আল বাগদাদি : ধূম্রজালে ঘেরা এক জিহাদি নেতার উত্থান-পতন

মীর মোশাররফ হোসেন : ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুলের গ্র্যান্ড আল-নূরী মসজিদে ২০১৪ সালে বাগদাদি সিরিয়া ও ইরাকের দখলকৃত বিশাল অংশজুড়ে ‘খিলাফত’ ঘোষণা করেছিলেন। ছবি: রয়টার্স

ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুলের গ্র্যান্ড আল-নূরী মসজিদে ২০১৪ সালে বাগদাদি সিরিয়া ও ইরাকের দখলকৃত বিশাল অংশজুড়ে ‘খিলাফত’ ঘোষণা করেছিলেন। ছবি: রয়টার্স

ঘৃণা প্রচারক, নৃশংস বর্বরতার প্ররোচক ও উস্কানিদাতা, দীর্ঘদিন ধরে পলাতক, যাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল অসংখ্য ড্রোন, স্বঘোষিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার আগে-পরে যাকে মাত্র একবারই জনসম্মুখে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সেই শীর্ষনেতা আবু বকর আল বাগদাদির মৃত্যুর খবর এখন ভেসে বেড়াচ্ছে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে।

বছর তিনেক আগেও যে ‘মূর্তিমান আতঙ্ক’কে নিয়ে সারা বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো ব্যস্ত থাকতো রোববার তাকে নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে এমনটিই জানিয়েছে সিএনএন।

মার্কিন এ সংবাদমাধ্যমটি তাদের প্রতিবেদনে বাগদাদিকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ‘ইসলামের বিকৃতকারী’ হিসেব। বলা হচ্ছে, তার ‘দূষিত’ মতবাদ ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্মূলে এমন ভূমিকা রেখেছে ১৯৭০ এর পর বিশ্ব আর যা দেখেনি।

ইরাকি নাগরিক, কট্টর রক্ষণশীল ধর্মপ্রচারক বাগদাদি জঙ্গি বিদ্রোহী দলগুলোর কর্মকান্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন গত দশকের শুরুর দিক থেকে।

২০০৩ সালে মার্কিন অভিযানে সাদ্দাম হোসেন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইরাক ও এর আশপাশের দেশগুলোতে তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী।

আবু গারিব ও ক্যাম্প বুকাতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আটক থাকার সময়ই বাগদাদির দেখা হয় ভবিষ্যতে জিহাদি নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা অনেকের সঙ্গে।

ইরাকে ফিরে এসে যোগ দেন আল-কায়েদায়; জঙ্গি এ গোষ্ঠীটি যখন আরো অনেকের সঙ্গে মিলে গঠন করে ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক- বাগদাদির উত্থান তখন মধ্যগগনে।

২০১০ সালে মার্কিন-ইরাকি যৌথ অভিযানে ইসলামিক স্টেট অব ইরাকের শীর্ষ নেতার মৃত্যুর পর বাগদাদি সংগঠনটির শীর্ষ পদে আসীন হন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরাট অংশের ইরাক ত্যাগের সুযোগে জঙ্গি এ গোষ্ঠীটি বিস্তার লাভ করতে থাকে।

পার্শ্ববর্তী দেশ সিরিয়ায় চলা ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে সেখানকার কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাগদাদি ২০১৩ সালে তার সংগঠনের নাম বদলে রাখেন ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড আল শাম, সংক্ষেপে আইএসআইএস।

অল্প কিছুকালের মধ্যেই এ জঙ্গিগোষ্ঠীটি সিরিয়া ও ইরাকে অভাবনীয় সাফল্য পায়। ২০১৪ সালে ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুলের গ্র্যান্ড আল-নূরী মসজিদে বাগদাদি সিরিয়া ও ইরাকের দখলকৃত বিশাল অংশজুড়ে ‘খিলাফত’ ঘোষণা করেন। আগে-পরে জনসম্মুখে এটাকেই তার একমাত্র উপস্থিতি বলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

আনুষ্ঠানিকভাবে তখন থেকেই আইএস নামে পরিচিত বাগদাদির এই বাহিনী তার নিয়ন্ত্রিত অংশ ও আশপাশের অঞ্চলগুলোতে অকথ্য বর্বরতার নিদর্শন দেখানোর পাশাপাশি পশ্চিমা দেশগুলোতে সাধারণ মানুষের ওপর বেশ কয়েকটি বড় বড় হামলা চালিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আইএসের এমন উত্থানের আগে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল বাশার আল আসাদবিরোধী শিবিরের তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য আঞ্চলিক দেশ সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে।

বাগদাদীর খিলাফত ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র সে অবস্থান থেকে সরে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) দিকে হেলে পড়ে। প্রায় একই সময়ে রাশিয়াও ইরানের মতই আসাদ এর পাশে এসে দাঁড়ায়।

এরপর সিরিয়ার সরকারি বাহিনী এবং এসডিএফ আইএসবিরোধী পৃথক অভিযান শুরু করলে একটার পর একটা অঞ্চল বাগদাদির হাতছাড়া হতে থাকে।

এর প্রতিক্রিয়ায় আইএসের ‘স্লিপার সেল’ ও ‘লোন উলফ’রা ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রেও অন্তত তিনটি ‘ম্যাস কিলিংয়ের’ ঘটনায় হামলাকারীদের বাগদাদির প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইএসের মানচিত্র যতই সংকুচিত হয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী, রাশিয়া ও ইরানের মত শক্তিগুলোর বাগদাদিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা ততই বিস্তৃত হচ্ছিল। যদিও আইএসের খিলাফত গুঁড়িয়ে দেয়ার অনেক মাস পরেও বাগদাদি কোথায়, তা ছিল অজানা। তার অবস্থান ও ভাগ্য নিয়ে বেশ কয়েকবারই পরস্পর বিরোধী তথ্য পাওয়া গেলেও কখনোই সেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বেশিরভাগ প্রতিবেদনেই তার সঙ্গে কথিত জাজিরা অঞ্চলের যোগসাজশের গুঞ্জন থাকলেও, পরে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স ওই এলাকার দখল নেয় তখনো বাগদাদির দেখা পাওয়া যায়নি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রুশ ভাইস এডমিরাল ইগর কস্তিওকভ বাগদাদির অবস্থান অজানা বলে বার্তা সংস্থা তাসকে জানিয়েছিলেন। সিরিয়ার আর যেখানেই থাকুক না কেন, ইদলিবে আইএসপ্রধান নেই বলেও জোর দিয়ে বলেছিলেন তিনি। যদিও শনিবার থেকে মার্কিন গণমাধ্যমে বাগদাদির নিহত হবার খবরে ওই অঞ্চলে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে।

ইদলিবে ঘাঁটি ছিল মূলত আইএসের প্রতিদ্বন্ধী হায়াত তাহরির আল শামের। আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট নুসরা ফ্রন্টের সঙ্গে যোগসাজশ থাকা এ গোষ্ঠীটির প্রধান ছিলেন বাগদাদিরই একসময়কার সহযোগী আবু মোহাম্মদ আল জোলানি।

জোলানির আইএসআইএসে যোগ দিতে অস্বীকার করার ঘটনা ওই অঞ্চলের সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি করেছিল।

বাগদাদি ১৯৭১ সালে ইরাকের সামারায় জন্মগ্রহণ করেন বলে জিহাদি ওয়েবসাইট অন্যান্য সূত্রগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী জানিয়েছে সিএনএন।

বাগদাদের ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে ইসলামী সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে উচ্চতর অধ্যয়ন শেষে তিনি সামারার একটি মসজিদে ধর্মের বয়ান ও প্রচারকাজ শুরু করেন।

এক জিহাদী ওয়েবসাইটে তার পুরো নাম লেখা হয়েছে ‘ইব্রাহিম বিন আওয়াদ দিন ইব্রাহিম আল বদ্রি আল রাধোই আল হুসেইন আল সামারাই’।

২০০৪ সালে ইরাকে মার্কিনবাহিনী বিরোধী সুন্নি বিদ্রোহের সময় আটক হন তিনি। ২০০৯ পর্যন্ত তিনি মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন বলে বেশকিছু প্রতিবেদনে ধারণা দেয়া হয়েছে। মার্কিন বন্দিশিবিরে তার নাম ছিল ইব্রাহিম আওয়াদ ইব্রাহিম আল বদ্রি।

২০১৪ সালে মসুলে ওই উপস্থিতির পর বাগদাদিকে আর কখনোই দৃশ্যপটে দেখা যায়নি। পরের বছর এক প্রতিবেদনে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে এআইএস প্রধান গুরুতর আহত হয়ে শয্যাশায়ী বলে খবর বেরোয়।

২০১৭ সালে ফের তার আহত হওয়ার খবর ছড়ায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। ২০১৮ সালে ইরাক ও সিরিয়ার বেশিরভাগ অংশ হাতছাড়া হওয়া আইএস বাগদাদির একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ করে। ওই রেকর্ডে এ জঙ্গীনেতাকে তার বাহিনীর পিছুহটার কথা স্বীকার করতে শোনা যায়। বক্তব্যে বাগদাদি ধারাবাহিক পরাজয়কে ‘আল্লাহর পরীক্ষা’ অভিহিত করে যোদ্ধাদের দৃঢ় মনোবলে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান।

চলতি বছর আইএস ‘বাগদাদির একটি ভিডিও’ প্রকাশ করে। ওই ভিডিওতে নিজেকে বাগদাদি দাবি করা এক ব্যাক্তিকে শ্রীলঙ্কায় ইস্টার উৎসবে বোমা হামলাসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। শশ্রুমন্ডিত, সাদাসিধে পোশাক পরা ওই ব্যক্তির পাশে ছিল একটি অ্যাসল্ট রাইফেল।