মাগুরায় ঐতিহ্যবাহী কাত্যায়নী উৎসব শুরু

এস আলম তুহিন,মাগুরা :শনিবার ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে মাগুরায় ঐতিহ্যবাহী কাত্যায়নী উৎসব শুরু হয়েছে । চলবে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রতি বছর ৫ দিনব্যাপী উৎসব হয়ে থাকে কিন্তু এবার আয়োজকরা ১ দিন বাড়িয়েছেন। তাই পূজা চলবে ৬ দিনব্যাপী। অর্থাৎ অষ্টমী হবে দুই দিনব্যাপী। সোমবার ও মঙ্গলবার দুইদিন অষ্টমী। বুধবার নবমী এবং বৃহস্পতিবার দশমীর মধ্য দিয়ে এ ঐতিহ্যবাহী পূজা শেষ হবে। তবে পূজা উপলক্ষে মেলা চলবে আরো এক মাস। প্রতিবছর কাত্যায়নী পূজাকে কেন্দ্র করে মাগুরায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। অন্যান্য বারের তুলনায় এবার আরো বেশি মাত্রায় লোক সমাগম ঘটবে বলে আয়োজকরা মনে করছেন। বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র মাগুরা জেলাতেই উৎসব উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এ পূজা হয়ে থাকে। সার্বজনীন এ পূজা উপলক্ষে মাগুরায় ব্যাপক আনন্দ উৎসবের সৃষ্টি হয়েছে। নির্মান করা হয়েছে বিশাল ইলেকট্রিক দৃষ্টি নন্দন তোরণ। প্রতিটি মন্দিরের প্রবেশ পথের রাস্তায় সাজানো হয় দৃষ্টিনন্দন আলোক। প্রতিটি পূজা কমিটির মধ্যে চলছে বৈচিত্রময় মণ্ডপ তৈরি ও আলোক সজ্জার প্রতিযোগিতা।
জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাসুদেব কুন্ডু জানান, জেলায় এ বছর মোট ৮৯টি মন্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে পূজার মূল আকর্ষন থাকবে পৌরসভার ১৫টি মণ্ডপকে ঘিরে। তাছাড়া সদরে ৩১টি,শালিখায় ১০টি,শ্রীপুরে ১৪টি ও মহম্মদপুরে ৯টি মণ্ডপে ক্যায়াতানী পূজা হবে । মন্ডপ ও শহরকে সাজানো হয়েছে বর্ণিল সাজে। পূজা উৎসবকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
আবার কোনো কোনো মন্দিরের গেট প্যান্ডেলে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের চিত্র। আবার কোনো মন্দিরে মা ক্যাত্যায়নী ঐতিহ্যবাহী ঠেলাগাড়িতে করে পুত্র-কন্যাদের নিয়ে কলকাতা শহর ঘুরে দেখছেন। এমনই সব চিত্র এবারের পূজায় উঠে এসেছে।
সারাবিশ্বে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গাপূজা সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলেও মাগুরায় এর ব্যতিক্রম । মাগুরা জেলায় এ ধর্মেও অনুসারিদের কাছে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে ক্যাত্যানয়ী পূজাই সবচেয়ে বড় উৎসব। তবে এ পূজার মূল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় হিন্দু ধর্মের মানুষেরা অংশ নিলেও এর উৎসবে যোগ দেন সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ। শুধু জেলাবাসী নয়, সারাদেশ এমনকি আশপাশের অনেক দেশ থেকেও দর্শণার্থীরা আসেন মাগুরায় ক্যাত্যায়নী পূজা দেখতে।
শহরতলীর নতুন বাজারের সাহা পাড়া, ছানা বাবুর বটতলা, নিজনান্দুয়ালী নিতাই গৌর গোপাল মন্দির, জামরুলতলা মন্দির সাতদোয়া ও পারনান্দুয়ালী মন্দিরে এ পূজা হয় জমজমাট।
অন্যদিকে, পূজার পাশাপাশি শুরু হয়েছে মেলা। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ব্যবসায়ীরা তাদের পরসা সাজিয়ে বসেছেন। যা চলবে পূজা শেষ হবার পরও মাসাধিকাল । মেলায় কাঠের ফার্নিচার ,হাড়ি-পাতিল, তৈরি পোশাক, চিনামাটির জিনিসপত্র, কসকেটিক্স, বাচ্চাদের খেলনা, সামদ্রিক শামুক-ঝিনুকের গহনা, শো-পিস থেকে শুরু করে নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র বিকিকিনি হচ্ছে।
পাশাপাশি সার্বজনীন রূপ নেয়া ক্যাতায়নী পূজা উপলক্ষে জেলার প্রতিটি মানুষ উৎসবে মেতে উঠেছে। পূজাকে ঘিরে জেলা পুলিশ প্রশাসন প্রতিটি পূজামণ্ডপ এলাকায় ও শহরের রাস্তাঘাটে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। পাশাপাশি র‌্যাব ও ডিবি পুলিশের টহল চলছে নিয়মিত। এ পূজার আনন্দ নিতে জেলার উপজেলা থেকে বিভিন্ন মানুষ ভিড় করছেন তাদের স্বজনদের বাড়িতে। তাছাড়া পার্শ্ববর্তী জেলা যশোর, ফরিদপুর, নড়াইল, ঝিনাইদহ, কালিগঞ্জ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, বাজবাড়ি জেলার আগত দর্শণার্থী ভিড় করে এ উৎসবে। দেশের দশনার্থী ছাড়াও ভারত, নেপাল থেকে অসংখ্য মানুষ আসে এ পূজায়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম জানান, ক্যাত্যায়নী পূজা মাগুরা জেলার ঐতিহ্য। এ পূজা দেখতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে মাগুরাতে। যে কারণে পূজার সার্বিক নিরাপত্তায় শুধু মাগুরা নয়, আশপাশের একাধিক জেলা থেকে আসা অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স কাজ করে। এ ছাড়া সাদা পোশাকের পুলিশ, আনসার ভিডিপি ও স্ব স্ব পূজা কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া একই সাথে প্রতিটি মান্দিরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে কন্টোল রুমের মাধ্যমে আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
পূজারীরা জানান. দাপর যুগে কোনো এক হেমন্তের শুরুতে যমুনা নদীর তীরে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের আগে গোপবালাবৃন্দ কাত্যায়নী দেবীর মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণকে ঈশ্বর, বন্ধু,স্বামী, পুত্র হিসেবে আরাধনা করত। তাদের এক মাসব্যাপী আরাধনা সে সময় কাত্যায়নী পূজা হিসেবে চিহ্নিত হতো। তারই অনুকরণে ১৯৫০ সালের দিকে মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালী এলাকায় প্রথম জাকজমকপূর্ণ ভাবে এ পূজা শুরু হয়।
মাগুরা পারনান্দুয়ালী গ্রামের জেলে পাড়ায় ধনাঢ্য সতিশ মাঝির বাড়িতে বৃহদাকারে এ কাত্যায়নী পূজার উৎসব শুরু হয়। এরপর মাগুরা জেলাতে বিপুল উৎসাহ উদ্দিপনার মধ্যে দিয়ে গত দুই যুগ ধরে এর প্রসার লাভ করে।