যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে অনিয়ম তদন্ত করে লাভ কী !

অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নজির নেই>
বিল্লাল হোসেন:
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে বিভিন্ন অনিয়মে গঠন করা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের একটি সূত্র বলছে, তদন্ত কমিটি গঠন হওয়ার পরও কোন ঘটনায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তার নজির নেই। অনিয়মের বিরুদ্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রীয়তায় সুযোগ নিচ্ছে চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মকর্তা কর্মচারীরা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে তাহলে এসব ঘটনার তদন্ত করে লাভ কী।
গত ২৬ অক্টোবর পিত্তথলির পাথর অস্ত্রোপচারের পর মনোয়ারা বেগম (৫৫) নামে এক রোগীকে আটকে রেখে স্বজনদের কাছ থেকে টাকা আদায় ও চিকিৎস করে স্বাক্ষর বিহীন শর্ট স্লিপের মাধ্যমে ওষুধ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়কের কাছে অভিযোগ করার পর তত্ত্বাবধায়কের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত টিম গঠন হয়।
গত ১০ নভেম্বর উপশহরের ইন্তাজ আলীর ছেলে আলমগীর সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসক ও সেবিকার অবহেলায় ১২ নভেম্বর রাতে মারা যান তিনি। এই ঘটনায় তার স্বজনেরা লিখিত অভিযোগ করলে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন হয়। ২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সকালে যশোর শহরের খোলাডাঙ্গার ফারুক হোসেনের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সালমা খাতুনকে (২৮) অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালের গাইনী ওয়ার্ডে ভর্তির পর সন্তান প্রসব করেন। রোগীর অবস্থা খারাপ হলেও সেখানে কোন চিকিৎসক ছিলেন না। ওই সময় দায়িত্বরত আয়া হেলেনা প্রসব হওয়া শিশুকে মৃত ভেবে কাপড়ে পেচিয়ে ওই বেডের নিচে রেখে দেন । পরে রাত সাড়ে সাতটার দিকে শিশুর কান্নার শব্দ পান স্বজনরো। এই ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হয়। ৩১ আগস্ট অন্তঃসত্ত্বা রোক্সানা খাতুনকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে সেবিকা ও ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. ইলা মন্ডলকে খবর দিলেও তিনি রোগী দেখতে আসননি। এসময় গাইনী ইউনিট- ২ এ দায়িত্বরত অন্য বিশেষজ্ঞদেরও দেখা মেলেনি। অস্ত্রোপচার কক্ষে নিয়েও শেষ পর্যন্ত কোনো চিকিৎসক না আসায় তার অপারেশন হয়নি। বাধ্য হয়ে রাতেই রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় বেসরকারি একটি হসপিটালে। এই ঘটনায় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু নির্দেশে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ঝিকরগাছা উপজেলার হাজের আলী গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে শরিফুল ইসলাম গত ২৭ আগস্ট যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়। তিনি ডান পায়ের পাতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভর্তির পরের দিন ওয়ার্ড রাউন্ডে আসেন ডা. আনম বজলুর রশিদ টুলু রোগীকে ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর রাতে যশোর সদর উপজেলার রসুলপুর গ্রামের মাসুদ হোসেনের স্ত্রী তাসমিনা বেগমকে (২০) হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডে ভর্তি হন। যার রেজিস্ট্রেশন নাম্বর ৪১৩০৭/২। এসময় দায়িত্বরত সেবিকারা ইন্টার্নী চিকিৎসককে ডাকেন। তারা রোগী দেখে অনকল চিকিৎসক ডা. রিনা ঘোষ ও ডা. রাজিয়া আক্তারকে খবর দেন। কিন্তু দুই চিকিৎসকের একজনও রোগী দেখতে আসেননি বলে স্বজনদের অভিযোগ। এই ঘটনায় সোমবার রোগীর স্বামী মাসুদ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলার কারণে স্ত্রীর চিকিৎসা না পাওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে তিন সদস্যর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ১৬ আগস্ট ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মৃত আজিজুল ইসলামের ছেলে মিজানুর রহমান ভর্তি হয়ে মডেল ওয়ার্ডে ৩২ নম্বর বিছানায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৬ আগস্ট রোগী মিজানুর রহমানের সাথে দুর্ব্যবহার করেন চিকিৎসক। এই ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি গঠন হয়। ১০ এপ্রিল চৌগাছা উপজেলার সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের আড়শিংড়ী গ্রামের বাসিন্দা আবু তাহের (৭৫) জমিজমা নিয়ে জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত হন । তাকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির সময় জরুরি বিভাগে দায়িত্বে ছিলেন ডা. কল্লোল কুমার সাহা। ১২ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। জখমি সনদপত্রটি গ্রিভিয়াস করার নামে রোগীর স্বজনদের সাথে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন জমাদ্দার সর্দার ইমরান হাসান টপি। অভিযোগের ভিত্তিতে ২৩ এপ্রিল ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সূত্র জানায়, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অজ্ঞাত কারণে প্রতিটি তদন্ত প্রতিবেদন ফাইলবন্দি হয়ে আছে। এই বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ লিটু জানান, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে অভিযুক্তদের সতর্ক করেছেন তিনি।