আলিফ-লাইলা-১৫: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং-এর খোয়ায়েশ বামনের চন্দ্রাভিলাস

 

[পূর্বকথা: তথাকথিত চরিত্রহীনা স্ত্রীর পরকীয়ার যারপরনাই নারাজ হয়ে হিন্দুস্তানের বদমেজাজি বাদশাহ শাহরিয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে প্রতি রাতে তিনি এক যুবতীকে নিকাহ-এ-মুতা করবেন এবং ভোর হলেই এক রাতের সেই বেগমকে কতলের আদেশ দেবেন। কয়েক বৎসরে শত শত যুবতী বেঘোরে ইন্তেকাল ফরমালে ক্ষুরধার বুদ্ধিমতী উজিরকন্যা শেহেরজাদি করুণাপরবশ হয়ে বোন দিনারজাদির সঙ্গে সল্লা করে নিজে থেকেই বাদশা শাহরিয়ারকে নিকাহ করেন। জীবনের শেষ রাতে শেহেরজাদির আবদার রাখতে বাসরঘরে ডেকে আনা হয় দিনারজাদিকে। রাত গভীর হলে পূর্বপরিকল্পনামাফিক দিনারজাদি শেহেরজাদিকে একেকটি সওয়াল পুছেন এবং শেহেরজাদিও কালবিলম্ব না করে জওয়াব দিতে শুরু করে দেন, কিন্তু ভোরের আজান হওয়া মাত্র জওয়াব বন্ধ করে শুয়ে পড়েন। বাদশাহ যেহেতু সওয়াল-জওয়াব শুনে আনন্দ পাচ্ছিলেন, সেহেতু দিনের পর দিন মৃত্যুদণ্ড বাতিল হতে থাকে শেহেরজাদির। আজ সেই সওয়াল-জওয়াবের পঞ্চদশ রাত্রি]

প্রিয় দিনারজাদি, ফ্রান্স বা কানাডা, যেসব দেশে আমি পড়েছি, সেখানে যেকোনো বয়সের লোক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে, একটা ডিগ্রি করতে পারে, যদি তার ভর্তির যোগ্যতা থাকে। ভর্তিপরীক্ষা বলে কিছু নেই। বাংলাদেশে একটা বিশেষ বয়সের পর আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পর পর দুই বার ভর্তিপরীক্ষাও দেওয়া যায় না। এর আর্থসামাজিক কারণ নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত না হয়, তবে সেটাকে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বলা যাবে কী করে? কেন বিভিন্ন বয়সের লোকজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না? একবার কর্মজীবনে যোগ দিয়ে কেউ যদি চায়, তবে আবার কেন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসতে পারবে না? র‌্যাংকিং-এ প্রথম সারিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এটা সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কলেজে এটা চিন্তার বাইরে। সকলের প্রবেশাধিকার না থাকা মানে বিশ্ব থেকে চ্যুত হওয়া। সবার জন্যে উন্মুক্ত না হওয়া র‌্যাংকিং থেকে বাদ পড়ার বিংশতিতম কারণ।

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমি সেই বিষয়েই পড়বে, যা তুমি পড়তে চাও। যেমন ধরো, বাংলাদেশে পালি ও বুদ্ধিস্ট স্ট্যাডিজ (কেন এই অদ্ভুত ইংরেজি নাম জানি না) বা সংস্কৃতে প্রচুর মুসলমান তরুণ ভর্তি হয়, কারণ আর কোনো সাবজেক্ট তারা পায় না। সঙ্গীত বা নৃত্যকলায় বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই- এমন শিক্ষার্থীও কোনোমতে এসব বিষয়ে অনার্স-এম.এ. করে থাকে। বিষয়টিকে মন থেকে মেনে নিতে পারে না বলে দাঁতে দাঁত চেপে চার/পাঁচটি বছর কাটিয়ে দেয় তারা ঢাকা শহরে থাকার দুর্লভ সুযোগ পেয়েছে বলে এবং কোনোমতে একটা বি.এ. ডিগ্রি নিয়ে বি.সি.এস পরীক্ষা দিয়ে একটা চাকরি পাবার আশায়। এই শিক্ষার্থীদের অনেকে নিজের অধীত বিষয়ের নাম পর্যন্ত বলতে লজ্জ্বা পায়। এদের উপর মানসিক চাপটা কেমন পড়ে? পছন্দের বিষয় পড়তে না পারা র‌্যাংকিং-এ না আসার একবিংশতিতম কারণ।

যে বিষয় পছন্দ নয়, সেই বিষয়ই পড়তে হবে এমন শিক্ষা-পরিস্থিতি কি পৃথিবীর অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে? বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা হয়তো স্বাভাবিক, কিন্তু এই পরিস্থিতি মানসিক দিক থেকে স্বাস্থ্যকর নয়। এই সমস্যা সামাল দিতে না পারলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কখনই বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠবে না। একটি বিষয়ে যদি কারও আগ্রহ না থাকে তবে কীভাবে সেই বিষয়ে সে জ্ঞানার্জন করবে, কিংবা সম্ভব হলে অল্পবিস্তর গবেষণা করবে? শত শত ছাত্রকে পালি, উর্দু বা ফার্সির মতো বিষয়ে অনার্সইবা পড়তে হবে কেন? সব বিষয়েই বা অনার্স কেন থাকতে হবে? শুনেছি, দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আছে একাধিক অনার্স প্রোগ্রাম, আবার একটি ইনস্টিটিউটও আছে। মুড়িমুড়কির মতো অনার্স প্রোগ্রাম সৃষ্টি করার ফলে ছাত্রাবাসগুলোর উপর চাপ বাড়ছে। এসব কি জাতীয় সম্পদের অপচয় নয়? বাজারে কম চাহিদা-সম্পন্ন বিষয়ে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমিয়ে এনে বিষয়গুলোকে গবেষণাকেন্দ্রীক করে ফেলতে পারলে ভালো হয়। তবে এটাই যে একমাত্র সমাধান সে দাবি আমি করছি না।

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রত্যেক বিষয়ে কিছু মূল কোর্স থাকে আর থাকে বেশ কিছু নৈর্বাচনিক বা ইলেক্টিভ কোর্স। মূল কোর্স নিতে তুমি বাধ্য, কিন্তু নৈর্বাচনিক কোর্সগুলো তুমি তোমার পছন্দ মতো বাছাই করতে পারো। দেখা যায়, ব্যবসায় প্রশাসন পড়ছে যে শিক্ষার্থী সে একটা কবিতা, আলোকচিত্র, কিংবা কালিগ্রাফির কোর্স নিয়েছে নৈর্বাচনিক কোর্স হিসাবে। এর ফলে শিক্ষা একদেশদর্শী না হয়ে একটা সম্পূর্ণ রূপ পায়। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নৈর্বাচনিক সাবজেক্ট নেবার সুযোগ নেই, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শুনেছি কমবেশি আছে। আগে সাবসিডিয়ারি সাবজেক্টের একটা ব্যাপার ছিল, যাতে বিদ্যা ও জ্ঞানের সম্পূর্ণতার ঘাটতি কমবেশি মিটতো। এখনকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সবই ইন্টেগ্রেটেড কোর্স, সমন্বিত সিলেবাসে যা আছে তাই পড়তে হবে। এই পদ্ধতি কলেজের সঙ্গে খাপ খায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নয়। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে মূলত কলেজ, তাদের ইন্টেগ্রেটেড সিলেবাস তার অন্যতম প্রমাণ। কূপমণ্ডুক পাঠ্যক্রম র‌্যাংকিং-এ অন্তর্ভুক্ত না হবার দ্বাবিংশতিতম কারণ।

ইস্পাতের পাত থেকে তৈরি তলোয়ার এবং কাঁচা লোহা থেকে তৈরি তলোয়ারের ধার এক হবে না। যেমন কাঁচামাল তেমন মানেরইতো পণ্য হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, শিক্ষক, গবেষক সবাই ‘প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী’ নামক কাঁচামাল থেকে তৈরি। এই কাঁচামাল চারটি কারখানায় তৈরি হয়: পরিবার, সমাজ, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উচ্চবিদ্যালয়। এই চারটি কারখানার কোথাও বিজ্ঞানমনস্কতা শেখানো হয় না। চিন্তা করতে শেখানো হয় না, চিন্তা প্রকাশ করার একমাত্র উপায় যে ভাষা, সেই ভাষা পর্যন্ত ঠিকঠাকমতো শেখানো হয় না। যুক্তিসম্মতভাবে চিন্তা যে করতে শেখেনি, ভাষার উপর যার দখল নেই, অর্থাৎ যে লেখাপড়া জানে না, সে শিক্ষার্থী হিসেবে কী পড়বে, কী গবেষণা করবে আর শিক্ষক হিসেবে কীইবা পড়াবে? সুতরাং বিজ্ঞানের শিক্ষকের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতার সৃষ্টি হয় না, অন্ধবিশ্বাসকেই এই সব শিক্ষক প্রাধান্য দেয় জীবন ও মননে। বাংলাদেশের মতো শিক্ষা-পরিবেশে কোনো বিজ্ঞানীর জন্ম হওয়া প্রায় অসম্ভব, খুব বেশি হলে মাঝারি মানের কিছু প্রকৌশলীর সৃষ্টি হতে পারে। দুর্বল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‌্যাংকিং থেকে বাদ পড়ার ত্রয়োবিংশতিতম কারণ।

উচ্চমাধ্যমিক পাশ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দেখে, যেখানে রাষ্ট্রভাষা বাংলা বলতে-লিখতে তারা হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে শিক্ষক পাঠ দিচ্ছেন ইংরেজিতে। বাংলাদেশের সংবিধান ও ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা আইন অনুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় পাঠ দেওয়া বে-আইনী। কিন্তু এদেশে ভাষা আইন দূরে থাক, কোনো আইন মানতে কেউ বাধ্য নন। ফলে সিংহভাগ শিক্ষার্থী ইংরেজিতো শেখেই না, বাংলা যা জানতো তাও ভুলে যায়। এগুলো আমার মনগড়া কথা নয়, পরীক্ষার খাতায় এর প্রতিফলন দেখছি প্রতি সেমিস্টারে। শিক্ষার্থীরা ঢাবিতে এসে সর্বতোভাবে খাবি খায় এবং তাদের মনে হতাশাজনিত প্রতিশোধস্পৃহা জমতে থাকে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।

শিক্ষক সমিতির নির্বাচন হয় প্রতি বছর। নীল-সাদা-গোলাপী দলে বিভক্ত হয়ে শিক্ষকেরা নির্বাচন করে জিতে আসেন, কিন্তু গত ত্রিশ বছরে শিক্ষক সমিতির কোনো সদস্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে খুব একটা দেখা যায়নি। শিক্ষক সমিতি নির্বাচন মূলত শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ পদায়নের অপরিহার্য পরীক্ষা। কতজন শিক্ষক আপনাকে সমর্থন করে, তার উপর নির্ভর করবে আপনার শক্তি, ঠিক যেমন কতজন ট্যান্ডন, কত জন চ্যালাচামুণ্ডা আছে তার উপর নির্ভর করে এলাকার মাস্তানের শক্তি। ছাত্রজীবনে আপনি কি ভালো লাঠিয়াল ছিলেন? এই শক্তি দেখেই সরকার একেকজন শিক্ষককে উপাচার্য পদে নিয়োগ দিয়ে থাকে, শিক্ষকের ডিগ্রি কিংবা গবেষণা দেখে নয়। অতিস্বার্থপর শিক্ষক রাজনীতি এবং তাতে সরকারের স্নেহ প্রশ্রয় র‌্যাংকিং-এ স্থান না হবার চতুর্বিংশতিতম কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রেণির শিক্ষক সারাদিন ধান্ধায় ব্যস্ত থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি কোনো বিচারেই তাদের লক্ষ্য নয়। অন্য একটি শ্রেণির বসবাস উত্তরা-বনানী-গুলশান-বারিধারার মতো পশ এরিয়ায়। কোনো মতে সপ্তাহে কয়েক দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে এসে কয়েকটি ক্লাস নিয়ে দুপুর দুইটার দিকে ‘এখানে কী গরম, কী গরম!’ বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে তারা পগার পার। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দুপুরের পর দেখাই যায় না তাদের। অনেক শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বেচে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বা এখানে-ওখানে ক্লাস নিয়ে বেড়ান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে ততটা মনোযোগী হন না তারা, যতটা হওয়ার কথা, অথচ প্রকাশ্যে ও নীরবে আমলাদের তারা এই বলে অভিযুক্ত করেন যে আমলারাই শুধু দুর্নীতি করে। ‘সকল মাছে বিষ্ঠা খায়, পাঙ্গাসের নাম’– চট্টগ্রামি প্রবাদ। শিক্ষকদের স্বার্থপরতা র‌্যাংকিং-এ স্থান না হবার পঞ্চবিংশতিতম কারণ।

সম্প্রতি বাণিজ্য অনুষদের এক সিনিয়র শিক্ষক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন: তোমার হবু শ্বশুর একজন যোগ্য নিয়োগকর্তা হিসেবে কোন কোন দিক বিবেচনা করে তোমাকে তার কন্যার উপযুক্ত পাত্র বিবেচনা করতে পারেন বুঝাইয়া লেখ। বাণিজ্য অনুষদে (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুলভাল) ইংরেজিতে লেখা দস্তুর, কিন্তু এই শিক্ষক মহোদয় প্রথা ভেঙে বাংলাতেই প্রশ্ন করলেন এবং বাংলাতেই উত্তর দাবি করলেন। আড়াইশ ছাত্র বিভিন্নভাবে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে, কিন্তু তার মধ্যে কয়েকটি উত্তর অভিনব: ‘সাত সাতটি বছর আমি ওমুক ছাত্রাবাসের বারান্দায় শুয়ে রাত কাটিয়েছি শীত-ঝড়-বৃষ্টিতে। কত অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে পেট ভরেছি, আমি সব করতে পারি, সব সইতে পারি, আমার দ্বারা কী না করা সম্ভব?’ ‘এটা কি ছাত্রাবাস নাকি আন্দামান সেলুলার জেল? বিদেশে জেলের কয়েদিওতো এর চেয়ে ভালো থাকে!’ এই মানের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে র‌্যাংকিং? সে গুড়ে বালি! আরেকজন লিখেছে: ‘ছাত্রনেতাদের কত চর-থাপ্পর খেয়েছি, শিক্ষকেরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কত কষ্ট দিয়েছেন। যদি কোনো দিন আমার হাতে ক্ষমতা আসে, তবে আমিও ছাড়বো না! ছাড়ছে যে না তার প্রমাণতো মিডিয়াতেই আছে। দুদকের কর্মকর্তা প্রকাশ্যে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিচ্ছে, ছেলেকে স্কুলে আনা-নেয়ার জন্যে গাড়ি ঘুষ চাইছে। পুলিশের আইজি নির্লজ্জভাবে ঘুষ দিচ্ছে এবং (চোরের মায়ের) বড় গলায় তা ঘোষণা করছে। এসব অস্বাভাবিক আচরণ যে তরুণ বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের বারান্দায় শীতের রাতে চরম অপ্রাপ্তিজনিত কষ্টের বহিঃপ্রকাশ নয় তাই বা কে বলবে? এমন অসুখী সব তরুণ কী পড়াশোনা করবে, আর কীই বা গবেষণা করবে?

অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজ কোনো রাষ্ট্রের জন্ম দেয়নি, কিন্তু এগুলো এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয়, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ: অধ্যাপনা ও গবেষণা এই দুই বিশ্ববিদ্যালয় সঠিকভাবে করে চলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি ‘ক্ষণে সচল, ক্ষণে অচল’ নড়বড়ে গাড়ির মতো যার এক হর্ন ছাড়া আর সব কিছু বাজে। বহু যুগ আগেই অপরিহার্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নের এমন সব উদ্যোগ না নিয়ে কর্তাদের ফাঁফা গর্ব ও গলাবাজি র‌্যাংকিং থেকে ছিঁটকে পড়ার ষড়বিংশতিতম কারণ।

ডাকসু মাত্র নির্বাচিত হয়েছে, সুতরাং তাদের কৃত্য ও অর্জন নিয়ে কথা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে সকাল দেখেই সাধারণত বোঝা যায়, দিনটা কেমন যাবে। এতদিন ডাকসু ছিল না, কিন্তু ছাত্র সংগঠনতো ছিল। গত ত্রিশ বছরে কোন ছাত্র সংগঠনকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকৃত সমস্যার ব্যাপারে খুব একটা মুখ খুলতে শুনিনি। বরং তাদের দেখেছি সমস্যার সৃষ্টি করতে, ক্লাস চলাকালীন মাইক বাজিয়ে মিটিং করতে, ক্ষমতার লেজুরবৃত্তি করতে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের অপমান করতে, ক্ষমতার প্রশ্রয়ে শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলতে। ছাত্রাবাসে কেন এক বিছানায় দুজন শোবে, কেন গণরুম থাকবে, কেন বাথরুম নোংরা থাকবে, কেন ক্যান্টিনে খাবারের মান খারাপ হবে, কেন শিক্ষক বাংলার জায়গায় ইংরেজিতে পড়াবেন– এসব ব্যাপারে প্রতিবাদ করার দায়িত্ব কি ছাত্রসংগঠনের নয়? ছাত্র এবং শিক্ষক সংগঠন কোনটিই যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধানে অগ্রণী না হয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও বিকাশ হবে কি করে? এই উন্নয়ন ও বিকাশের উপরই র‌্যাংকিং-এ আসা নির্ভর করে না কি? বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যার প্রতি ছাত্রনেতাদের অমনোযোগ ও স্বার্থপরতা র‌্যাংকিং থেকে বাদ পড়ার সপ্তবিংশতিতম কারণ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারি নিয়োগ সাধারণত কীভাবে হয়? প্রথমত, কর্মচারিরা বয়স লুকিয়ে কাজে ঢোকে। যার বয়স চল্লিশ, সে জন্মসনদ নিয়ে আসে কুড়ি বছরের। শরীরের বয়স কিন্তু থেমে থাকে না। একটা বয়সে গিয়ে কাজ করার শক্তি কিংবা ইচ্ছা থাকে না। কিন্তু সেই বয়সে গিয়েও কর্মচারি অবসরে যায় না, যদিও যে সেবা তার কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের পাবার কথা প্রতিষ্ঠান কখনই সেই সেবা পায় না। ‘কাগজে-কলমে খোকা, কিন্তু কাজে-কর্মে বুড়ো’– এ ধরনের কর্মচারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আছে এবং এই সব কর্মচারির কারণে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, একটি অলিখিত নিয়ম আছে, যদি কোনো কর্মচারি কর্তব্যরত অবস্থায় মারা যায়, তবে তার পরিবারের একজনকে নিয়োগ দিতে হবে। বেশিরভাগ কর্মচারি কিংবা পদোন্নতি পেয়ে কর্মকর্তা হওয়া কর্মচারি নিজের সন্তান বা আত্মীয়কে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরি দেবার সর্বতোভাবে চেষ্টা করে। ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে এ প্রচেষ্টায় দোষের কিছু নেই, কিন্তু সমষ্টি, কিংবা প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে এই প্র্যাকটিস বা অনুশীলনকে ইতিবাচক বলা যাবে না।

কোনো প্রতিষ্ঠানে একই পরিবারের লোক প্রজন্মান্তরে চাকুরি পেলে সেই প্রতিষ্ঠান অথর্ব হয়ে যায় এবং প্রতিষ্ঠানটির আর বিকাশ হয় না। যদি কোনো পরিবারের লোকজন শুধু নিজের পরিবারেই বিয়ে করে তবে সেই পরিবারের বংশধরেরা যেমন অন্যদের তুলনায় বেশি রোগাক্রান্ত হয়, কালক্রমে সেই পরিবারের বংশবৃদ্ধি থেমে যায়, এ অনেকটা সে রকমই আরকি। প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে যারা আছে, তাদের বাইরে নিয়োগ হওয়া মানে প্রতিষ্ঠানে নতুন জিন, নতুন রক্ত, নতুন অভ্যাস, নতুন ধ্যানধারণা প্রবেশ করা। যদি একই পরিবারের সদস্যদের চাকুরি দেওয়া হয়, তবে কাজ না করে, কাজ না শিখে সার্বক্ষণিক ধান্দাবাজি করা (যার অন্যনাম ‘রাজনীতি’), অন্যের উপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করা ইত্যাদি বদভ্যাস চক্রাকারে ঘুরে কালক্রমে প্রতিষ্ঠানকে ভিতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। এই নিয়োগ-প্রথাই হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চৌকশ হতে দেয়নি এবং সেটা এই বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং থেকে ছিঁটকে পড়ার অষ্টবিংশতিতম কারণ।

[বাদশা এবং দিনারজাদি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন এবং ভাবছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব-র‌্যাংকিং-এ স্থান পাওয়ার খোয়ায়েশ একেবারেই বামনের চন্দ্রাভিলাস কিংবা বামন হয়ে চাঁদ ধরার ইচ্ছার মতো দুরাশা। ইতিমধ্যে পূবের আকাশে সুবেহ-সাদিকের চিহ্ন ফুটে উঠলো এবং ভোরের আযানও শোনা গেল। শেহেরজাদি পূর্বরাত্রির মতোই কথা থামিয়ে দিলেন। ফজরের নামাজ পড়ে নকশি-লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন দুই বোন। বাদশা শাহরিয়ারও ফজরের নামাজ পড়তে বেরিয়ে গেলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং-এ না আসার ২৮টি কারণ জানা হয়েছে। বাকি সব কারণ জানার আগ্রহ ছিল বলে বাদশাহ শেহেরজাদির মৃত্যুদণ্ড পরের সকাল পর্যন্ত স্থগিত করলেন।]

——————- শিশির ভট্টাচার্য্যঅধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।