‘অ্যালিয়াম সিপা’ ওরফে পেঁয়াজ

মার্কিন মুল্লুকের স্ট্যাচু অব লিবার্টির মশালে সবসময়ে আগুন জ্বলে। আগুন জ্বলে বাংলাদেশের শিখা অনির্বাণে। তবে পেঁয়াজের আগুন দাউ দাউ করে না জ্বললেও কখনো নেভে না। মাঝে মাঝে কিছুদিন ‘ছাই চাপা আগুন’ হয়ে থাকে। সময় করে জ্বলে ওঠে পেঁয়াজ, হয়তো মানুষের ইশারায়! পেঁয়াজ মানুষকে না হাসালেও কাঁদায়। নাটক আর সিনেমার লোকজন কান্নার দৃশ্যে গ্লিসারিন ব্যবহার করে। পেঁয়াজ কাটতে গেলেও চোখে জল আসে। তবে পেঁয়াজ নিজেও কখনো সখনো কাঁদে। বোম্বে কাম তামিল নায়ক রজনীকান্ত যতোই জনপ্রিয় হোক তার অভিনয় প্রতিভা নিয়ে ব্যঙ্গ করে এমন মানুষও ভারতে কম নেই। এরা একটা কৌতুক বাজারে ছড়িয়ে দিয়েছে। কৌতুকটা এমন– পেঁয়াজ কাটার সময় রজনীকান্তের মুভি ছেড়ে রাখা হয় কেন? উত্তর: পেঁয়াজের ঝাজ যতোই থাকুক রজনীকান্তের অভিনয় দেখে পেয়াজ নিজেই কাঁদে! তখন পেঁয়াজ কাটতে আর কোন অসুবিধাই হয় না! আশাকরি এই কৌতুকটা কেউ নায়ক(!) অনন্ত জলিলের নামে এই দেশে ছড়িয়ে দেবেন না! পেঁয়াজের দাম বাড়লেই স্বামীরা নাকি পেঁয়াজ কিনতে চান না। বউরা জিজ্ঞাসা করলে স্বামীরা বলেন– ডার্লিং পেঁয়াজ কাটতে যেয়ে তুমি কাঁদো সেটা আমি চাই না!

পেঁয়াজ কাঁদে এবং কাঁদায় একারণে যে, পেঁয়াজের ভেতর জলের পরিমানই বেশি। পেঁয়াজ সবজি নয়, মশলা জাতীয় এক প্রকার উদ্ভিদ যার বৈজ্ঞানিক নাম ‘অ্যালিয়াম সিপা’। রসুন এবং পেঁয়াজ হচ্ছে লিলি গোত্রের উদ্ভিদ। পেঁয়াজে জল ছাড়াও থাকে শর্করা, প্রোটিন, ফসফরাস ও লোহা। পেঁয়াজ বৃষ্টিকে সামান্য ভালোবাসে। বেশি ভালোবাসে শীতকে। বাংলাদেশে তাই শীতেই পেঁয়াজ বেশি হয়। ঝাঁঝও বেশি থাকে। কেউ কেউ জমিয়ে রাখে কোল্ড স্টোরেজে। এরপর এমন সময় বাজারে ছাড়ে যে পেঁয়াজের ঝাঁঝ বা আগুন তীব্রতম হয়! বাঙালির পেঁয়াজ না কিনলে চলে না। কারণ বাঙালি ভাত, পান্তা, সবজী, আচার, ভর্তা, মাংস, কাবাব, মুড়ি-চানাচুর ভাজা বা ভর্তা এমনকি এমনি এমনিও পেঁয়াজ খেতে ভালোবাসে। দাম বাড়লে পেঁয়াজ আপেল-কমলার মতো হয়ে যায়। আপেল-কমলার মতো করে ‘একটা দামি দামি ভাব বা তৃপ্তি’ নিয়ে তখন পেঁয়াজও খাওয়া যেতে পারে। হুটহাট দাম বাড়ার কারণে ফুল গাছের মতো টবে পেঁয়াজের চাষ করা যায়। পেঁয়াজের ফুল বা কলি হয়ে উঠতে পারে আরও বেশি জনপ্রিয়। আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে সেই ‘শের’। পেঁয়াজ হচ্ছে ফুল মানে– যা বলা হয়ে গেছে। পেঁয়াজের কলি চির সম্ভাবনাময় অর্থাৎ যে কথা এখনো বলা হয়নি!

তবে পেঁয়াজ বিষয়ক সহসা যে কথা বলা হয় না সেটি হচ্ছে পেঁয়াজের ভালোবাসাটাও অসাধারণ। অনেকক্ষণ থাকে! চিবিয়ে খেয়ে দেখুন, সহসা গন্ধ যাবে না। সুগন্ধি আর পেঁয়াজ দুটোর ঝাঁঝই অনেকক্ষণ থাকে। পেঁয়াজ এই ঝাঁঝ শরীরে ছড়িয়ে দেয়। ক্যান্সার আর ডায়াবেটিস হলে পেঁয়াজ উপাদেয় খাবার।পেঁয়াজ মানব শরীরের রক্ত চলাচলে সতেজতা এবং শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। পেঁয়াজ নাকি আবার ‘বিশেষ শক্তি’ বাড়ায়। দেশ-বিদেশের খবর অনুযায়ী পেঁয়াজ খেলে নাকি যৌবন সতেজ থাকে, যৌনক্ষমতা বাড়ে! সেক্ষেত্রে প্রতিদিন একগ্লাস পেয়াজের জুস খেতে হবে। অন্যকিছু মেশানো যাবে না। লেখার শেষে পুরোনো এক গল্প থেকে (নিজের বানানো) সেটা আরও ভালোভাবে জানা যাবে।

তবে পেপার-পত্রিকা টেলিভিশনের খবর থেকে জানা যায় চুলের যত্নে পেঁয়াজ প্রায় অপরিহার্য। চুল শক্ত করতে নাকি পেঁয়াজের কার্যকারিতা অপরিসীম। সেক্ষেত্রে বিয়ের কথা পাকাপাকি করার সময় মিষ্টির পরিমাণ কমিয়ে অনেক বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ নিয়ে যাওয়া যায়। সোনা-রূপা বা যৌতুকের বিকল্প হিসেবে পেঁয়াজের ব্যবহার করা যেতে পারে। ব্যাংক ব্যালেন্স যদি স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে থাকে তবে তাঁর বিকল্প হিসেবে বলা যাবে– ছেলে বা মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য কোল্ড স্টোরেজে কয়েক টন পেঁয়াজ জমা আছে!

পেঁয়াজই একমাত্র মশলা জাতীয় উদ্ভিদ যা বহুদিন ধরে তার স্ট্যাটাস জমা রেখেছে মানুষের কাছে। প্রাচীন গ্রিক, হিন্দু ও চাইনিজ মিথে পেঁয়াজের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। সারা পৃথিবীতে যতো রকম মশলাই ব্যবহৃত হোক না কেন পেঁয়াজ এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। ভারতীয় মশলার পৃথিবী জয় করার গল্পে পেঁয়াজের স্থান অনেক ওপরে। একটা পেশার নাম হয়েছে পেঁয়াজের নামে। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যাবার রেওয়াজ বহুদিন ধরে চলে আসছে। অনেকে জানতে চান সৌদি আরব গিয়ে ছেলে কী করে? কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে উত্তর দেন- ‘অনিয়ন কাটা’র! শেষ ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতে এসে সেনাবাহিনীর দেয়া এক নৈশভোজে অংশ নিয়ে কয়েকবার ‘ওয়াশরুমে’ যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। ভারতীয় মশলাযুক্ত খাবার সম্পর্কে তার মন্তব্য ছিল– এখানকার খাবার খাওয়ার পর বুঝতে পারলাম ভারতীয়রা কেন ওয়াশরুমে জল ব্যবহার করে! পেঁয়াজ-মশলার ঝাঁঝ কিংবা আগুন যা খাবার পর একসময়ে বেরিয়ে আসে তা নেভানোর জন্য জলই দরকার!

পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেলে মজাদার কিছু অফার দরকার হয়ে পড়ে। অনেকে সেটা করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, অনেকে করেন বাস্তবে। যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারো কারো অফার– টব সমেত ফুল গাছ দেয়ার পরিবর্তে টবসহ পেঁয়াজ গাছ উপহার দিন। কারো কারো অফার– বাসায় আসার সময়ে বিস্কিট বা মিষ্টি না এনে পেঁয়াজ নিয়ে আসুন! ২০১৭ সালে একবার পেয়াজের দাম বেড়েছিল। ঢাকার খিলগাওয়ের ফাস্টফুড শপ থেকে মজার এক অফার দেয়া হয়েছিল। অফার ছিল– এক কেজি পেঁয়াজ দিন, বার্গার নিন! যারা মার্কেটিংয়ে কাজ করেন তারা নাকি এমন ‘অফার আইডিয়া’ নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেছেন। যেমন– আহসান গাড়ি শো-রুম থেকে গাড়ি কিনুন। যে কোন গাড়ি কিনলেই পাচ্ছেন গাড়ির ব্যাগডালা ভর্তি পেঁয়াজ ফ্রি! অথবা কোয়ালজন থেকে ফ্রিজ কিনলে ফ্রিজ ভর্তি পেঁয়াজ ফ্রি!

পেঁয়াজ নিয়ে চাষীদের ভাগ্য তেমন ভালো না। যখন ফসল ওঠে তখন চাষাবাদে লগ্নিকৃত টাকাই ওঠে না। আড়তে পেয়াজের দাম কমলেও খুচরা বাজারে কমে না। পেঁয়াজের দাম আকাশচুম্বী হলেও যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পেঁয়াজ ফলায়, তারা ক্ষতির সম্মুখীন হন। পেঁয়াজ দুষ্প্রাপ্য হলে কিংবা দাম বাড়লে বেশিরভাগ সময়ে পেঁয়াজ আমদানি করা হয় ভারত থেকে। ২০১৯ এর সেপ্টেম্বরে সাময়িক সময়ের জন্য ভারত পেঁয়াজ রপ্তানী নিষিদ্ধ করলে বাংলাদেশে পেঁয়াজ নিয়ে ‘সিন্ডিকেট বাজি’র মহড়া চোখে পড়ে। চিন, তুর্কি কিংবা মিসর থেকে আমদানি করার প্রক্রিয়া শুরু হলে ভারত আবার পেয়াজের দাম কমিয়ে দিতে পারে কারণ ২০১৭ সালে ভারত এমনই করেছিল। তুর্কি, চিন বা মিসর থেকে যারা আমদানি করে তখন তারা পথে বসে। পেঁয়াজ নিয়ে এই সিন্ডিকেটবাজি চলছেই। রাজা যায় রাজা আসে সিন্ডিকেটের তাতে কিছু যায় আসে না। পেঁয়াজ নিজে জ্বলে এবং অন্যকে তুমুল জ্বালায়।

যাইহোক পুরোনো গল্পে ফিরে আসি। এই গল্প দুই বছর আগেই লিখেছিলাম যা প্রকাশিতও হয়েছিল। পেঁয়াজের দাম বাড়ায় গল্পটা প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি বলে আবারও উল্লেখ করছি।

এক রাজা। তার চার স্ত্রী। রানীদের মনে সুখ নেই। রাজাকে নিয়ে তারা সুখী নন। রাজা রাজ্যশাসনে এবং যুদ্ধ-বিগ্রহে যতোটা সাহসী ও শক্তিশালী বউদের কাছে তিনি ততোটাই দুর্বল। একদিন চার বউকে ডাকলেন রাজা। জানতে চাইলেন কে তাকে কতোটা ভালোবাসে? প্রথম বউ বললো রাজাকে সে আকাশ ও সমুদ্রের মতো ভালোবাসে। দ্বিতীয় বউ বললো সে রাজাকে নদী ও বনের মত ভালোবাসে। তৃতীয় বউ বললো রাজাকে সে হীরা ও সোনার মত ভালোবাসে। ছোট বউ শুধু বললো রাজাকে সে রাজ্য ও পেঁয়াজের মতো ভালোবাসে! রাজা ক্ষেপে গেলেন। রাজা ছোট বউকে গহীন এক দূর বনে নির্বাসনে পাঠালেন।

গল্পটা এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু শেষ করা যাচ্ছে না। পাঁচ বছর পর যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রাজ্য নিয়ে রাজা খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তার মনে সুখ নেই। তিনি কোনো স্ত্রীর গর্ভেই তার কোনো উত্তারাধিকারের জন্ম দিতে পারেননি। ওনার পরে কে হবে রাজা এটা নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এরপরে এক যুদ্ধে শত্রুদের তাড়া করতে যেয়ে তিনি এক গহীন বনে পথ হারিয়ে ফেললেন। খাওয়া নেই পানি নেই। শত্রু আর বাঘ, সিংহ, সাপের ভয়। তিনি রাতে এক পোড়ো বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। তাকে যিনি আশ্রয় দিলেন তিনি রূপবানের মতো রাজাকে গান শোনালেন। রাজার মনে হলো এই কন্ঠ তার অনেক দিনের চেনা। এরপর আশ্রয়দাত্রী রাজাকে পেঁয়াজের শরবত খাওয়াতে লাগলেন। গান শুনে আর পেঁয়াজের শরবত খেয়ে রাজার ক্লান্তি দূর হলো। যিনি আশ্রয় দিয়েছেন, শরবত খাইয়েছেন আর গান শুনিয়েছেন রাজা তাকেই কামনা করে বসলেন!

রাজার আদেশ শিরোধার্য। আধো আলো-অন্ধকারে রাজার কাছে যিনি এলেন তাকে দেখে রাজা চমকে গেলেন। ছোট বউ। সেদিন রাজার মনে হলো তিনি বাসর রাতের আনন্দ পাচ্ছেন।

দুইদিন পর রাজা ছোট বউকে নিয়ে রাজ্যে ফিরলেন। কয়েকদিন পর সারা রাজ্যের প্রজারা আনন্দে মেতে উঠলো। জানা গেল ছোট রানী মাতা সন্তান সম্ভবা!

যতোই দাম বাড়ুক কিংবা কমুক, আসুন আমরা পেঁয়াজের মতো ভালোবাসা কী সেটা বুঝতে শিখি!

*আহসান কবিররম্য লেখক, নাট্যকার ও কলামিস্ট। হেড অব প্রোগ্রাম, বৈশাখী টেলিভিশন।*