দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় প্রস্তুতি, আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ

স্পন্দন ডেস্ক :
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়। মানুষজন আশ্রয় কেন্দ্রে গেছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
শরণখোলা (বাগেরহাট) : শরণখোলায় মানুষের মাঝে আতঙ্ক দেখা দেয়। উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নে ৮ হাজারের বেশি মানুষ ভেড়িবাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সাউথখালী ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন জানান, তার ইউনিয়নের রায়েন্দা, গাবতলা, উত্তর সাউথখালী, দক্ষিণ সাউথখালী, বগী ও শরণখোলা গ্রামের ৮ সহ¯্রাধিক মানুষ ভেড়িবাঁধ ভাঙ্গনের ঝুঁকিতে রয়েছেন। সাউথখালী ইউনিয়নে বলেশ্বর নদের প্রায় ৩ কিলোমিটার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। যা জলোচ্ছ্বাসের তোড়ে ভেঙে এলাকা প্লাবিত হতে পারে বলে তিনি জানান। সাউথখালীর বগী এলাকার মানুষ সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে।
শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরদার মোস্তফা শাহীন বলেন, ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ইতিমধ্যে ইউনিয়ন ও উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মিটিং করে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনাসহ উপজেলার ৯৭ টি আশ্রয় কেন্দ্র খুলে দেয়া হয়।
আশাশুনি (সাতক্ষীরা) : জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রক্ষার্থে আশাশুনি উপজেলার সকল এলাকায় ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ইতিমধ্যে আশ্রয় শিবির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩০ সহ¯্রাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির বিশেষ সভা করে সকল প্রস্তুতি হাতে নিয়েছেন। উপজেলার ১১ ইউনিয়নে ২৭ টি সাইক্লোন শেল্টার এবং ৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয় কেন্দ্র ঘোষণা করে সেখানে হুমকি প্রবণ এলাকার মানুষকে নিয়ে আসার কাজ চালানো হচ্ছে। প্রতাপনগর, শ্রীউলা, আশাশুনি, আনুলিয়া, খাজরা, বুধহাটাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের পাউবো’র বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা ৫ টা) এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ১০ সহ¯্রাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, সিপিপি সদস্য ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ঘূর্ণিঝড়ের বিষয় নিয়ে সতর্কতামূলক প্রচার ও মাইকিং করা হচ্ছে। বিভিন্ন মসজিদ থেকেও মাইকে এতদসংক্রান্ত প্রচার দেওয়া হচ্ছে। সিপিপির ১৫১২ জন স্বেচ্ছাসেবক মাঠে নেমেছেন। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহাগ খান জানান, আশ্রয় কেন্দ্রে সরবরাহের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক ভাবে ৬০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, শিশুর খাবারের জন্য ২০ হাজার টাকা, গোখাদ্যের জন্য ২০ হাজার টাকা, ত্রাণ বাবদ ৩৭ মেঃ টন চাল এবং নগদ ত্রাণ সহায়তার জন্য ৯০ হাজার টাকা উপজেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। এলাকার নদীর পানি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ বেড়েছে এবং থেমে থেমে বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা জানান, ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে মানুষের জানমালের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবেলায় সকল প্রকার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষকে নিয়ে আসার জোর তৎপরতা চালান হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতার প্রস্তুতি রয়েছে।
তালা (সাতক্ষীরা) : তালা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্র¯ুÍতি গ্রহণ করে। ইতিমধ্যে খোলা হয়েছে ৯৫টি আশ্রয় কেন্দ্র। এছাড়াও প্রস্তুত রাখা হয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্য।
তালা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান জানান, উপজেলায় গ্রামে গ্রামে মানুষের মাঝে সতর্কতা জারি করা হয়। ৯৫ টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়। যেকোনো প্রয়োজনে তালা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ০১৮১৬-৩২৫৮৪২,০১৭১২-১০০৬৮০ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। এদিকে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে শনিবার উপজেলা এলাকায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল।
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট): ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাত থেকে রক্ষায় ব্যপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে মোরেলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শনিবার সকাল থেকে সাধারণ মানুষদেরকে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে প্রতিটা ইউনিয়নে চলছে মাইকিং।
উপজেলার ১৬ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় রয়েছে ৮৩ টি সাইক্লোন সেল্টার। যার ধারণ ক্ষমতা প্রায় ১ লাখ। গণসচেতনতার জন্য প্রত্যেক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান, মেম্বর, স্কাউট, গ্রাম পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা কাজ করছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে প্রতিটা সেল্টারে আশ্রয় প্রার্থীদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শনিবার বিকেল ৪ টা নাগাদ সাইক্লোন সেল্টারে প্রায় ২০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধি, নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশি বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার মো. নাসির উদ্দিন।
উপজেলার চিংড়াখালী ইউপি চেয়ারম্যন মো. আলি আক্কাস বুলু জানান, তার ইউনিয়নে ৮ টি সাইক্লোন সেল্টার রযেছে। প্রতিটা সেল্টারে কম বেশি করে অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। তিনি বলেন আশ্রয় প্রার্থীদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ইউএনও মো. কামরুজ্জামান বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল মোকাবেলায় এবং ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষায় সকল ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আমি নিজে মনিটরিং করছি। থানার ওসি কেএম আজিজুল ইসলাম বলেন, আমরা মাইকিং করে মানুষজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছি যাতে তারা সাইক্লোন সেল্টারে আশ্রয় নেন।
কয়রা (খুলনা) : খুলনার সুন্দরবন উপকুলীয় জনপদ কয়রায় ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। শনিবার বেলা ১১ টায় উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কমিটির সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিমুল কুমার সাহা। সভায় উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানবৃন্দ, সাংবাদিক, বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, থানা অফিসার ইনচার্জ, এনজিও কর্মী, সিপিপি কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় করণীয় বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। জনসাধারণকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদে পৌঁছাতে জনপ্রতিনিধিসহ সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করার তাগিদ প্রদান করা হয়। ঘুর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় জনসাধারণকে সতর্ক থাকতে এলাকায় মাইকিং করা অব্যাহত ছিল। সভায় উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের ১১৬ টি সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয়গ্রহণকারী লোকজনের রাতে শুকনা খাবার চিড়া, মুড়ি ও গুড় বিতরনের সিদ্ধান্ত হয়। মেডিকেল টিমের সদস্যদের জনসাধারণের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ জাফর রানা বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহন করা হয়েছে। উপজেলা সিপিপির টিম লিডার ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্যাহ আল মামুন লাভলু জানান, সাধারণ মানুষের আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ইউনিটে তাদের সদস্যরা কাজ করছে।
খুবি : উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামানের নির্দেশনায় ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় প্রাক-প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগোত্তর সেবা প্রদানের বিষয় নিয়ে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ট্রেজারার প্রফেসর সাধন রঞ্জন ঘোষ। সভায় আলোচনা শেষে আসন্ন অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সম্ভাব্য দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে সতর্কতার সাথে নিরাপদে থাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পরামর্শের বিষয়টি অবহিত করা হয়। এছাড়া স্বাস্থ্য সেবার জন্য আজ সন্ধ্যার আগে থেকে আগামীকাল সকাল পর্যন্ত জরুরী মেডিকেল সেবার জন্য খানজাহান আলী হলে গেস্ট রুমে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সেখানে অ্যাম্বুলেন্সসহ প্রয়োজনীয় সার্ভিস প্রস্তুত রাখা হবে। আবাসিক হলগুলোতে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের দুর্যোগকালীন সতর্কতার মধ্যে থাকা এবং প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, পানীয়জল, মোমবাতি, চার্জার রাখার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়। দুর্যোগোত্তর পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল বিভাগ এবং এস্টেট শাখাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহনপুলকে আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় যানবাহন তৈরি থাকা এবং ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে যানবাহন নিরাপদে রাখার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়। এদিকে আসন্ন ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে জানমাল রক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ ও মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়। সভায় রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর খান গোলাম কুদ্দুসসহ ছাত্রবিষয়ক পরিচালক, প্রভোস্টবৃন্দ, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধান ও শাখা প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ জরুরি প্রয়োজনে নি¤েœাক্ত মোবাইল নম্বরসমূহে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। নম্বরগুলো হলো ০১৭১১-৪৮২৬৫৬ (রেজিস্ট্রার), ০১৭১৮-০৭৯৬১৬ (ছাত্রবিষয়ক পরিচালক), জরুরী মেডিকেল সেবায় ০১৭১৫-৬৩৪৩৭৩ চীফ মেডিকেল অফিসার (চলতি দায়িত্ব), ০১৭১১-৯৬৫২৫৪ (ভারপ্রাপ্ত পরিচালক, জঃপ্রঃ), ০১৭১৮-৭৪৮০৪২ (পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, চলতি দায়িত্ব) ০১৭১১-৩৪৩০০৪ (নিরাপত্তা তত্ত্বাবধায়ক), জরুরী মেডিকেল সেবায় ০১৭১৮-৬১১৩৭৪, ০১৯২০-৫১৪৬৪৮।