মোবাইল টাওয়ার: অপারেটর-বিটিআরসি দ্বন্দ্বে গ্রাহক সেবায় ভোগান্তি

শামীম আহমেদ : নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে টাওয়ার শেয়ারিংয়ের চুক্তি অনুমোদন নিয়ে মোবাইল ফোন অপারেটর ও বিটিআরসির টানাপড়েনে গ্রাহক সেবা হুমকির মুখে পড়ছে বলে দাবি করছে অপারেটররা।

নিরীক্ষা আপত্তির ‘পাওনা’ টাকা আদায়ের জন্য বিটিআরসি বিভিন্ন ধরনের টেলিযোগাযোগ সেবার অনুমোদন ও অনাপত্তিপত্র দেওয়া বন্ধ রাখায় ফোর জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ ‘বাধাগ্রস্ত’ হওয়ার কথা ইতোমধ্যে জানিয়েছে দেশের দুই শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি।

তারা বলছে, বছর ধরে চলে আসা এ টানাপড়েনে গ্রাহক সেবা আরও হুমকির মধ্যে পড়ছে।

বিটিআরসির দাবির পাল্টায় জিপি ও রবির মামলা

জিপি-রবিতে প্রশাসক নিয়োগের ‘প্রক্রিয়া শুরু’

২০১৮ সালের জুলাই মাসে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিটিআরসি চারটি প্রতিষ্ঠানকে টাওয়ার শেয়ারিং নীতিমালার আওতায় লাইসেন্স দেয়। অপারেটরদের হয়ে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন নেটওয়ার্ক টাওয়ার স্থাপন করার কথা।

কিন্তু নিজেদের মধ্যে (টাওয়ার শেয়ারিং ও অপারেটর) চুক্তি সম্পাদনের পরও বিটিআরসির অনুমোদন না পাওয়ায় গত এক বছরে নতুন কোনো মোবাইল টাওয়ার স্থাপন করতে পারেনি অপারেটররা।

অপারেটরদের একাধিক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, কয়েকটি টাওয়ার শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত জুলাইয়ে তারা চুক্তি করলেও বিটিআরসির অনুমোদন মেলেনি।

নীতিমালা অনুযায়ী, মোবাইল অপারেটর ও টাওয়ার শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান নিজেদের আলোচনার ভিত্তিতে ব্যবসায়িক চুক্তি করবে।

কিন্তু বিটিআরসি দ্বি-পক্ষীয় চুক্তি অনুমোদন না দিয়ে নিজেরাই একটি সাধারণ চুক্তি বানিয়ে তা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ অপারেটরদের।
অপারেটররা বলছে, এ ধরনের হস্তক্ষেপ করে বিটিআরসি নিজেই টাওয়ার শেয়ারিং নীতিমালার ১৪ দশমিক শূন্য ৩ ও ১৪ দশমিক ৪ ধারা অমান্য করছে। এসব ধারায় মোবাইল ফোন অপারেটর ও টাওয়ার শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কথা বাধ্যতামূলক বলে উল্লেখ রয়েছে।

বিটিআরসিকে এভাবে ‘এক পেশে’ চুক্তি করা থেকে বিরত থাকার জন্য ইতোমধ্যে আহ্বান জানিয়েছে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব।

বিটিআরসিকে দেওয়া এক চিঠিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, বিটিআরসি শুধু একটি সাধারণ চুক্তিই চাপিয়ে দিচ্ছে না বরং টাওয়ার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য মূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে, যেখানে বর্তমান মূল্য থেকে অপারেটরদের বেশি মূল্যে টাওয়ার স্থাপন করতে হবে।

অ্যামটব বলছে, বিটিআরসির এ ধরনের অনুশীলন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ এবং বিটিআরসি প্রণীত টাওয়ার শেয়ারিং নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শুধু তাই নয়, বিটিআরসি প্রণীত সাধারণ চুক্তিমালায় টাওয়ার শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রাহক সেবার যে মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বর্তমানে অপারেটরদের গ্রাহকসেবার মানদণ্ডের চেয়েও কম।

অপারেটররা প্রতিটি হাব নেটওয়ার্ক সাইটে ৯৯.৯% সেবার গ্যারান্টি দিয়ে বিটিআরসি প্রস্তাব দিলেও বিটিআরসি তার মানদণ্ডে গড়ে ৯৯.৮% রাখছে।

অপারেটরা আপত্তি জানিয়ে বিটিআরসিকে বলেছে, একটি হাব সাইট থেকে শত বিটিএস নেটওয়ার্ক দেওয়া হয়। হাব সাইটের সেবা সব সময়ের জন্য চালু থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি। তাই বিটিআরসি গড়ে যে মানদণ্ডের কথা বলছে, তাতে কোনোভাবে হাব সাইট বন্ধ হলে এক সঙ্গে অনেক গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়বে।

মোবাইল ফোন অপারেটররা অভিযোগ করেন, দুর্যোগকালে বা কোনো নেটওয়ার্ক সাইটের বিদুৎ চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি ব্যাকআপ থাকে। ব্যাটারি শেষ হলে বিকল্প ব্যবস্থায় নেটওয়ার্ক সচল রেখে গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করা হয়।

কিন্তু বিটিআরসি যে সাধারণ চুক্তি করতে বলছে, সেখানে টাওয়ার শেয়ারিং প্রতিষ্ঠাগুলোর জন্য কোনো মানদণ্ড দেওয়া হয়নি। এর ফলে বিদ্যুতের কারণে কোনো নেটওয়ার্ক সাইট বন্ধ থাকলে তার দায়ভার নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকছে না টাওয়ার শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর।

গ্রামীণফোন এক বিবৃতিতে জানায়, টাওয়ার শেয়ারিং নীতিমালা অনুসারে তাদের এবং একটি টাওয়ার কোম্পানির সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট (এসএলএ) গত ১৪ জুলাই বিটিআরসির অনুমোদনের জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনও বিটিআরসি সাড়া দেয়নি।

“এর প্রেক্ষিতে আমাদের নতুনভাবে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ বন্ধ হয়ে আছে এবং যে কারণে আমাদের গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে আমাদের অতিসত্বর ২৭৯টি স্থানে জরুরিভিত্তিতে নতুন নেটওয়ার্ক সাইট বসানো প্রয়োজন।”

রবি আজিয়াটা লিমিটেড চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “টাওয়ার কোম্পানির সাথে অপারেটরদের সম্পূর্ণ চুক্তির খসড়া বিটিআরসি তৈরি করছে, যা অনভিপ্রেত। এর ফলে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষের রাজস্ব ও বিনিয়োগ স্বার্থ রক্ষিত হবে এবং মোবাইল অপারেটররা আরও ক্ষতির সম্মুখীন হবে।”

অ্যামটব বলছে, বাজার প্রতিযোগিতার কথা বিবেচনা করে টাওয়ার কোম্পানি ও মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত চুক্তি বা এসএলএ (সার্ভিস লেবেল এগ্রিমেন্ট) এবং বাণিজ্যিক বা কমার্শিয়াল চুক্তি দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

“কিন্তু আমরা দেখছি যে বিটিআরসি দুটো চুক্তিকে এক করে একটি খসড়া তৈরি করেছে এবং মোবাইল অপারেটরদের তা গ্রহণ করার জন্য বলছে। এটা করা হলে প্রতিযোগিতার পরিবেশ ব্যাহত হবে এবং গ্রাহকেরা মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন।

“কারণ গ্রাহক সেবার মান নিশ্চিত করার জন্য যে বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা দরকার সেগুলো চুক্তির খসড়ায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।”

বিটিআরসির সঙ্গে এনিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে অ্যামটব বলেছে, “আশা করছি যে শিগগিরই একটি সমাধানে পৌঁছতে পারব।”

বিটিআরসি চেয়ারম্যান জহুরুল হক এনিয়ে  বলেন, “বিষয়টি সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, খুব দ্রুত এ সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা করি।”