যশোর ২৫০শয্যা হাসপাতাল : ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পরও দালাল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

বিল্লাল হোসেন:
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালকে দালালমুক্ত করতে জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত গত তিন মাসে ৬ বার দালাল বিরোধী অভিযান চালিয়েছে। অভিযানে একাধিক দালালকে জেল জরিমানাও করা হয়েছে। এরপরেও দালালের দৌরাত্ম্য কমছে না। তারা হাসপাতালে অবস্থান নিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা অব্যাহত রেখেছেন। সূত্রের দাবি, অভিযানে আটক হওয়া দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রদান করলেও তারা পূর্বের দালালিতে ফিরছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৮ জুলাই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে ৪ দালালকে আটক করে। তারা হলেন যশোর শহরের ঘোপ এলাকার শরিফুজ্জামানের ছেলে রফিকুজ্জামান সাচ্চু, শহরের রেলগেট এলাকার ইসরাফিল শেখের ছেলে রুবেল শেখ, সদর উপজেলার শেখহাটি পূর্বপাড়ার জোবায়ের হোসেনের ছেলে জাফর হোসেন ও পুলেরহাট এলাকার হায়দার আলীর ছেলে মনিরুজ্জামান মনির।
তাদের প্রত্যেককে ২০ দিন করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ১০ জুলাই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রীতম সাহা ও আয়েশা সিদ্দিকার নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত হাসপাতালে দালাল বিরোধী অভিযান চালায়। এ সময় ২জনকে আটক করা হয়। তারা হলেন যশোর শহরের ঘোপনওয়াপাড়া রোডের আব্দুল আলিমের ছেলে আবুল হাসান ও সদর উপজেলার দেয়াড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আল আমিন। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার অপরাধে ভোক্তাধিকার আইনের ৫২ ধারায় দোষ স্বীকার করায় আবুল হাসানকে নগদ ৫ হাজার টাকা জরিমানা, ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অনাদায়ে আরো ২ দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়। দোষ স্বীকার না করায় আল-আমিনকে যাচাই বাছাইয়ের পর কোতয়ালি থানায় সোপর্দ করা হয়। ১১ জুলাই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রীতম সাহার নেতৃত্বে হাসপাতালে দালাল বিরোধী অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় আবুল হাসান নামে এক দালালকে আটক করে আদালত তাকে ১৫দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা দেয়।
২১ আগস্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কেএম আবু নওশাদের নেতৃত্বে ভ্র্যাম্যমান আদালত হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে তিন দালালকে আটক করে। আটককৃতরা হলেন যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের অলোক দাসের ছেলে পল্লব দাস, সদর উপজেলার বসুন্দিয়া গ্রামের মাসুদ আলীর ছেলে রেজাউল ইসলাম, বিরামপুর এলাকার মৃত আলী হোসেনের ছেলে আলম হোসেন খান। এরমধ্যে পল্লব কলেজ ছাত্র হওয়ায় ও আলম হোসেন খান কোনদিন হাসপাতালে আসবে না বলে মুচলেখায় দিলে তাদের মুক্তি দেয়া হয়। অপরজনকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ১২ সেপ্টেম্বর ও ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কেএম আবু নওশাদের নেতৃত্বে হাসপাতালে ফের অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। ১২ সেপ্টেম্বরের অভিযানে চিহ্নিত দালাল আলম হোসেন খানকে কড়াকড়িভাবে সতর্ক করা হয়। বলা হয় ফের তাকে হাসপাতালে দেখা গেলে জেল জরিমানা করা হবে। আর ২৬ সেপ্টেম্বর ভ্রাম্যমান আদালতের গাড়ি দেখে টিকিট কাউন্টারের সামনে জড়ো হওয়া দালালরা ভো দৌঁড় দেয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কড়াকড়ি আরোপের কারণে বেশ কিছুদিন দালালের কবল থেকে রেহাই পেয়েছিলো হাসপাতালে আগত রোগী ও স্বজনেরা। কিন্তু বিভিন্ন সময় জেল জরিমানার শিকার দালালরা আবারো প্রতারণা শুরু করেছে। তারা ছাড়াও হাসপাতালে অর্ধশত দালালের দৌরাত্ম চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সিরাজুল ইসলাম ওরফে লুঙ্গি সিরাজ, পলাশ, মুন্না, সোহেল, সোলাইমান, ঘেনা সুমন, মোটা সুমন, হাসু, তছির, হিটু, রাসেল, কাঞ্চন, সেলিম,সুব্রত, বিদ্যুৎ ও জুলহাস। তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দালালি কর্মকাণ্ড করে থাকে। টিকিট কাউন্টারের সামনে থেকে শুরু করে তারা গোটা হাসপাতালে ঘুরে বেড়ায় রোগী ভাগানোর ধান্দায়। তাদের খপ্পরে পড়ে মানুষ অর্থ খুইয়ে বাড়ি ফিরছেন। শনিবার সরকারি এই হাসপাতালে এসে দালালের খপ্পরে পড়েন যশোর সদর উপজেলার নাটুয়াপাড়া গ্রামের পারভীনা খাতুন। টিকিট কাউন্টারের সামনে থেকে তিনি দালালের খপ্পরে পড়ে বেসরকারি একটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে চিকিৎসা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা বাবদ খুঁইয়েছেন ২২শ’ ৭০ টাকা। বিষয়টি নিয়ে কথা হলে নির্বাহী ম্যাজিস্টেট কেএম আবু নওশাদ জানান, হাসপাতালে ভ্রাম্যমাণ আাদালতের দালাল বিরোধি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত তিন মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালত একাধিক অভিযান চালিয়েছে। অনেকে জেল জরিমানার শিকার হয়েছে। দালালের দৌরাত্মের বিষয়টি জানলাম। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে যে কোনো সময় অভিযান পরিচালনা করা হবে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু বলেন, দালালদের বিরুদ্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জোরালো অবস্থানে রয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে দেয়ার জন্য দালালদের একটি তালিকা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ১০টি মাইকযোগে হাসপাতালে বিভিন্ন বিভাগে দালাল বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে। দালাল বিরোধী অভিযানের বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসনের সাথে আবারো কথা বলবেন।