক রোগী যশোর করোনারি কেয়ার ইউনিটে আসেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। রোগী ও স্বজনরা প্রত্যাশা করেন সংকটাপন্ন মুহূর্তে পাবেন অক্সিজেন, ভেনটিলেশন ও কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস পরিচালনসহ উন্নত সব ব্যবস্থা। বাস্তবে করোনারি কেয়ার ইউনিট থেকে পেশার মাপা আর হৃদরোগের প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া কোনো কিছুই পাওয়ার সুযোগ নেই।

এমনকি ইসিজির মত সহজলভ্য পরীক্ষাও এ ইউনিটে হয় না। ইকো, এনজিওগ্রামের তো প্রশ্নই ওঠে না।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ১২ বছর পার হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি যশোর করোনারি কেয়ার ইউনিটের কার্যক্রম। এখান থেকে কোনো উন্নতসেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। শয্যার পাশে আধুনিক উপায়ে স্থাপিত অক্সিজেন ও ভেনটিলেশন লাইনগুলো আজও অকেজো। স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি চালুর প্রথমাবস্থায় যেসব যন্ত্রপাতি ছিলো তারও কোনো হদিস নেই।

প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ভবন ছাড়া করোনারি কেয়ার ইউনিটের নিজস্ব কিছুই নেই। বর্তমানে অন্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক সেবিকা ও কর্মচারী দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।

২০০৫ সালে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল চত্বরে করোনারি কেয়ার ইউনিটের তিনতলা ভবন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। ২০০৬ সালের ১২ অক্টোবর এটি উদ্বোধন করা হয়। ওই সময় লোকাল চিকিৎসা সরঞ্জাম কিছুই ছিলো না।

পরে পর্যায়ক্রমে ইকোকার্ডিও গ্রাম, ইটিটি, কার্ডিওয়াক মনিটর, কালার ডপলার, ডিজিটাল ইসিজি মেশিন প্রভৃতি বরাদ্দ দেয় মন্ত্রণালয়। ওই সময় ২৪ জন চিকিৎসক ৫৬ জন নার্স ও ১৪৩ জন কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশ করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কয়েক দফায় ইউনিটটি চালুর সময় পিছিয়ে যায়।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০৯ সালের ১২ জুলাই করোনারি কেয়ার ইউনিট চালু হয়। কিন্তু নানা সংকট রয়েই গেছে। জানা গেছে, করোনারি কেয়ার ইউনিটে ২৮টি বেডে রোগী ভর্তির ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ সে অনুযায়ী প্রত্যেক রোগীর জন্য একজন চিকিৎসক ও ২ জন সেবিকা থাকার কথা। তবে বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। করোনারি কেয়ার ইউনিটের নিজস্ব কোনো চিকিৎসক সেবিকা ও কর্মচারী নেই। যশোর মেডিকেল কলেজ ও যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক সেবিকা ও কর্মচারী দিয়ে হয় সেখানে চিকিৎসা কার্যক্রম।

সূত্র জানায়, এখানে অভিজ্ঞ তিনজন চিকিৎসক নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন। তারা হলেন- সহকারী অধ্যাপক জয়ন্ত কুমার পোদ্দার, কাজল কান্তি দাঁ ও সিনিয়র কনসালটেন্ট তৌহিদুল ইসলাম। কিন্তু যন্ত্রপাতির অভাবে তারা রোগীদের উন্নত চিকিৎসা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছেন। প্রাথমিক ব্যবস্থাপত্রে সুস্থ না হলে রোগীকে অন্যত্র রেফার্ড করে দিচ্ছেন তারা।

একাধিক রোগী ও স্বজনরা জানান, সকালে চিকিৎসকরা রাউন্ডে আসেন। কিন্তু বিকেলের পর থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ কোনো চিকিৎসকের দেখা মেলে না। আর জরুরি বিভাগে সহকারী রেজিস্ট্রারের পরিবর্তে দায়িত্ব পালন করেন ইন্টার্ন চিকিৎসক। জোড়াতালি দিয়েই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চিকিৎসাধীন রোগীদের কিছু ওষুধ বিতরণ ও প্রেসার মেপে দায়িত্ব শেষ করেন সেবিকারা। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় না করোনারি কেয়ার ইউনিটে। একটি মাত্র ইসিজি মেশিন সচল থাকায় ঠিকমতো কার্যক্রম চালানো হয় না। বেসরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে লোক ভাড়া করে ইসিজি করতে হয় অধিকাংশ সময়। তবে কোনো রোগী মারা গেলে ইসিজির অপেক্ষায় অপেক্ষার পালা শুরু হয় স্বজনদের। কেন না ইসিজি রিপোর্ট না দেখে দায়িত্বরত চিকিৎসক রোগীর মৃত্যু ঘোষণা করেন না।

সূত্র জানায়, এখানে ইকো মেশিন, ইটিটি মেশিন, কার্ডিয়াক মনিটর, কালার ডপলার মেশিন বছরের পর বছর অকেজো অবস্থায় ওয়ার্ড ইনচার্জের স্টোরে পড়ে রয়েছে। কয়েক মাস ধরে ৫টি ইসিজি মেশিনও নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র নিয়ে হার্টজনিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীরা ক্লিনিকে ছুটছেন।

রোগীর স্বজনেরা বলছেন, সরকারি এ চিকিৎসা কেন্দ্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করাতে পেরে দক্ষ প্যাথলজিস্ট ও টেকনিশিয়ানের সেবা থেকে বঞ্চিত হবার পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। আবার যন্ত্রপাতির অভাবে উন্নত চিকিৎসা পাচ্ছেন না হৃদরোগে আক্রান্তরা। এদিকে, করোনারি কেয়ার ইউনিট ২৮ শয্যার হলেও সব সময় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকেন।

চিকিৎসাধীন একাধিক রোগীর সাথে কথা বললে তারা জানান, এখানে চিকিৎসার জন্য আসার পর তাদের ধারণা পাল্টে গেছে। তাদের ধারণা ছিলো করোনারি কেয়ার ইউনিটে উন্নত চিকিৎসাসেবা হয়। কিন্তু এখন দেখছেন নামে তালপুকুর বাস্তবে ঘটি ডোবে না। প্রয়োজনের সময় চিকিৎসক ডেকেও পাওয়া যায় না। সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে থেকে করতে হচ্ছে। অধিকাংশ ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়। রোগীর অবস্থা একটু খারাপ হলেই অন্যত্র স্থানান্তর করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চলছে হ-য-ব-র-ল অবস্থার মধ্য দিয়ে।

কার্ডিয়াক বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট তৌহিদুল ইসলাম জানান, দুটি ইসিজি মেশিন সচল আছে। কিন্তু পেপারের অভাবে একটির কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রয়েছে। যন্ত্রপাতি ও লোকবল থাকলে এখানেই হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভাব হবে। বর্তমান সময়ে নানা সংকটের মধ্যেও রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম আজাদ লিটু জানান, করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভবন ছাড়া নিজস্ব কোনো কিছুই নেই। অথচ হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তার মধ্য দিয়েও তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। যন্ত্রপাতি থাকলে এখানেও উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব।

তিনি আরো জানান, তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব গ্রহণের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ৭৯ পদ সৃষ্টির জন্য পরিপত্র পাঠিয়েছিলাম। ৪৬টি পদ সৃষ্টির সাড়া মিললেও তা এখানো বাস্তবায়ন হয়নি। যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।