ভোলার তৌহিদী জনতা: আবেগী ধর্মপ্রাণ, না বিভ্রান্ত সাম্প্রদায়িক ?

এক.

‘তৌহিদ’ শব্দের মানে হচ্ছে ‘আল্লাহর একত্ব’। ‘তৌহিদ’ থেকে এসেছে ‘তৌহিদী’। এর অর্থ হল যিনি আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করেন। তৌহিদ হলো ইসলামের কেন্দ্রীয়, মৌলিক বিশ্বাস। এ বিশ্বাসকে ভিত্তি ধরে মুসলমানদের ধর্ম সংক্রান্ত অন্যান্য বিশ্বাস, ধর্মীয় চর্চা এবং জীবনাচারণ গড়ে উঠেছে। যিনি তৌহিদে বিশ্বাস করেন না, তিনি মুসলিম নন। অর্থাৎ, পৃথিবীর সমস্ত মুসলিমই হচ্ছেন তৌহিদী।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুধু ভোলার নন, দলমত নির্বিশেষে দেশের ৯০ ভাগ জনতাই হলেন তৌহিদী জনতা। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, মুসলিম প্রধান একটি দেশে ভোলার কিছু বিক্ষোভরত মানুষকে আলাদা করে তৌহিদী জনতা বলবার কারণ কী? এ বিষয়টা বুঝতে পারলেই, বাংলাদেশের মত দেশে ‘ইসলামপন্থী’ দলগুলির রাজনীতির গতি প্রকৃতি বোঝাটা সহজ হবে।

বাংলাদেশের বাম এবং ‘ইসলামপন্থি’দের অনেকগুলি মিলের একটি হল জনগণের পরিচিত পরিভাষা বাদ দিয়ে বিদেশি অথবা অপরিচিত পরিভাষা ব্যবহার করে রাজনীতি করা। এ কারণে বাম এবং ‘ইসলামপন্থিরা’ এ দেশের জনগণের বৃহত্তম অংশের জনসমর্থন কখনো পায়নি।

বামপন্থিরা ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায় ব্যবহৃত কমিউনিস্ট পরিভাষাগুলোকে বাংলাতে তর্জমা না করে হুবহু সেগুলি ব্যবহার করেন, যা তাদের দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই বুঝতে পারেন না, সাধারণ জনগণ তো দূরের কথা। ‘ইসলামপন্থি’দের তেমনি আরবি এবং উর্দু পরিভাষার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ। সেটা আমজনতা বুঝতে পারলেন কি পারলেন না, সেটা নিয়ে তাদের কোনও আগ্রহ নেই।

দুই.

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা যারা বলেন তারা প্রকারন্তরে এটা স্বীকার করে নেন যে, বাংলাদেশে হিন্দু এবং ইসলাম ধর্মকে কেন্দ্র করে দুটি আলাদা সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে, এবং এ দুটি সম্প্রদায়ের মাঝে সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। নিজেদের তারা সেক্যুলার, বাম ইত্যাদি পরিচয় দিলেও মননগতভাবে তারা জিন্নাহ সমর্থিত (উদ্ভাবিত নয়) ‘দুই জাতি’ তত্ত্বের অনুসারী। এ তত্ত্বের মূল কথা হলো হিন্দু এবং মুসলমান দুটো আলাদা জাতি। অর্থাৎ, ধর্ম হলো জাতি গঠনের মূল ভিত্তি।

‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির’ কথা যারা বলেন, তারা রাজনৈতিক কারণে জিন্নাহ সমর্থিত তত্ত্বের বিরোধিতা করলেও, হিন্দু-মুসলমান একই ভাষা, সংস্কৃতি, আবহে পাশাপাশি বাস করলেও তাদেরকে দুটো আলাদা সম্প্রদায় ভাবেন। মননগতভাবে জিন্নাহবাদী হবার কারণে ‘দুই জাতি’ তত্ত্বের অবনমন ঘটিয়ে তারা ‘দুই সম্প্রদায়’ তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, যাদের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখাটা জরুরি।

ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখেও যে সম্প্রদায় গঠন করা যায়, এটা তারা মনে করেন না। জিন্নাহর মতই তারা মনে করেন হিন্দু এবং মুসলমান দুটো আলাদা সম্প্রদায়ের মানুষ। বস্তুত, এর মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হবার পঞ্চাশ বছর পরেও, জিন্নাহর ধর্মীয় বিভাজন তত্ত্বের কতটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব এ জনপদে রয়ে গেছে এটা বোঝা যায়। তাই ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখবার কথা না শুনে, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, সব মহল থেকে আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা শুনতে হয়।

তিন.

গুজরাটি ইসমাইলি শিয়া পরিবারে জন্ম নেয়া মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ব্যক্তি জীবনে মননে, আচরণে, চর্চায় ছিলেন সেক্যুলার এবং পাশ্চাত্যের জীবন বোধে বিশ্বাসী। সেই তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নিপুণভাবে ধর্মকে ব্যবহার করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি জনগোষ্ঠীর আস্থাভাজনে পরিণত হন। এ বিষয়টা প্রখ্যাত আলেম, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি এবং বিশ্বে ‘ইসলামপন্থি’ রাজনীতির অন্যতম জন্মদাতা, সাইয়্যেদ আবুল আলা মুওদুদীকে হতবাক করে। তারা কেউই মুসলিম লীগকে ইসলামিক দল মনে করতেন না এবং তারা সেটা ছিলও না।

পাকিস্তানকে ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ বানাবার লক্ষ্য জিন্নাহর ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানে বসবাসকারী সব ধর্মের জনগণের অংশগ্রহণ এবং নারীপুরুষের সম-অধিকারের ভিত্তিতে পাশ্চাত্যের মত একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানকে গড়ে তুলতে। এ ক্ষেত্রে তার আদর্শ ছিল কামাল আতাতুর্ক। কিন্তু ততদিনে ঝিলাম, চেনাব নদীর উপর দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে।

মওদুদীসহ ‘ইসলামপন্থি’রা এ উপলব্ধিতে আসেন যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন এবং ব্যক্তি জীবনে প্রচণ্ড সেক্যুলার হয়েও জিন্নাহ কেবল ইসলামকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে পুরো উপমহাদেশের মুসলমানদের আন্দোলিত করতে পেরেছেন। তাহলে তারা যারা দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের চর্চা করেন, মুসলিম প্রধান পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

বস্তুত, এ চিন্তাধারা মাথা রেখেই তারা পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হন। ফলে, ধর্মকে ব্যবহার করে নানাভাবে রাষ্ট্রের উপর চাপ সৃষ্টি করে পাকিস্তানকে ‘ইসলামিক’ রাষ্ট্র ঘোষণাসহ নানাবিধ দাবি দাওয়া আদায়ে সক্ষম হন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ‘ইসলামপন্থি’রা ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে উৎসাহিত হয়ে উঠেন, যে ধারা সময়ের সাথে সাথে আরো শক্তিশালী হয়েছে।

চার.
পাশ্চাত্যের সাথে বাংলাদেশের মত মুসলিম প্রধান অনুন্নত বিশ্বের সমাজ কাঠামোর মৌলিক তফাৎ রয়েছে। বর্তমানের পাশ্চাত্য দীর্ঘ সমাজ ও ধর্ম সংস্কার আন্দোলন, এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের উত্তরাধিকার। এ ধরনের সমাজগুলোতে বাক এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার সাংবিধানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি যেকোনও বিষয়ে মত প্রকাশের বা সমালোচনা করবার একটা দীর্ঘ ট্রাডিশন গড়ে উঠেছে।

ইউরোপ, আমেরিকাতে খ্রিস্টান ধর্ম এবং যীশু খ্রিস্ট নিয়ে নানা ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ, ঠাট্টা, তামাশা ইত্যাদি করা হলেও এসব যারা করেন, তা তাদের ব্যক্তিগত মতামত হিসাবেই ধরে নেয়া হয়। ফলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই যীশুকে নিয়ে সমালোচনামূলক বা ব্যাঙ্গাত্মক চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং গ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। এমনকি, যীশু বা মাতা মেরীকে নিয়ে পর্নোগ্রাফিক কার্টুনও এ সমস্ত সমাজে বিদ্যমান। তাহলে প্রশ্ন হলো, এসবের ফলে, সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধার্মিক জনগোষ্ঠী কী মানসিকভাবে আহত হন না? এসব কী তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে না?

এক কথায় এর উত্তর হল হ্যাঁ; তাঁরাও আহত হন। অনেকে রাগান্বিতও হন। অনেকে বিষয়টাকে আগ্রাহ্য করেন, কেউ হেসে উড়িয়ে দেন। আবার অনেকে এসব বিষয়ে মনোযোগও দেন না। কিন্তু যারা আহত বা ক্রুদ্ধ হন তারা রাস্তায় নেমে প্রতিক্রিয়া দেখান না কেন? কেনই বা তারা যারা এসব করছে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেন না? তাদেরকে আক্রমণ বা হত্যা করেন না? অন্তত এটা কেন বলেন না, তাদের এসব করার অধিকার নেই?

এর মূল কারণ বুঝতে হলে, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী সমাজের মূল বৈশিষ্ট্য বুঝতে হবে। এর মূল কথা হলো ব্যক্তির অপরাধ বা পাপের দায় ভাগ শুধু সেই ব্যক্তির। ব্যক্তি ইহজাগতিক অপরাধ করলে শুধু সেই ব্যক্তিই রাষ্ট্রীয় শাস্তি পাবেন, তার জন্য তার পুরো সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না। আবার পারলৌকিক বিষয়ে পাপ বা অন্যায় করলে, তার শাস্তি পরকালে হবে। এটা নিয়ে সমাজের ভাবনার কিছু নেই।

কিছু ব্যক্তির ভাবনা চিন্তার জন্য খ্রিস্টান ধর্মের মত বিশাল প্রতিষ্ঠানের কোন ক্ষতি হবে না। বস্তুত, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী ভাবনার সমাজে শক্তিশালী অবস্থানের ফলে পশ্চিমের জনগণ তাদের ধর্ম নিয়ে সমালোচনার কোন উগ্র প্রতিক্রিয়া দেখায় না।

পাঁচ.

ইতিহাস, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতির তফাৎকে ধর্তব্যে না ধরে অনেকে পশ্চিমের উদাহারণ দিয়ে বাংলাদেশের মত দেশে ইসলাম নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে কেন মুসলিমরা অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়া দেখায় ভেবে বিস্মিত হন। এ ধরনের সরল প্রতিক্রিয়া যারা দেখান, তারা পশ্চিমের সাথে বাংলাদেশের মত তুলনামূলক বিচারে অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত মুসলিম প্রধান দেশগুলির মৌলিক পার্থক্যের জায়গাটা বুঝতে পারেন না।

আজকের পাশ্চাত্যের সমাজ যেখানে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী, সেখানে বাংলাদশের সমাজ কাঠামো হলো সামস্টিক সমাজবাদী। এ ধরনের ব্যবস্থায় ব্যক্তির চেয়ে সমাজের স্বার্থ মুখ্য। সমাজের জন্য ব্যক্তি, ব্যক্তির জন্য সমাজ নয়। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের চিন্তাধারার বাইরে ভিন্নভাবে চিন্তা করবার অবকাশ খুবই কম। সমাজের সামষ্টিক কল্যাণ, অকল্যাণ, ভালো, মন্দকে ব্যক্তির ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, চিন্তা চেতনা, জীবনাচারণ, জীবনবোধের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পাশ্চাত্যে এক সময় সমাজ যখন সামস্টিক সমাজবাদী ছিল, তখন খ্রিস্টধর্মের সমালোচনা করতে পারাতো দূরের কথা, এমনকি বিজ্ঞানের তত্ত্ব, সূত্র নিয়ে যারা কাজ করতেন, তাদেরকেও কঠিন পরিণতি বরণ করতে হত, এ যুক্তিতে যে, এ সমস্ত তত্ত্ব, সূত্র খ্রিস্টধর্মের মূল চেতনার পরিপন্থী।

অর্থাৎ, আজকের বাংলাদেশের সমাজ থেকে পাশ্চাত্যের সমাজ তখন অনেক বেশি রক্ষণশীল এবং কঠোর ছিল।

বাংলাদেশসহ পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ ব্যবস্থা কখনোই পাশ্চাত্যের মত এত রক্ষণশীল এবং রূঢ় ছিল না। কিন্তু সমাজ বিবর্তনের সাথে সাথে উদার ভাবনার রাজনৈতিক আন্দোলন এবং বিকশিত অর্থনীতি আজকের পাশ্চাত্যের সমাজকে প্রাচ্যের তুলনায় তুলনামূলক বিচারে উদার এবং মুক্ত সমাজে পরিণত করেছে।

বাংলাদশের সমাজে সামস্টিক সমাজবাদী চিন্তার লালন এবং বিকাশে বাম এবং ‘ইসলামপন্থী’ উভয় চিন্তাধারার বিশ্বাসীরাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে বাম দলগুলি কখনোই জনপ্রিয়তা পায়নি, কিন্তু তাদের সমাজতান্ত্রিক নীতি আদর্শগুলি— রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে অর্থনীতি, বিনা পয়সায় শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, চাকরির নিশ্চয়তা ইত্যাদি— বেশির ভাগ জনগোষ্ঠীর কাছে বিপুল জনপ্রিয়। বামপন্থিদের মত তারাও রাষ্ট্রকে অভিভাবকের ভূমিকায় দেখতে চান। কিন্তু এর সমস্ত কিছুর বাস্তবায়ন তারা চান ডানপন্থি দলগুলোর কাছ থেকে।

ছয়.

ভারতের মতো হিন্দু প্রধান এবং বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মত মুসলিম প্রধান দেশগুলিতে দেখা গেছে অতি ডান এবং দক্ষিণপন্থি দলগুলি মনে করে সমাজে ধর্ম বিষয়ক গোলযোগ হলে রাজনৈতিকভাবে তারা লাভবান হবে। তাই তারা সব সময় চেষ্টা করে ধর্ম বিষয়ক গোলযোগ তৈরি করতে অথবা এটা থেকে ফায়দা নিতে। সমস্যা সমাধানের চেয়ে জিঁইয়ে রাখাতেই তাদের বেশি আগ্রহ।

ভারতের দক্ষিণপন্থি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রাণভ্রোমরা যতটা না আভ্যন্তরীণ তার চেয়ে বেশি আঞ্চলিক। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের ‘ইসলামপন্থা’ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনীতি তার প্রাণশক্তির উৎস। এ দুই ধারার রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়লে ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি তার যৌক্তিকতা হারাবে। সুতরাং তারা নানাভাবে চেষ্টা করবে যাতে এ দুই দেশে অন্তত ‘ইসলামপন্থা’র রাজনীতির জোরালো ভূমিকা অব্যাহত থাকে।

‘ইসলামপন্থা’র রাজনীতির যারা করেন তাদের কাছেও ভারতে হিন্দুত্ববাদের উত্থান আশীর্বাদ স্বরূপ। তাদের রাজনীতি টিকিয়ে রাখবার প্রেরণা তারা এর মাঝেই খুঁজে থাকেন। তাই তারা মুসলিম প্রধান বাংলাদেশেও নানা ছুতায় খুঁজতে থাকেন হিন্দুত্ববাদের জোরালো উপস্থিতি। ভোলার ঘটনাও এর ব্যতিক্রম নয়। সেখানেও ‘ইসলামপন্থি’রা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছেন হিন্দুত্ববাদকে।

সাত.

ভোলার মত কিছু মুসলিম প্রধান দেশের তৃণমূলের তৌহিদী জনতা যখন অতি আবেগী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন এর কারণ হিসাবে কেউ কেউ ইসলাম ধর্ম গ্রন্থগুলির (কোরান এবং হাদীস) প্রতি আঙ্গুলি নির্দেশ করেন। তারা যেটা বলতে চান সেটা হল, গ্রন্থগুলিতে এমন কিছু কিছু বাক্য রয়েছে যেটা মুসলমানদের উগ্র বা নৈরাজ্যবাদী হতে উৎসাহ জোগায়। কিন্তু বিষয়টা কী আসলেই তাই?

ইহুদী এবং খ্রিস্টানদের ধর্ম গ্রন্থগুলির সাথে যাদের পরিচয় আছে তারা জানেন যে, সেখানে এমন কিছু বাক্য রয়েছে, যা তুলনামূলক বিচারে ইসলামিক ধর্ম গ্রন্থগুলির নির্দেশিত বাক্যগুলির চেয়ে অনেক বেশি উগ্র। ফলে এ প্রশ্ন দাঁড়ায়, ইহুদী এবং খ্রিস্ট ধর্মালম্বীরা তাদের ধর্ম সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অতি আবেগী আচরণ করে না কেন? বিষয়টা কি তাহলে গ্রন্থের সমস্যা, না যারা গ্রন্থ অনুসরণ করেন- তাদের আচরণগত সমস্যা?

এখন দেখা যাক, অতি আবেগী প্রতিক্রিয়া কি বিশ্বের সব দেশের মুসলিমরা দেখান, না বিশেষ বিশেষ দেশের মুসলমানরা দেখান? লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ইউরোপীয় মুসলিম প্রধান দেশগুলি যেমন বসনিয়া, কসোভো, আলবেনিয়া এমনকি তুরস্কেও এরকম অতি আবেগী প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। সাবেক সোভিয়েত মধ্য এশীয় দেশগুলি যেমন কাজাখাস্তান, তুর্কমেনিস্থান, উপসাগরীয় দেশগুলি যেমন কুয়েত, কাতার, আরব আমিরাত বা ওমানেও উগ্র প্রতিক্রিয়া হয় না। আফ্রিকার আলজেরিয়া অথবা মরক্কোতে, এমনকি মাল্যশিয়াতেও এ ধরনের ব্যাপক আবেগী প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় না।

অতি আবেগী, ক্ষেত্র বিশেষে নৈরাজ্যবাদী সহিংসতা দেখা যায় হাতে গোণা কয়েকটি রাষ্ট্রে, সব মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রে নয়। ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত বিষয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া যে সমস্ত দেশে দেখা যায় সেগুলি হল পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত এবং মিসরসহ কিছু দরিদ্র আফ্রিকান দেশ। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সমস্ত মুসলিম রাষ্ট্রে নয়, তুলনামূলকভাবে দরিদ্র দেশ যেগুলি, সেগুলিতে প্রতিক্রিয়া হয় বেশি। আর যারা ধনী, সেখানকার জনগোষ্ঠী মানসিকভাবে আহত হলেও, রাস্তায় নেমে এর অতি আবেগী বহির্প্রকাশ সাধারণত দেখায় না। অর্থাৎ আবেগী বহির্প্রকাশের সাথে অর্থনৈতিক মানদণ্ডের একটা সম্পর্ক রয়েছে।

অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত রাষ্ট্রে পাশ্চাত্যের মতই অতি আবেগী বহির্প্রকাশের উপস্থিতি কম, আর অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত দেশে আবেগের বহির্প্রকাশ অতি বেশি। অনুন্নত রাষ্ট্রে রাজনৈতিকভাবে ধর্ম সংক্রান্ত সহিংসতার হারও উচ্চ। তাহলে দেখা যাচ্ছে, জাতি নির্বিশেষে মুসলিমরা একই রকম আবেগী আচরণ করেন না। বরং, অর্থনৈতিক উন্নয়ন/অনুন্নয়নই নির্ধারণ করে দিচ্ছে, কোনও দেশে ধর্ম বিষয়ক আচরণে অতি আবেগী বা সহিংস হবে, না যৌক্তিক হবে।

এখন দেখা যাক, অর্থনৈতিক অনুন্নত দেশে কারা রাস্তায় নেমে আবেগী প্রতিক্রিয়া দেখান। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা ভারতে হিন্দু বা মুসলমান জনগোষ্ঠীর যারাই রাস্তায় নেমে আসেন, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, তাদের প্রায় সবাই পিছিয়ে পড়া দরিদ্র, বঞ্চিত জনগোষ্ঠী। তথাকথিত উন্নয়নের নানা জয়গান সত্ত্বেও বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে, জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই এখনো অত্যন্ত অমানবিক, মানবেতর জীবন-যাপন করেন। ইহজগতে তাদের বেঁচে থাকার তেমন কোন স্বপ্ন নেই।

এ মানুষগুলো ধর্ম-প্রাণ নয়, কিন্তু ধর্ম ভীরু। দৈনন্দিন জীবনে তারা সেভাবে ধর্ম পালন করেন না, কিন্তু সেই ধর্মকে আঁকড়ে ধরেই হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে এ নিপীড়িত বিশাল জনগোষ্ঠীটি বেঁচে থাকেন। ফলে, তাদের বেঁচে থাকবার এ একমাত্র অবলম্বনটিকে নিয়ে কেউ ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করলে তাদের মাঝে এর বিরুদ্ধে অতি আবেগী প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে, এটাই স্বভাবিক।

আর এই অতি আবেগী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে উপমহাদেশের ‘ধর্মভিত্তিক’ দলগুলোর প্রাণশক্তি। তাই তাদের সমর্থকরা সব সময় সুযোগ খোঁজেন, দরিদ্র মানুষের এ আবেগকে জাগিয়ে তুলতে, একে পুঁজি করে রাজনীতি করতে।

বিবিসি বাংলার রিপোর্ট (২৬ অক্টোবর, ২০১৯) অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, শুধু ভোলাতে নয়, কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নাসিরনগর, রংপুর, সিলেটের ওসমানীনগর ইত্যাদি সব জায়গাতেই সেই একই কায়দায় ধর্ম ভীরু মানুষের আবেগকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। পরিণতিতে ভোলাসহ প্রত্যেকটি জায়গায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে অমুসলিম জনগোষ্ঠী।

এ প্রক্রিয়ায় যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ তোলা হয়, সে ব্যক্তি সেটা অস্বীকার করার পরেও বলা হতে থাকে, সেই-ই সেটা করেছে এবং শুরুতেই তার ফাঁসি চাওয়া হয়, যা কিনা ইসলামের শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা, অস্বীকার করবার অর্থ হচ্ছে, তিনি অবমাননার বিষয়টি ধারণ করেন না। কেউ যদি একটি বিষয় ধারণ না করেন, এরপরে আর কোন সমস্যা থাকবার কথা না। আর কেউ সেটা ধারণ করলেও, ইসলাম অনুযায়ী নিয়ম হল তাকে ‘হেদায়েত’ করা এবং ক্ষমা চাইতে বলা।

ভারত, বাংলাদেশসহ কোথাও ‘ধর্মভিত্তিক’ দলগুলোর লক্ষ্য ধর্ম নয়। তাদের উদ্দেশ্য হল ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা। তাই তারা কেউই বিষয়গুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান না করে জল ঘোলা করতে পছন্দ করে। ‘হেদায়েত’ বা ক্ষমা নয়, তাদের লক্ষ্য ইসলামে যেটাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেই ‘ফিতনা’ সৃষ্টি করা। আর এ ক্ষেত্রে দাবার ঘুঁটি হিসাবে অনেক সময়েই ব্যবহৃত হন স্থানীয় আলেমরা। স্থানীয় বিএনপি, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীও এ প্রক্রিয়ার সাথে অনেক সময় যুক্ত হয়ে পড়েন তাদের নিজস্ব আবেগ, বিশ্বাস, এলাকার রাজনীতিতে সুবিধা লাভ ইত্যাদি নানা বিবেচনায়।

আট.

গবেষণায় দেখা গিয়েছে- যে সমস্ত রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত, অথবা রাষ্ট্র এবং সমাজে সেকুলার ভাবধারার প্রবল উপস্থিতি রয়েছে, অথবা এ দুটি উপাদানই একই সাথে বিদ্যমান- সে সমস্ত রাষ্ট্রে ধর্ম বিষয়ক আবেগী বা সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ দুটো উপদানই প্রবলভাবে অনুপস্থিত।

বিএনপি ও জাতীয় পার্টি রাষ্ট্র এবং সমাজে ‘ইসলামপন্থার’ রাজনীতির যে সংস্কৃতি শুরু করেছিল, গত প্রায় এগার বছরে তার আরো বিস্তার লাভ ঘটেছে। ফলে, ১৯৪৭ সাল বা তার আগে থেকেই জনগণের ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে উসকে দিয়ে ফায়দা লোটার যে রাজনীতির ধারা চালু আছে,আগামী দিনগুলিতেও সেটি অব্যাহত থাকবে।

—সাঈদ ইফতেখার আহমেদশিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিস, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র