বান্দরকে লাই দিলে মাথায় উঠে : রাঙ্গাঁকে নিয়ে ফিরোজ রশীদ

নিজস্ব প্রতিবেদক : দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁর বক্তব্যকে ধৃষ্টতাপূর্ণ বলে স্বীকার করে নিয়ে তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য আওয়ামী লীগকেই দোষি করেছেন জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ।

গণতন্ত্রের জন্য শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে রাঙ্গাঁর বক্তব্য নিয়ে মঙ্গলবার সংসদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা সমালোচনায় মুখর হলে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, মহাসচিবের ওই বক্তব্যের দায় জাতীয় পার্টি নেবে না।

ছাত্রলীগের এক সময়ের নেতা ফিরোজ রশীদ আওয়ামী লীগ নেতাদের খোঁচা দিয়ে বলেন, “বান্দরকে লাই দিলে মাথায় উঠে…আমরা তো লাই দিইনি; এ সংসদ তাকে লাই দিয়েছে। যার ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, কিছু নেই, হঠাৎ করে এনে মন্ত্রী করা হয়েছে। যুবদল করেছে সে..বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এমন কথা বলার দুঃসাহস কোথায় পায়?”

গত সংসদ নির্বাচনের আগে এ বি এম রুহুল আমীন হাওলাদারকে সরিয়ে পরিবহন মালিক সমিতির নেতা রাঙ্গাঁকে দলের মহাসচিব করেছিলেন জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ।

মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রাঙ্গাঁকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিগত সরকারে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছিল। তার সঙ্গে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছিল জাতীয় পার্টির আরও দুই নেতাকে। পতিত সামরিক শাসক এরশাদকে করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।

রাঙ্গাঁ গত ১০ নভেম্বর দলের এক অনুষ্ঠানে প্রয়াত সামরিক শাসক এরশাদের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনকে ‘মাদকাসক্ত’ বলেছিলেন। সেইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও সমালোচনা করেন।

নূর হোসেনকে ‘মাদকাসক্ত’ বললেন রাঙ্গাঁ

রাঙ্গাঁর বক্তব্যে নিন্দার ঝড়, ক্ষমা চাওয়ার দাবি

রাঙ্গাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের মানসিকতা থেকে: কৃষিমন্ত্রী

শহীদ নূর হোসেনকে নিয়ে কটূক্তির জন্য রাঙ্গাঁর দুঃখপ্রকাশ

ব্যাপক ক্ষোভ-বিক্ষোভের মুখে মঙ্গলবার এক বিবৃতি দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিজের ওই বক্তব্য রাঙ্গাঁ প্রত্যাহার করলেও তার সমালোচনা থেমে নেই।

মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনেও অনির্ধারিত আলোচনায় সংসদে বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ রাঙ্গাঁকে নিয়ে সমালোচনায় মুখর হন আওয়ামী লীহের জ্যেষ্ঠ নেতারা। এসময় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অধিবেশন কক্ষে ছিলেন। তবে উপস্থিত ছিলেন না রাঙ্গাঁ।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ বলেন, “মসিউর রহমান রাঙ্গাঁর বক্তব্য শুনেছি। তার বক্তব্য বাংলার মানুষের হৃদয়ে ব্যথা দিয়েছে। তার বক্তব্যে ঘৃণা প্রকাশ করছি। তার জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ।”

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির জোট না হলে রাঙ্গাঁ সংসদ সদস্যও হতে পারতেন না বলে দাবি করেন তোফায়েল।

তিনি বলেন, “রাঙ্গাঁ খারাপ বক্তব্য করেছেন। এটা কুৎসিত বক্তৃতা। একজন সুস্থ মানুষ হলে, স্বাভাবিক থাকলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কে এমন সমালোচনা করতো না। এ জন্য তার দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাওয়া উচিৎ।”

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ছাত্রনেতা, বর্তমানে গণফোরামের সংসদ সদস্য সুলতান মো. মনসুর আহমেদ বলেন, “রাঙ্গাঁ সাহেব সংসদকে অবমাননা করেছেন। স্বৈরাচারের পতন না হলে রাঙ্গাঁ সংসদ সদস্য হতে পারতেন না। রাঙ্গাঁর এ বক্তব্যের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে স্বৈরাচারের পতন হলেও তাদের চরিত্র, স্বৈরাচারের প্রেতাত্মার পরিবর্তন হয়নি। রাঙ্গাঁর গণবিরোধী, সুবিধাবাদী চরিত্রও স্পষ্ট হয়েছে।”

মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ

মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ

তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি বলেন, “রাঙ্গাঁ শুধু নূর হোসেনের বিরুদ্ধে নয়; স্বাধীনতা, সংসদ ও গণতন্ত্রেরসকল বিষয়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, সবাইকে অপমান করেছেন। তাকে সংসদে এসে ক্ষমা চাইতে হবে।”

জাতীয় পার্টির মহাসচিবের পদ থেকে রাঙ্গাঁকে বাদ দেওয়ার দাবিও জানান মহাজোট শরিক তরীকতের এই নেতা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, “কোনো সুস্থ লোক এ ধরনের কথা বলতে পারে না। কোনো বিবেকবান লোক এটা বলতে পারে না। “

“রাঙ্গাঁকে শুধু ক্ষমা চাইলে হবে না। এসব কথা সুস্থ লোক বলতে পারে না। এত বিপ্লবী যদি হতেন, তবে মন্ত্রী থেকে চলে যেতেন। জাতীয় পার্টি এ নিয়ে একটা ব্যাখ্যা দেবে।”

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিক আমির হোসেন আমু বলেন, “রাঙ্গাঁ এ বক্তব্য দিয়ে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে; এরশাদ সাহেবের কুকীর্তি ঢাকার জন্যে একথা কবলছেন। এখন বিধি-ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাকেও ক্ষমা চাইতে হবে।”

অনির্ধারিত এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়ে তাহজীব আলম সিদ্দিকী বলেন, “রাঙ্গাঁ অর্বাচীন চিফ হুইপ। …নিঃশর্তভাবে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে, ক্ষমা চাইতে হবে।”

‘দায় নেবে না’ জাপা

দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে পাশে রেখে রাঙ্গাঁ সেদিন কথা বললেও তার বিতর্কিত বক্তব্যের দায় জাতীয় পার্টি নেবে না বলে জানিয়েছেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ও মুজিবুল হক চুন্নু।

চুন্নু বলেন, “আমি জাতীয় পার্টি করি, আমার নেতা এরশাদ। রাঙ্গাঁ যে বক্তব্য দিয়েছেন, সে বিষয়ে পরিষ্কার করতে চাই, তার বক্তব্যটা দলীয়ভাবে ওন (ধারণ) করে না, এটা বক্তব্য তার ব্যক্তিগত।”

তিনি আরও বলেন, “শহীদ নূর হোসেন সম্পর্কে জাতীয় পার্টির কী দৃষ্টিভঙ্গী, তা তৎকালীন চেয়াম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ব্যক্তিগতভাবে নূর হোসেনের বাড়ি গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন, পরিবারকে সাহায্য করেছেন। এটা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গী।”

কাজী ফিরোজ রশিদ

কাজী ফিরোজ রশিদ

ফিরোজ রশীদ বলেন, “রাঙ্গাঁর বক্তব্য জাপার নয়। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি এ ধরনের বক্তব্য দিতে পারে না। এ জন্য আমরা লজ্জিত, দুঃখিত ও অপমানিত ফিল করছি।

“এটা তার ব্যক্তিগত বক্তব্য। এর দায় দল নেবে না।…যে লেখাপড়া করে নাই, পরিবহনে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বাড়ি গাড়ি করেছেন, তার জবাব দিতে আমাদের আসামির কাড় গড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। আজ লজ্জিত আমরা।”

আওয়ামী লীগ সমর্থন না দিলে জাতীয় পার্টির নেতাদের সংসদ সদস্য হওয়া কঠিন হয়ে যেত বলে স্বীকার করেন ফিরোজ রশীদ।

তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ যদি না থাকত, রংপুরে থাকতে পারতো না (রাঙ্গাঁ)।”