ভোলায় সহিংসতা : আতঙ্কে সেই শুভর পরিবার

মাসুম বিল্লাহ, ভোলা থেকে ফিরে : ভোলার বোরহানউদ্দিনে যার ফেইসবুক ’হ্যাক করে’ মেসেঞ্জারে কথিত ধর্ম অবমাননাকর বক্তব্য ছড়ানো হয়েছিল, সেই বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য শুভর পরিবারের সদস্যরা পুলিশ প্রহরার মধ্যেও আতঙ্কে আছেন।

তারা বলছেন, শুভর আইডি যে সত্যিই হ্যাকড হয়েছিল, সে কথা পুলিশও বলছে। কিন্তু তারপরও তাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। শুভর ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে তারা আশ্বস্ত হতে পারছেন না।

শুভর চাচা প্রদীপ বৈদ্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের চারপাশে মুসলিম বাড়ি, তার মধ্যে আমরা পাঁচটা হিন্দু পরিবার থাকি। এখনতো পুলিশ পাহারা আছে, তারা গেলে এই পরিবারগুলোর কী হবে একবার চিন্তা করে দেখেন।”

প্রদীপ জানান, ঘটনার পর থেকে শুভর বাবা-মা মুখে খাবার তুলতে পারছেন না। শুভর মা প্রায়ই মূর্ছা যাচ্ছেন।

বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্যদের বাড়ি বোরহানউদ্দিন উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে। বাবা চন্দ্র মোহন বৈদ্য একজন কৃষক, মা বাসন্তী রানী বৈদ্য গৃহিনী। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে শুভ সবার ছোট।

গত ১৮ অক্টোবর রাতে বোরহানউদ্দিন থানায় গিয়ে শুভ জানান, তার ফেইসবুক আইডি হ্যাকারের কবলে পড়েছে। তার করা জিডির ভিত্তিতে তদন্তে নেমে পুলিশ দেখতে পায়, ওই আইডি থেকে মেসেঞ্জারে ‘ধর্ম অবমাননাকর’ বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে। আর সেই বক্তব্যের ‘স্ক্রিনশট’ ফেইসবুকে ছড়িয়ে তৈরি করা হয়েছে উত্তেজনা।

এরপর রোববার শুভর বিচারের দাবিতে বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ ময়দানে ‘মুসলিম তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে চারজন নিহত এবং শতাধিক আহত হন।

২০১০ সালে মাধ্যমিক ও ২০১২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শুভ চলতি বছর ভোলা সদরের নাজিউর রহমান ডিগ্রি কলেজ থেকে ডিগ্রি (পাস কোর্স) পরীক্ষা দিয়েছেন।

গত ১৮ অক্টোবর শুভর ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে যখন ‘অবমাননাকর বক্তব্য’ ছড়ানো হচ্ছিল, তখন তার সঙ্গেই ছিলেন চাচা প্রদীপ বৈদ্য।

তিনি বলেন, “বাইরের কাজ শেষ করে এসে আমার ঘুমাইছিলাম। ঘুম থেকে ওঠার পর বিপ্লবের কাছে একটি ফোন আসে। ওর কাছে জানতে চায়, সে এ ধরনের কথাবার্তা কেন ছড়াচ্ছে। বিপ্লব বলে, ‘আমার ফোনের নেট বন্ধ। কীসে কী হচ্ছে হচ্ছে জানি না তো’। এরপর আমরা বাজারের দিকে যাই।”

সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বোরহানউদ্দিন বাজারের দিকে যাওয়ার পথে কয়েকজন থামিয়ে একই ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বলে জানান শুভর চাচা।

”তারা বলে, বিপ্লব তোমার ফেইসবুকে নবীকে নিয়ে এসব কি লেখতেছ? সে তাদেরকে দেখায়, ‘দেখেন আমার নেট বন্ধ।‘ সেই সময়ও তার আইডি থেকে একজনের নম্বরে টেক্সট আসছিল। তখন ওদেরই একজন পুলিশের সাহায্য নিতে বলে। আমরা থানায় জিডি করতে যাই।”

বোরহানউদ্দিন থানায় কথা বলে আসার পর জয়দেবপুর থানার ওসির নাম করে শুভর কাছে একটি ফোন আসে বলে জানান প্রদীপ বৈদ্য।

”ওই লোক বলে, তোমার আইডি হ্যাক হইছে। দুই হাজার টাকা দিলে উদ্ধার করে দিব। তখন আমরা আবার থানায় যাই। এ সময় বাইরে লোকজন জড়ো হয়ে যায়।”

এরপর থানায় গিয়ে শুভ এবং তিনি আটক ছিলেন বলে জানান প্রদীপ। ১৯ অক্টোবর তিনি ছাড়া পেলেও শুভকে পরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

শুভর চাচাতো ভাই পবিত্র বৈদ্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিলে মাছ ধরে আর বাগানের সুপারি বিক্রি করে সংসার চলে তাদের। বাবার সঙ্গে সেই কাজে সহায়তা করেন শুভ।

বোরহানউদ্দিন থানার ওসি ম. এনামুল হক বলেন, ”বিপ্লবের পরিবারের নিরাপত্তায় তার বাড়িতে পুলিশ পাহারা রয়েছে। যতদিন প্রয়োজন পুলিশ তাদের এই নিরাপত্তা দেওয়া হবে।”

ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর ঘটনায় শুভসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭-৮ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছে পুলিশ।

ওই হামলায় গ্রেপ্তার শুভসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের পুলিশ রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।