বহুরুপী লিপির সিন্ডিকেটে ৯ জন, মূল পেশা প্রতারণা ও মাদক বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক:
যশোরে ওয়াকিটকিসহ আটক সেই আলোচিত নারী লিপি খাতুনের (২২) বিরুদ্ধে পাওয়া গেছে আরো কিছু তথ্য। একেক সময় একেক রুপ ধারন করতে বেশ পটু লিপি। নিজেকে কখনো রেহেনা কখনো রুমানা নামে পরিচয় দিতেন। প্রতারণা ও মাদক বিক্রি ছিল মূল পেশা। কলগার্ল হিসেবেও তাকে চেনে অনেকে। এই কাজে তার একটি বাহিনীও আছে। তার সাথে চারজন আটক হলেও বাইরে আছে আরো ৫জন। তার গ্রুপে নয়জন সদস্য আছে বলে জানাগেছে।
এদিকে লিপিসহ আটক ৫জনের বিরুদ্ধে কোতয়ালি থানায় একটি মামলা হয়েছে। সরকারি কর্মচারী পুলিশ ও রেলওয়ের কর্মকর্তা সেজে অপরাধ করার অভিযোগে মামলাটি করেন কোতয়ালি থানায় এসআই আমিরুজ্জামান। বৃহস্পতিবার পুলিশ ৫ জনকে আদালতে পাঠিয়ে ৫দিন করে রিমান্ড চেয়েছে। কিন্তু রিমান্ড শুনানি হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার বিকেলে যশোর জিলা স্কুলের সামনে থেকে লিপি সিন্ডিকেটের তিনজনকে আটক করা হয়। এরা হলো শংকরপুর সরকারি মুরগির খামার এলাকার সিরাজ মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া লিটনের ছেলে সোহেল রানা (২০), রেলগেট বিসমিল্লাহ সেলুনের পেছনের টুকু গাজীর ছেলে বাবু গাজী (১৮) এবং সুরুজ মিয়ার ছেলে তৌহিদুল ওরফে ওহিদুল (১৫)। তাদের কাছ থেকে একটি ওয়াকিটকি জব্দ করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরবপুর চাঁদের হাসি নামক বাড়ির নিচতলার ভাড়াটিয়া এনামুল হকের স্ত্রী লিপি খাতুন (২২) এবং রায়পাড়া বিল্লাল মসজিদের পাশের বাবুল খানের মেয়ে মনি আক্তার প্রিয়াকে (১৮) আটক করা হয়। সেখান থেকে আরো একটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। লিপির কাছ থেকে সাপ্তাহিক স্মৃতি নামক একটি পত্রিকার পরিচয় পত্র (নম্বর-১১৪/১৯) উদ্ধার করা হয়। যাতে লেখা আছে মহিলা বিষয়ক সম্পাদক। পরিচয়পত্রের মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে।
এছাড়া আটক সোহেলের কাছ থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা পরিচয়ধারী একটি পরিচয়পত্র পাওয়াগেছে। খাকি পোশাকের (পুলিশ) দুই কপি ছবি পাওয়া গেছে। তারা পুলিশ পরিচয়ে বিভিন্ন স্থানে কৌশলে প্রতারণা করে আসছিল। এতে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে।
পুলিশের একটি সূত্রে জানাগেছে, অনেক অপকর্মের হোতা এই লিপি খাতুন। চৌগাছার মাশিলা নারায়ণপুর গ্রামের মৃত হানিফ আলীর মেয়ে লিপি। একই এলাকার সাদ্দাম নামে এক যুবকের সাথে তার বিয়ে হয়। তার সাথে সংসার করতে না পেরে কয়েকবছর আগে যশোর শহরে আসেন মায়ের সাথে। পালবাড়ি এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতো। এরপর খালধার রোড বরফকল, বারান্দীপাড়া, রায়পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া থেকেছেন। ভর্তি হয় হামিদপুর আল হেরা ডিগ্রি কলেজে। পাশাপাশি যশোর মুজিব সড়কের একটি মোটরসাইকেলের শো-রুমে চাকরি করতেন। চাকরি করার সুবাদে মোটরসাইকেল চালনায় পারদর্শী হয়। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি জড়িয়ে পড়েন ইয়াবা কেনাবেচায়। প্রাইভেটকার নিয়ে চলে যেতেন কক্সবাজারের টেকনাফে। তার সাথে থাকতো কথিত বন্ধু পরিচয়ে অনেকে। যশোরের বিভিন্ন স্পোর্টিং ক্লাবের জার্সি গায়ে দিয়ে যেতো তিনি। খেলোয়াড় মনে করে পুলিশ সদস্যদের গাড়ি তল্লাশি এড়াতেন। সেখান থেকে যশোরে ইয়াবা নিয়ে এসে নিজেই বিক্রি করতেন মোটরসাইকেল চালিয়ে। রাতদিন ২৪ ঘণ্টা যখন খুশি তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে দুরদুরান্তে যেয়ে থাকেন। মোটরসাইকেলের সামনে লেখা প্রেস। অখ্যাত সাপ্তাহিকের পরিচয়পত্র নিয়ে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়ে ঘুরে ফিরতেন। যাতে পুলিশ প্রশাসন কোনো রুপে সন্দেহ করতে না পারে। চৌগাছা সীমান্ত থেকে ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য যশোরে নিয়ে আসতেন বলে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্রটি জানিয়েছে, লিপি ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বিয়ে করেছেন। বর্তমান স্বামীর নাম এনামুল হক। বিয়ের পর তালাকের মাধ্যমে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অংকের টাকা। গত বছরের ২৩ নভেম্বর যশোর বারান্দীপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে পুলিশের হাতে আটক হয় লিপি। কোতয়ালি থানার সে সময়কার এসআই হাসানুর রহমান তাকে আটক করেন আবুল ফজল এনামুল হক মিঠু নামে এক যুবকের সাথে। ওই বাড়িতে মিঠুর সাথে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলো লিপি। মিঠু ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌরসভার সচিব। এ ঘটনায় মামলা না দেয়ার শর্তে এসআই হাসানুর ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন বলে খবর রটে। পরবর্তীতে ওই পুলিশ কর্মকর্তার সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে এবং বাধাহীনভাবে চলে মাদকের কারবার। তার বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল আছে বলে পুলিশের কাছে খবর আছে। পুলিশ ওই মোটরসাইকেল গুলো জব্দ করে তা কি কাজে ব্যবহৃত হতো তা তদন্তের চেষ্টা করছে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে মাস তিনেক আগে লিপি আরবপুর এলাকার রেজানুল হক নামে এক ব্যক্তির তিনতলার বাড়ির নিচতলা মাসিক সাড়ে ৬ হাজার টাকায় ভাড়া নেন। নিজেকে সে সাংবাদিক পরিচয় দেয়। ওই বাড়িতে সে তার বোন প্রিয়া ও দাদি থাকবেন বলে জানানো হয়। বাড়ির মালিক ঢাকায় থাকায় ভাড়া দেয়া নেয়ার বিষয়টি দেখভাল করেন আজিজুর রহমান নামে বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট।
আজিজুর জানিয়েছেন, ভাড়া নেয়ার সময় প্রচুর মালামাল নিয়ে আসে লিপি। বলা হয়েছিল তার স্বামী ঢাকায় সচিবালয়ে চাকরি করে। আর বাবা চাকরি করে পিডিবিতে। সে বাড়িতে উঠার কিছু দিন পর রিমন নামে এক ব্যক্তি ওই বাড়িতে যায়। সে ওই রিমনকে স্বামী হিসেবে পরিচয় দেয়। এছাড়া তার বাড়িতে অনেক অপরিচিত লোকের আনাগোনা ছিল। বেশির ভাগ সময় লিপি বাইরে থাকতো। জিজ্ঞাসা করা হলে বলতো, পত্রিকায় চাকরি করে, তাই রাতবিরাত দেরি হয়।
লিপি খাতুনের ছোট বোন লিমা খাতুন জানায়, তার বোনের প্রথম স্বামীর নাম সাদ্দাম হোসেন। ওই ঘরে তার লিমন নামে ৭ বছরের একটি ছেলে রয়েছে। সে আরও জানান, তার বোন যশোরে আসার পর খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে অপর একটি সূত্র জানায়, লিপির আরও একজন স্বামী রয়েছে। তার নাম নাঈম। শ্বশুর একজন সেলুন কর্মচারী। লিপির ছেলে নয় মেয়ে সন্তান রয়েছে।
অপরদিকে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী লিপি খাতুন জানায়, তিনি এ পর্যন্ত দুটি বিয়ে করেছে। তার প্রথম স্বামী সাদ্দামের বাড়ি চৌগাছার মাশিলা গ্রামে। তার সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর সে কোটচাঁদপুর পৌরসভার সচিব আবুল ফজল এনামুল হক মিঠুকে বিয়ে করে। তার স্বামী তাকে একটি মোটরসাইকেল ব্যবহারের জন্য দিলেও সেটি ফেরত নিয়েছে। যশোর সদর উপজেলার আলহেরা ডিগ্রি কলেজে পড়াশোনা করে বলে দাবি করে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সাইফুল মালেক জানিয়েছেন, লিপির সাথে প্রাথমিক কথা হয়েছে। উল্টোপাল্টা কথাবার্তা বলেছেন। পরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।