উন্নয়ন প্রকল্পে তিরস্কারের পাশাপাশি পুরস্কার জরুরি

প্রধানমন্ত্রী কোনো কর্মকর্তার গাফিলতির কারণে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নের সময় ভুল অ্যাসেসমেন্ট হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। মেঘনা নদীর ভাঙন হতে ভোলা জেলার চরফ্যাশন পৌরশহর সংরক্ষণ প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন দিতে গিয়ে একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা দেন। দেশ ও জাতির কল্যাণ বিবেচনায় দেরিতে হলেও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা সাধুবাদযোগ্য। ন্যূনতম জবাবদিহিতার কোনো ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে আমাদের দেশে বহু পরিকল্পনা ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও কারো শাস্তি হতে দেখা যায় না। বরং পুরস্কৃত হওয়ার শত সহস্র উদাহরণ চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্যর্থ প্রকল্পের কোনো দায় গ্রহণ না করেই নতুন একটা প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়ে যাওয়াতে বাঁধাই আসেনি। প্রধানমন্ত্রীর নজরে পড়ার মতো সমস্যা যদি কখনো কোনো কারণে দেখা যায় তবে আমাদের করাতের দাঁতের মতো প্রশাসন হওয়ায় পানি নিচের দিকে গড়িয়ে দেয়া হয়ে থাকে। নিম্নপদস্থ এক বা একাধিক কর্মচারীর উপর ভুলের দায় চাপিয়ে সবাই খুব নিশ্চিন্তে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা রক্ষায় ব্রতী হয়ে থাকেন। তবে সাধারণ জনগণ মনে করে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নের সময় ভুল অ্যাসেসমেন্ট হলে দায়ীকে তিরস্কারের ব্যবস্থা নিয়েছেন, ঠিক তেমনি সফল প্রকল্প প্রণয়নের পুরস্কারের ব্যবস্থা জরুরি।

স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোন কোন উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নের সময় ভুল অ্যাসেসমেন্ট হয়নি তা বলতে গবেষণার প্রয়োজন পড়বে। বিপরীতে ভুল অ্যাসেসমেন্টের কারণে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্থ এমন প্রকল্পের তালিকা করতে গেলে কোন প্রকল্পের আগে কোনটা আসবে তা নিয়ে রীতিমত যুদ্ধ করতে হবে। আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যাতায়াত, কল-কারখানা, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি এমন একটা সেক্টরও পাওয়া যাবে না যেখানকার কোনো প্রকল্প প্রথম অ্যাসেসমেন্টে সফলভাবে শেষ করা গিয়েছে। আমরা যে স্বাধীন, ব্রিটিশ বা পাকিস্তানীরা নেই তা কারো মনেই নেই। সবাই ধরে নিয়েছে দেশ চিরকালীন তাই নিজের ভবিষ্যৎ আগে গড়ে নাও পরে দেশ ও জাতির কথা ভাবা যাবে, কারণ দেশ তো থাকলোই। তাই ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণের কোনো প্রয়োজনীয়তাই দেখা গেল না, একের পর এক ভুল পরিকল্পনার উন্নয়ন জাতির ললাটে লিখে দেয়া হলো। এ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা থেকে আমরা মুক্তি পেলাম না এখনো।

আমাদের তিস্তা সেচ প্রকল্প যা সাড়ে ১৪ লক্ষ একর জমিতে সেচ সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে হাতে নেওয়া হয়। এ প্রকল্পে মাত্র ৩০/৪০ কোটি টাকা প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল। আজও কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পর নির্মাণ কাজ চলমান। প্রকল্প কবে শেষ করা যাবে কেউ জানে না। প্রায় একই চিত্র মেঘনা-ধোনাগোদা সেচ প্রকল্প, মনু সেচ প্রকল্প, জি কে প্রজেক্ট, মহুরী সেচ প্রকল্পের ক্ষেত্রে। কেউই লক্ষ্যমাত্রার ধারে কাছে যেতে পারেনি। জিয়া সার কারখানা প্রাথমিকভাবে ৬৯ কোটি টাকা নির্মাণ ব্যয় প্রাক্কলন করে ১০৫০ কোটি টাকায় শেষ করা হয়। অনুরূপভাবে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরির প্রাথমিক ব্যয় ৬০০ কোটি টাকা বলা হলেও শেষ হয় এক হাজার ৬৫০ কোটি টাকায়। আমাদের স্টিল মিল, শিপইয়ার্ড, নিউজপ্রিন্ট মিলস ইত্যাদি ৩ শিফটে চলার কথা বলে তৈরি করা হলেও মাত্র ১ শিফট চালিয়ে লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। আর আমরা এসব ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছি। বর্তমানে চলমান ঢাকা-চট্টগ্রাম ৪ লেন প্রকল্প প্রাথমিক ব্যয় ১৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করে ২০০৬ সালে শুরু হয়। ব্যয়ের হিসাব কয়েকবার পরিবর্তন করে ৩৮ হাজার কোটি টাকা হলেও প্রকল্প কবে শেষ হবে অনুমান করা কঠিন। আর আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের হদিস করা তো গবেষকদের জন্যও কষ্টসাধ্য কাজ।

একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী আগামীর জন্য অনেক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এর আগে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে প্রকৌশলীর গাফিলতির কারণে ভুল অ্যাসেসমেন্ট হয়; এতে অনেক টাকা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আবার ওই প্রকৌশলী দেখি এই প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত আছেন। তাহলে তখনকার ভুলের জন্য তাকে কী শাস্তি দেয়া হয়েছে? প্রধানমন্ত্রী এ সময় পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং সচিবকে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। জনগণ আশা করছে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হওয়ায় দোষী ব্যক্তি শাস্তি পাবেন। তবে তা গড়িয়ে নিম্নপদস্থ কোনো কর্মচারীর ঘাড়ে গিয়ে পড়বে। প্রকৃত দোষী শাস্তি পাক এটাই সকলের কাম্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো এরা তো ঐতিহ্যের ধারক মাত্র। আজ যদি দোষীদের শাস্তি দেয়া হয় তবে অতীতে যারা উন্নয়ন প্রকল্পে ভুল অ্যাসেসমেন্ট করে দেশ ও জাতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছেন তাদের কী হবে?

প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব প্রদানের জন্য সরকার বেশকিছু নীতিমালা তৈরি করেছে। সেই নীতিমালা পুরাপুরিভাবে মানা হচ্ছে এমন দাবি যেমন করা যাবে না তেমনি এই নীতিমালা ব্যবহার করে প্রকল্প ত্রুটিমুক্ত করা গিয়েছে এমন কথাও বলা যাবে না। অথচ দেশ ও জাতির কল্যাণ বিবেচনায় প্রাক্কলিত ব্যয় ও সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা জরুরি। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে কাম্যও বটে। বঙ্গবন্ধু বলতেন তিনি চোরের খনি পেয়েছেন। জাতির দুর্ভাগ্য তাঁর অবর্তমানেও খনির উৎপাদন বন্ধ হয়নি। উৎপাদন বন্ধ করার কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। তাই নীতিমালা তৈরি করেও কাজের কাজ হচ্ছে না। প্রয়োজন নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন। এখানে স্বার্থের টানে সব বাধা ভেসে যাচ্ছে। যদিও নীতিমালা প্রণয়নের সময় দেশ ও জাতির স্বার্থের চাইতে নিজ বা গোষ্ঠী স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়ে থাকে। তাই এতে দোষী হয়েও শাস্তির বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ থাকে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে ভুল অ্যাসেমেন্ট হলেও উচ্চমহল বহাল থেকে যায়। এখানে যে বড় তার বড় ভুল বিবেচিত হয় না। তিনি দুদকের ভাষায় সরল বিশ্বাসে এ কাজ করেছেন বলে ধরে নেয়া হয়। তাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

উন্নয়ন প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণে ইচ্ছুক কর্মকর্তাকে একক দায়িত্ব প্রদান জরুরি। তাতে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা যাবে না। উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব গ্রহণের আগেই প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, অর্থের যোগান, জনবল, টাইম সিডিউল ইত্যাদি দেখার পর কর্মকর্তা রাজী হলেই তাকে দায়িত্ব দেয়া হবে। প্রকল্প শেষ হবার পর নির্ণীত লক্ষ্য উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে তা ন্যূনতম এক বছর জাতিকে দেখানোর পরেই প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। এ সকল শর্ত যিনি পূরণ করতে পারবেন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং পুরস্কৃত হবেন। আর যিনি সক্ষম হবেন না তিনি তিরস্কৃত হবেন। সরকার যদি এভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নে ব্রতী হন তব সফলতা আসতে বাধ্য। কিন্তু যদি বর্তমানের মতো প্রকল্প পরিচালকদের দায়িত্ব গ্রহণের প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকা কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা হয় তবে মুক্তি সুদূর পরাহত। কে, কখন কাকে ল্যাঙ মেরে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাবেন তা কেউ ধারণা করতে পারবে না। এমন কর্ণধাররা সংশ্লিষ্টদের স্বার্থ রক্ষা ছাড়া আর কিছু বোঝেন বলেও মনে হয় না। কারণ তিনি জানেন স্বার্থের টানাপোড়েন পড়লেই তাকেও ল্যাঙ মেরে দেওয়া হবে।

একনেকের সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ সরাসরি প্রকল্পে দেয়ার ফলে অগ্রগতি তিনগুণ বেশি হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। শুধু মন্ত্রণালয়কে মাঝ থেকে সরিয়ে দিতেই এমন ফলাফল পাওয়া গিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন দেশে করাতের দাঁতের প্রশাসনের প্রয়োজনীয়তা নেই। এখানে যত ঘাটের সৃষ্টি হয়েছে ততই দুর্নীতি জাঁকিয়ে বসেছে। এখন ঘাট কমানোর সময় এসেছে। এখন ছোটবড় সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। দেশ ও মানব প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। যেকোনো কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এবং নির্ধারিত অর্থে শেষ করার ব্রত নিয়ে কাজ করতে হবে। এক টাকার কাজ এক টাকার মধ্যে শেষ করতে হবে। কোনোভাবেই এক টাকার কাজ তিন টাকায় শেষ করার কার্যক্রম চলবে না। এখানে আইনের কঠোরতার নিশ্চয়তা দিতে হবে। সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আমাদের এ দুর্বলতা যত আগে কাটে ততই মঙ্গল। সমস্যার গোড়ায় যেতে হবে। আশু সমস্যার আশু সমাধান চলবে না। প্রধানমন্ত্রীকে বিনীত অনুরোধ আপনি কঠোর হলেই দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। জানি কাজটা খুবই কঠিন। কিন্তু জনগণ দেখেছে দেশ, মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে ঝুঁকিপূর্ণ বিপদসংকুল দায়িত্ব পালনে আপনি পিছু পা নন। লোভী, অর্থলিপ্সু, দুর্নীতিবাজদের বেড়াজাল ছিন্ন করে দিতে হবে আপনাকেই। স্নেহে অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র পুত্র দুর্যোধনের অন্যায়ের বিচার না করার পরিণতি নিশ্চয়ই আপনি জানেন।

—-এম আর খায়রুল উমামসাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)